লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন
১.
জহির শুনেছে আধুনিক মেয়েরা নাকি ‘বিয়ার্ড লুক’ বা দাড়িওয়ালা ছেলেদের জন্য পাগল। তাই সে-ও গত এক মাস ধরে দাড়ি কাটে না। কিন্তু সমস্যা হলো, তার গালটা যেন মরুভূমির এক রুক্ষ জমি। অনেক কষ্টে পুরো মুখে মাত্র সাতগাছা দাড়ি গজিয়েছে। সেই সাতটা দাড়ি জহিরের চিবুকে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কোনো এক পরিত্যক্ত ভিটায় সাতটা রুগ্ন কাক বসে রোদ পোহাচ্ছে।
জহির যখন আয়নার সামনে দাঁড়ায়, তার মনে হয় এই সাতটা দাড়ি আসলে তার অকালপক্ক দুর্ভাগ্যের সাতটি স্তম্ভ। তার বড় ভাই যখন অবিন্যস্ত চুলে, চিবুকভর্তি ঘন দাড়ি নিয়ে বাইক নিয়ে বের হয়, তাকে মনে হয় গ্রিক দেবদূত। আর জহির যখন নিজের চুলে হাত দেয়, তার মনে হয় এক দলা কাদা আর কয়েকটা খড়কুটো নিয়ে কোনো এক পাগল পাখি তার মাথায় একটা কুৎসিত বাসা বানানোর চেষ্টা করেছে। জহিরের জন্য ‘এলোমেলো’ মানেই হলো এক প্রলয়ংকরী বিপর্যয়।
২.
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। জহির আজ খুব সাধারণ একটা বাসন্তী পাঞ্জাবি পরেছে। পাঞ্জাবিটা তার শরীরের চেয়ে একটু বেশিই ঢিলেঢালা, ফলে তাকে দেখতে লাগছে জন্ডিসে আক্রান্ত কোনো এক পরিশ্রান্ত বিড়াল। জহির যখন হাঁটে, তার মনে হয় সে ক্লান্ত। অথচ সে মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে। তার আয়নায় প্রতিচ্ছবি পড়লে সে মাথা নিচু করে ফেলে; তার মনে হয় প্রতিটি মানুষ তাকে জাজ করছে। সে যেন এক অচল পাঁচ টাকার নোট:পকেটে থাকলে ভারী লাগে, কিন্তু বাজারে কেউ নিতে চায় না।
অফিসে গিয়ে জহির দেখল শায়লা আজ লালে লাল। জহির যখন তার কিউবিকেলের সামনে দাঁড়াল, তার সেই পুরনো ঘাড়-ব্যথা শুরু হলো। শায়লা যখন সোজা হয়ে বসে, তাকে ঘাড় উঁচিয়ে কথা বলতে হয়। এই কয়েক ইঞ্চির শারীরিক দূরত্ব জহিরের কাছে হিমালয় ডিঙানোর চেয়েও কঠিন।
জহির বিড়বিড় করে বলল, শায়লা... মানে আজ তো ভ্যালেন্টাইনস ডে... আপনার জন্য এই চকলেটটা।
শায়লা কাজ থামিয়ে মাথা তুলল। জহিরের সাতগাছা দাড়ির দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ থতমত খেয়ে রইল।
জহির ভাই, আপনার গালে ওগুলো কী? জ্যান্ত কিছু নাকি? আর আপনাকে তো দেখে মনে হচ্ছে আপনি গত এক বছর রিহ্যাব সেন্টারে ছিলেন আর আজই প্রথম দিনের আলো দেখছেন! আপনি কি ঠিক আছেন?
৩.
জহির ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে একা বসল। তার মনে হলো সে কোনো গল্পের নায়ক নয়, বরং সিনেমার পেছনের সেই ঝাপসা হয়ে যাওয়া এক্সট্রা আর্টিস্ট। তার অস্তিত্বের দাবি জানানোর পথে তার কম উচ্চতা আর ওই সাতগাছা দাড়ি যেন চিরস্থায়ী দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশের টেবিলে দীর্ঘদেহী কলিগরা হাসাহাসি করছে, আর জহির ভাবছে তার ওই সাতটা দাড়ি যদি কথা বলতে পারত, তবে নিশ্চয়ই তাকে গালি দিয়ে বলত, ভাই, আমাদের মুক্তি দাও, আমরা লজ্জা পাচ্ছি!
জহির নিজেকেই একটা প্রমিজ করল, সে আর কখনও সুন্দর হওয়ার বৃথা চেষ্টা করবে না। সে স্বীকার করে নিল যে সে ক্লান্ত, সে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, তার দাড়ি গজায় না আর এটাই তার পরম সত্য।
৪.
অফিস ছুটির সময় শায়লা জহিরের হাত ধরল না ঠিকই, কিন্তু জহিরের কিবোর্ডের ওপর একটা ছোট ভাঁজ করা কাগজ রেখে গেল। জহির কাঁপাকাঁপা হাতে চিরকুটটা খুলল। সেখানে লেখা, জহির ভাই, আপনার ওই অদ্ভুত সাতটা দাড়ি না রাখলে কি খুব ক্ষতি হতো? আমি জানি আপনি কারো মতো হওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আমার কাছে আপনার ওই ‘ফ্যাকাশে জহির’ মুখটাই বেশি রিয়েল মনে হয়। কাল বিকেলে কি আমার সাথে এক কাপ কফি খাবেন? তবে শর্ত একটা! ওই দাড়িগুলো কামিয়ে আসবেন। মা বলেছিলেন বাসায় দাড়িওয়ালা মানুষ না নিতে, ভাগ্য ভালো আপনার মুখে যা আছে তাকে অন্তত দাড়ি বলা চলে না! আসবেন তো?
জহির চিরকুটটা হাতে নিয়ে জ্যামে আটকে থাকা বাসের জানালার প্রতিফলনের দিকে তাকাল। জহিরের মনে এক বিচিত্র ডিলেমা। শায়লা কি তাকে সত্যিই দেখছে? নাকি তার এই ‘অপূর্ণতা’ নিয়ে করুণা করছে? শায়লা কি কাল বিকেলে সত্যিই কফি শপে আসবে, নাকি এটা নিছক একটা প্র্যাঙ্ক?
জহির বাড়ির গলিতে ঢোকার সময় দেখল তার বড় ভাই বাইক নিয়ে ফিরছে। ভাইয়া বলল, কীরে জহির, কী খবর? ভ্যালেন্টাইন কেমন কাটল?
জহির শান্ত গলায় বলল, খুব ভালো ভাইয়া। আজ জানলাম, কাক হয়ে বেঁচে থাকাটাও এক ধরনের আর্ট।
জহির নিজের ঘরে ঢুকে ব্লেডটা হাতে নিল। আয়নায় তাকিয়ে সে নিজের সাতগাছা দাড়ির দিকে হাসল।যে হাসিতে মায়া আছে, আবার বিদ্রূপও আছে। কাল কি জহির ক্লিন শেভ করে শায়লার সামনে যাবে? নাকি শায়লা আসলে তাকে নয়, বরং তার ‘অসহায়ত্ব’কে ভালোবেসে ফেলেছে?
জহির ব্লেডটা গালের কাছে নিয়ে থেমে গেল। কালকের বিকেলটা কি নীল হবে, নাকি জহির আবার সেই ‘আক্ষেপের দশকেই’ ফিরবে? উত্তরটা জহিরের হাতে ধরা ওই ব্লেড আর শায়লার রহস্যময় হাসির মাঝখানে ধোঁয়াশা হয়েই রইল।



পাঠকের মন্তব্য