জিডিপি গ্রোথ ধুয়ে কি পানি খাব! (প্যাসেজ টু হেভেন: ১১শ পর্ব)

১৭৭ পঠিত ... ১৭:৪৭, মে ২১, ২০২৪

18 (8)

বেহেশতে শোকের ছায়া। পেশোয়ারের ১৩২ জন শিশুকে তালেবানরা এভাবে মেরে ফেলার ঘটনায় বেহেশতে নিঃস্তব্ধতা নেমে এসেছে। শিশুরা বেহেশতে জিন্নাহর বাংলোর সামনে বিক্ষোভ করছে;

পাকিস্তান বানালে কেন!

গো জিন্নাহ গো।

জিন্নাহ নার্ভাস হয়ে গান্ধীজীকে ফোন করেন। গান্ধীজীর ফোন ধরে নাত্থুরাম গডসে; গান্ধীর পা টিপতে টিপতে নাত্থু বলে, বাপুজি একটু ঘুমিয়েছেন। জিন্নাদা শুনেছেন নাকি, আর এস এস-এর লোকেরা ভারতের স্থানে স্থানে আমার স্ট্যাচু বানাবে।

জিন্নাহ আঁতকে ওঠেন,তোমার স্ট্যাচু! বলো কী এরা কী ভারতীয় তালেবান নাকি!

নাত্থু টিটকারী দেয়,ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বানিয়েছিলেন, এখন আমাদের গালি দেন কেন!

জিন্নাহ ফোন রেখে দেন। নেহেরুকে ফোন করেন।

হ্যালো মি নেহেরু; বিপদে পড়েছি। পেশোয়ারের ১৩২ টি শিশু আমার বাংলো ঘিরে রেখেছে; শ্লোগান দিচ্ছে গো জিন্নাহ গো।

নেহেরু বলেন, এখান থেকে আর কোথায় পাঠাবে!

: কেন দোজখে।

: হ্যাঁ তাহলে চিন্তার বিষয়। দেখি কী করা যায়। খেয়াল রাখবেন থার্ড ফোর্স নেতা দেবদাস যেন না আসে। ও এলেই মিডিয়া আসবে; নাগরিক সমাজ আসবে; ব্যাপারটা জটিল হয়ে যাবে। আমি এক্ষুণি আসছি।

যেখানে দেবদাসের ভয়; সেখানেই রাত হয়। দেবুদা রাশান বান্ধবী আনাকে নিয়ে অকুস্থলে পৌঁছে যায়। চুনিলাল এক গণ এস এম এস ছেড়ে দেয় গো জিন্নাহ গো।

বাচ্চাদের জন্য জুস নিয়ে আসেন সত্যজিত রায়। বেহেশতের পুলিশ ভীড় সামলাতে হিমশিম খায়।

বেহেশতের এক পুলিশ চিৎকার করে বলে, এই দেবুদাটাই যত নষ্টের গোড়া। তাকে ৪৭ ধারায় ধরে নিয়ে যাবো। সে ফেসবুক স্ট্যাটাসে নিয়মিত পুলিশদের বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপায়।

চুনিলাল এসে বলে, এতো গরম দেখাবেন না মশাই; আপনারা পুলিশরা মানুষ হবেন কবে; ১৩২ জন শিশু প্রাণ হারিয়ে বেহেশতে এলো; এতোটুকু কষ্ট নেই আপনার মনে, লেগে আছেন দেবুর পিছে!

পুলিশ কুমড়োর মতো মুখ করে নেহেরুকে প্রোটোকল দিতে যায়। নেহেরু তড়িঘড়ি করে জিন্নাহর বাংলোতে ঢুকে যান পত্রিকায় মুখ ঢেকে। সত্যজিত রায় দেবুদাকে বলেন, মাসতুতো ভাই এলো। ঐ দেখো।

দেবুদা চেঁচিয়ে ওঠেন, ঐ যে নেহেরু আরেক ক্ষমতা লোভী; এই নেহেরু জিন্নাহর কারণে ভারতবর্ষের মানুষের জীবনে এখনো শনি লেগে আছে।

চুনিলাল চিৎকার করে ওঠে,গো নেহেরু গো, গো জিন্নাহ গো

বাচ্চারাও শ্লোগান দেয়, গো নেহেরু গো, গো জিন্নাহ গো।

গান্ধীজী এসে পড়েছেন এর মাঝে। নাত্থু মাথার ওপর ছাতা ধরে রেখেছে।

নাত্থু সত্যজিত রায়ের কাছে এসে বলে, এতো যে সেক্যুলার স্পিরিটের ছবি বানালেন; এখনতো ভারতে মুসলমান-খ্রীস্টানদের লাখ লাখ রুপির বিনিময়ে হিন্দু বানানো হচ্ছে। কোথায় গেল আপনাদের অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্র?

সত্যজিত রায়ের ইচ্ছা হয় এক চড় দিয়ে নাত্থুর নড়বড়ে দাঁতগুলো ফেলে দেন। কিন্তু উনি জীবনে কাউকে চড় দেননি। ইচ্ছা হয়েছে অনেকবার। কাউকে চড় দিতে ইচ্ছা করলেই হাতদুটো ট্রাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেন।

নেহেরু দেখেন জিন্নাহ পায়চারি করছেন আর সিগ্রেট খাচ্ছেন। নেহেরুকে দেখে ছুটে আসেন। জিন্নাহ ধুসর চোখে বলেন,

: আসলে দ্বি-জাতি তত্ত্বটাই ভুল ছিলো।

: সেতো জানি; এখন কী করা যায়। দ্বি-জাতিতত্ত্বের ডেথ টোল অনেক হয়ে যাচ্ছে। এটাতো একটা গ্রাজুয়াল হলোকস্ট করলাম আমরা দুজন মিলে।

: কিন্তু হিন্দু মুসলমান একসঙ্গে কী থাকতে পারতো!

: তা পারতো; আমরা গান্ধীজীর কথা না শুনে বিরাট ভুল করেছি। তিনি ছাড়া আমাদের বাঁচানোর কেউ নেই। এরকম গণ আন্দোলন হলে দোজখে রেখে আসবে আমাদের দুজনকে।

গান্ধীজী বাচ্চাদের সামনে করজোড়ে ক্ষমা চান।

: তোমাদের বসবাস যোগ্য ভূখন্ড গড়তে পারিনি আমরা। আমাদের ক্ষমা করে দিও।

একজন বাচ্চা চিৎকার করে বলে, আপনার ওপর কোন ক্ষোভ আমাদের নেই। আমরা জিন্নাহর বিচার চাই।

চুনিলাল নেহেরুর নামটাও মনে করিয়ে দেয়।

গান্ধীজী বলেন, দ্যাখো এটা সত্যি ওরা প্রধানমন্ত্রী গভর্ণর ইত্যাদি হতে চেয়েছিলো। আমাকে অখন্ড ভারত রাখতে দেয়নি; কিন্তু ওরা খুনী নয়। খুনী হচ্ছে জামাত-শিবসেনা এই দলগুলো। কারণ এরা ব্রিটিশদের রেজাকার ছিলো। জিন্নাহ-নেহেরু তো তবু স্বাধীনতা চেয়েছে; কিন্তু এইসব মওদুদী আর নাত্থুবাদীরা এরা খুনী; ধর্ম ব্যবসা করে। কংগ্রেস এবং মুসলীম লীগকে এরা প্রভাবিত করেছে; দলগুলোর ভেতরে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে দিয়ে। আজ যে তালেবান এরা মওদুদীর বদ্ধ উন্মাদ চিন্তার ফ্র্যাংকেন্সটাইন। আর ঐ যে বজরং-ঢঙ্গের লোকেরা এরা এক একটা বিকৃত নাত্থু।

এই সময় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কোত্থেকে ছুটে এসে নাত্থুর গালে একটা চড় কষে দেন আর বলেন, যে চড় খায় সে খায়। সত্যজিত রায় পকেট থেকে হাত বের করেন। কাজ হয়ে গেছে।

দেবুদা অবস্থান কর্মসুচী চালিয়ে যেতে চায়। দেবুদা ব্যস্ত তাই চুনিলাল টিভি বাইটগুলো দেয় থার্ড ফোর্সের পক্ষ থেকে। গান্ধীজী দেবুকে বোঝান, পাকিস্তানে জঙ্গীবাদ নির্মূল অভিযান চলছে। এই তালেবান আগাছা ছেঁটে ফেলতে পারলে এই শিশুদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।

চুনিলাল এসে বলে, আর বজরং-ওয়ালীদের কী করবেন, এরা বলছেন, হিন্দু হও অথবা ভারত ছাড়ো।

গান্ধীজী বলেন,মুসলমানেরা কী বৃটিশ যে ভারত ছাড়বে। এই ইস্যুতে মোদী কী করে!

চুনিলাল বলে, সেই ২০০২ সাল থেকে গুজরাটের কসাই নামেই খ্যাত সে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিষ্ক্রিয় থেকে, পুলিশকে নিষ্ক্রিয় রেখে নির্বিচারের মুসলিম নিধন হতে দিয়েছিলো লোকটা। মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে হেইট স্পিচ দিয়ে দিয়েই তো সে ক্ষমতায় এসেছে।

গান্ধীজী জিজ্ঞেস করেন, আর কী যেন নাম; ও হ্যা কলকাতার মমতা মেয়েটি, সে নাকি জামাত পুষছে আঁচলের তলে।

: হ্যাঁ বাপুজি দিদির আরেক বান্ধবী ঢাকায় আছে; সেই খালেদাকে দেখেই দিদি শিখেছে। ঢাকার দিদি আবার হরতাল ডেকে মানুষ পুড়িয়ে খায়।

: কী সর্বনাশ। এতো দেখছি ক্যানিবাল!

দেবুদা শিশুদের বলেন,সাম্যবাদী দলের নেতা গান্ধীজী চাইছেন তোমাদের জন্য তৈরী আনন্দ নিকেতনে তোমরা চলে যাও। আর কাম্যবাদী দলের দুই নেতা ভেতরে আটক; আমরা থার্ড ফোর্স চাই বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে; তোমরা কী চাও!

একজন শিশু চিৎকার করে বলে, নওয়াজ শরীফ আর ইমরান খানের মুন্ডু চাই; এরা সংলাপের নামে সময় নষ্ট করে রাক্ষস তালেবানদের আমাদের হত্যার সুযোগ করে দিয়েছে।

দেবুদা উত্তর দেয়, ওদের মুন্ডু থাকলে তো চাইবে!

বাচ্চারা হো হো করে হেসে ওঠে।

গান্ধী এক্সপ্রেসে করে বাচ্চাদের রিলোকেশান সেন্টারে নিয়ে যায় আনা। দেবুদা মুগ্ধ হয়। বিপদে আপদে আনাকেই পাওয়া যায়। আর পার্বতী ফেসবুকে সারাক্ষণ ছেলেদের সঙ্গে চ্যাটিং করে; ইদানীং টিভি সিরিয়াল দেখার বাতিক কমেছে মনে হয়। নতুন রোগ ফেসবুকিং।

বেহেশতে বঙ্গবন্ধুর বাসার কলিং বেল বেজে ওঠে। গৃহকর্মী খন্দকার মুশতাক গেট খুলে দেখে একটি চার বছরের শিশু।

বঙ্গবন্ধুকে এসে খবর দেয়, ছোট্ট একটা বাচ্চা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

বঙ্গবন্ধু বিরক্ত হন, এখানে আবার পারমিশান নেবার কী আছে! বঙ্গবন্ধু দৌড়ে বের হন। বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেন।

: বাবু তোমার নাম কী!

: জিয়াদ। আমি খেলতে খেলতে একটা খোলা পাইপের মধ্যে পড়ে যাই; তারপর কে একজন আমাকে কোলে করে আপনার বাসার সামনে রেখে গেছে।

বঙ্গবন্ধু জিয়াদকে কোলে নিয়ে বাড়ীর ভেতরে আসেন। মিসেস মুজিব আঁচল দিয়ে বাচ্চাটার মুখ মুছে দেন। চট করে একটু গরম দুধ এনে জিয়াদকে খাওয়ানো হয়। সোফায় বসে জিয়াদ বলে, আপনারা না থাকলে আমার যে কী হতো!

একপাশে সোফায় জননেতা আব্দুর রাজ্জাক বসে। উনি বঙ্গবন্ধুকে জানান, শাজাহানপুরের রেল কলোনীর একটি উন্মুক্ত ওয়াসার পাইপে পড়ে গিয়েছিলো জিয়াদ। ফায়ার ব্রিগেড তাকে উদ্ধার করতে পারেনি। বিএনপি ষড়যন্ত্র সূত্র দেয়, ওখানে জিয়াদ নেই; এসব সাজানো গল্প। আওয়ামী লীগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই সন্দেহ করার পর জিয়াদের আব্বা নাসিরকে পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে; ওর মৃতদেহ না পাওয়া গেলে বিএনপি যেমন ২১ অগাস্ট গ্রেণেড হামলার জজমিয়া কেস সাজিয়েছিলো; তেমনি আওয়ামী লীগরা নাসির মিয়া কেস সাজাতো।

এমনকি জিয়াদের খেলার সাথীদেরও পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সারমেয় ভঙ্গিতে। ফায়ার ব্রিগেড রণে ভঙ্গ দেবার পর তিনজন জনতা মৃতদেহটি উদ্ধার করে। ওদের শুরুতে উদ্ধার কাজে অংশ নিতে দেয়নি সরকারের চৌকিদাররা।

বঙ্গবন্ধু ম্লানমুখে বলেন, এভাবে যদি গরীব মানুষ কষ্ট পায়; রাষ্ট্র যদি তাদেরকে এখনো ম্লেচ্ছ ভাবে; তাইলে জিডিপি গ্রোথ ধুয়ে কী পানি খাবো!

(চলবে)

১২তম পর্বের লিংক

১০ম পর্বের লিংক

১৭৭ পঠিত ... ১৭:৪৭, মে ২১, ২০২৪

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top