লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন
ফেব্রুয়ারি মাস মানেই বাতাসে প্রেমের রেণু আর পকেটে টান পড়ার মহোৎসব। এই মাসেই আসে সেই বহুল আলোচিত 'কিস ডে' বা চুমু দিবস। চারদিকে যখন তথাকথিত সুন্দর-সুন্দরীরা একে অপরের মুখে প্রায় ৮ কোটি ব্যাকটেরিয়া আদান-প্রদানের 'ট্রেড ফেয়ার' বসাতে ব্যস্ত, তখন আমাদের মতো 'অ্যাবস্ট্রাক্ট' চেহারার অধিকারীরা কীভাবে রাজকীয় শান্তিতে দিন কাটাচ্ছি সেই পরম সত্যের এক বৈজ্ঞানিক, অর্থনৈতিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো–
১.
বিজ্ঞান বলে, একটা ১০ সেকেন্ডের প্যাশনেট কিস-এ নাকি প্রায় ৮ কোটি ব্যাকটেরিয়া আদান-প্রদান হয়। সুন্দর চেহারার অধিকারী ব্যক্তিরা আজ স্বেচ্ছায় সংক্রমণের এক বিশাল রিস্ক নিচ্ছে।
আর আমাদের? আমাদের চেহারা যেহেতু প্রকৃতি 'ফায়ারওয়াল' দিয়ে প্রটেক্ট করে পাঠিয়েছে, তাই কোনো ব্যাকটেরিয়ার সাধ্য নেই আমাদের স্কিন টাচ করে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম আজ আমাদের দাঁড়িয়ে স্যালুট দিচ্ছে, ‘বস, আপনাদের চেহারা 'অ্যাবস্ট্রাক্ট' বলেই আজ আমরা বেঁচে গেলাম!’ আমাদের কোনো অ্যান্টি-বায়োটিক লাগে না, আমাদের 'নিরাপদ' চেহারাই আমাদের আসল অ্যান্টি-বডি!
২.
বাজার ঘুরে দেখলাম, একটা ভালো মানের লিপস্টিক বা লিপবামের যা দাম, তাতে আমাদের তিন দিনের ডাবল ডিমের মামলেট দিয়ে নাস্তা হয়ে যায়। সুন্দরীদের সেই দামী লিপস্টিক আজ সুন্দরদের গালে বা কপালে লেপ্টে গিয়ে নষ্ট হবে—অর্থাৎ পিওর ইকোনমিক লস।
আর আমাদের ঠোঁট? আমাদের ঠোঁট আজ কেবল কাপের ধোঁয়া ওঠা কড়া লিকারের চা আর তেলতেলে গরম শিঙাড়া স্পর্শ করার জন্য সংরক্ষিত। আমাদের ঠোঁটে কোনো 'আর্টিফিশিয়াল' কেমিক্যাল নেই, আছে কেবল খাঁটি সরিষার তেলের চকচকে আভা। আমাদের কোনো অপচয় নেই, কেবলই ইনভেস্টমেন্ট!
৩.
আজকের দিনে সুন্দর চেহারার ছেলেরা গার্লফ্রেন্ডের হাত ধরে রেস্টুরেন্টে 'ওয়েটিং লিস্টে' ঝুলে আছে। আর আমরা? আমরা তুরাগ বাসের দরজায় এক পা দিয়ে বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলে আছি। প্রিয়জনের হাত ধরলে নাকি মন ভালো হয়, কিন্তু আমরা বলি—তুরাগ বাসের রড শক্ত করে ধরলে শুধু মন না, হাতের বাইসেপও ভালো হয়! সুন্দরীদের কপালে যখন দামী মেকআপ গলে ঘাম ঝরছে, আমাদের কপালে তখন বাসের জানালার ধুলোবালি এক ঐতিহাসিক 'স্মোকি লুক' তৈরি করেছে। এই লুক পেতে সেলিব্রেটিরা হাজার টাকা খরচ করে, আর আমরা সেটা ফ্রি-তে পাচ্ছি!
৪.
শুনেছি চুমু খেলে নাকি 'অক্সিটোসিন' হরমোন বাড়ে আর স্ট্রেস কমে। সুন্দর ছেলেরা আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, যেন আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে স্ট্রেসড পাবলিক। আরে ভাই, চুমু খেলেই যদি স্ট্রেস কমত আমাদের সাহেব আমির সাহেব হতেন দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ।
৫.
রাস্তার মোড়ে বা পার্কে বসে যারা আজ 'রোমান্টিক' হওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের চোখে-মুখে কী এক চোর-চোর ভাব! এই বুঝি পুলিশ এলো, এই বুঝি এলাকার 'নীতি পুলিশ' মুরুব্বিরা এসে ধরল।
আমাদের সেই টেনশন নেই। আমাদের চেহারার 'ইনোসেন্স' (বা অসহায়ত্ব) দেখে পুলিশ আমাদের উল্টো সম্মান দিচ্ছে। আমাদের এই ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মিডল ক্লাস চেহারা হলো আসলে একটা 'অদৃশ্য বর্ম'। ছিনতাইকারীও আমাদের দেখলে ভাবে, ‘বেচারা নিজেই তো ভুক্তভোগী, এর কাছে আর কী থাকবে?’ এই যে নিরাপত্তা, এটা কি কোনো 'চকলেট বয়' টাইপ চেহারার কেউ পাবে? কক্ষনও না!
৬.
ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করলেই আজ দেখবেন ক্লোজ-আপ শট। কারও ঠোঁট কারও গালে, ক্যাপশনে 'সিলড উইথ আ কিস'। এই ছবিগুলো তুলতে গিয়ে তাদের অন্তত ৫০টা রিটেক দিতে হয়েছে, মুখ বাঁকা করতে করতে তাদের চোয়ালে ব্যথা হয়ে গেছে।
আমাদের সেই ডিজিটাল প্যারা নেই। আমাদের প্রোফাইল পিকচারে আমরা সেই ২০১৭ সালের একটা ঘোলাটে ছবি দিয়ে রেখেছি। আমাদের ইনবক্সে আজ কোনো 'চুমু ইমোজি'র ট্রাফিক জ্যাম নেই, শুধু বিকাশ থেকে মেসেজ এসেছে, ‘৫ হাজার টাকা জিততে চাইলে ক্লিক করুন।’ অন্তত বিকাশের লোকগুলো তো আমাদের চেহারার দিকে না তাকিয়ে আমাদের কোটিপতি বানানোর স্বপ্ন দেখে! এটাই তো সত্যিকারের ইনক্লুসিভ সোসাইটি।
...
পুনশ্চ: আজকের দিনে এসে আমরা এক পরম সত্য উপলব্ধি করেছি, যাদের চেহারা 'কিউবিজম' স্টাইলের, তাদের জন্য 'কিস' মানে কেবলই হার্শি’স চকলেট। আমাদের সাহস বেশি কারণ আমরা জানি, আমাদের কপালে কেউ চুমু না দিলেও ভাগ্যের 'কিসমত' আমাদের অন্তত পকেট খালি হওয়া আর ব্যাকটেরিয়া আদান-প্রদান থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে।
যাদের চেহারা দেখে মনে হয় সৃষ্টিকর্তা বুঝি ডিজাইন করার সময় একটু তাড়াহুড়ো করেছিলেন, তারা আজ একটু চওড়া করে হাসুন। কারণ, আমাদের এই ঠোঁট আজ কোনো মিথ্যে রোমান্টিকতায় ব্যবহৃত না হয়ে বরং এক বাটি বিরিয়ানি বা এক প্লেট কাবাব ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর চেয়ে সার্থক ব্যবহার আর কী হতে পারে?
আমরা কোনো মোহের দাস নই, আমরা আমাদের চেহারার সম্রাট!


