গণভোটে ’হ্যাঁ’ নাকি ’না’ ভোট দেবেন- এটা অনেকেই জানতে চান! আবার হ্যাঁ দিলে কী হবে আর না দিলেই বা কী হবে সেটাও জানতে চেয়েছেন কেউ কেউ!
দেখেন, ভোট আপনার ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয়। আমি যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত না, ফলে কোনো পক্ষে ভোট দেওয়ার ক্যাম্পেইন করাও আমার কাজ না। তবে কোন ভোট দিলে কী হবে—সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে পারি।
গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন থাকবে চারটা। প্রথম তিনটা প্রশ্ন বেদরকারি। কারণ, চার নম্বর প্রশ্নের ভেতরেই প্রথম তিনটা প্রশ্ন আছে। ৪ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে, আপনি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন দেখতে চান কিনা? জুলাই সনদের ভেতরেই প্রথম ৩ প্রশ্নে উল্লেখিত সব বিষয়বস্তু আছে। তাহলে ওই ৩টা প্রশ্ন আলাদা করে জিজ্ঞেস করার কী দরকার ছিল? আমার ধারণা ভোটারদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য এটা করা হয়েছে! আপনি এই ৩ প্রশ্নের সাথে দ্বিমত হলেও কারো কিছু যায় আসে না…
আসলে এখানে প্রশ্ন হলো ১টা! ৪ নম্বরটা! আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন দেখতে চান! ব্যস!
তাহলে আমাদের দেখা দরকার জুলাই সনদে কী আছে?
এটা বড় ডকুমেন্ট। মোট ৮৪টা ধারা আছে। ৪৭টা সংবিধান সংশোধন বিষয়ক, বাকি ৩৭টা আইন/অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে। হ্যাঁ জিতলে আগামী সংসদ এই ৮৪টা ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে, না জিতলে জুলাই সনদ বাদ! ৮৪টা নিয়ে তো কথা বলা সম্ভব না, আমি প্রধান প্রধান কিছু ধারার কথা বলি!
১/ হ্যাঁ পাশ হলে সংবিধান থেকে বাঙালি পরিচয়টা মুছে যাবে। শুধু নাগরিক হিসেবে ’বাংলাদেশী’ লেখা থাকবে। বাঙালি পরিচয়টা আমরা ৫২’র পর থেকে ৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে লড়াই করে পেয়েছিলাম, ওটা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়। মুক্তিবাহিনী মিছিল করত: তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি…
২/ ৭২ এর সংবিধানের মূলনীতি চারটা: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এসব থাকবে না। তার জায়গায় বসবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি! এগুলোর প্রত্যেকটা ভেগ টার্ম; বরং আগের চারটা স্পেসিফিক ছিল! সমাজতন্ত্রে আমরা নেই, ওটা বাদ দিলে আমার আপত্তি ছিল না, কিন্তু বাকি তিনটা কী দোষ করল?
৩/ ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা শব্দগুলো থাকবে না। তার জায়গায় সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা যোগ করা হবে। বাংলাদেশ যে এখনও অন্তত কাগজেকলমে সেক্যুলার কান্ট্রি সেই গৌরবটা হারাতে হবে। আলী রিয়াজের মতো আমেরিকায় থাকা আপাদমস্তক এক নাস্তিক মানুষ এই কাজটা কী করে করলেন কে জানে! ওনারা নিজেরা আমেরিকায় বাস করবেন কিন্তু বাংলাদেশকে বানাবেন ধর্মীয় রাষ্ট্র। এই কারণে আমি এই কমিটির প্রতি চরম ক্ষুব্ধ!
৪/ সংবিধানে এখন ২২টা মৌলিক অধিকারের কথা বলা আছে। এর সাথে আরও কিছু যোগ হবে। যেমন ধরেন নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট চালু রাখা...
৫/ সংসদে দুইটা আলাদা কক্ষ থাকবে। উচ্চকক্ষে ১০০ আসন ও নিম্নকক্ষে ৩০০ আসন থাকবে। সংসদ নির্বাচনে যে যত ভাগ ভোট পাবে তারা ততভাগ আসন পাবে উচ্চকক্ষে। ধরেন কেউ ৫০ ভাগ ভোট পেলে ৫০ সিট তাদের। এবারের ইলেকশনে যদি মামুনুল হকের দল ২% ভোট পায় তাহলে তার দলের ২ জন উচ্চ কক্ষের প্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পাবে।
৬/ এখন এক ব্যক্তি যতবার ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রী হতে পারে। ‘হ্যাঁ’ পাশ হলে সেটা সর্বোচ্চ ১০ বছরে নেমে আসবে।
৭/ এখন প্রধানমন্ত্রী একইসাথে তার নিজ দলের প্রধানও থাকতে পারেন। যেমন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি আওয়ামীলীগেরও সভাপতি ছিলেন। হ্যাঁ জিতলে ওটা পারবেন না।
৮/ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান সংবিধানে যুক্ত হবে। এটা নিয়ে অনেকগুলো ধারা আছে ও বিস্তারিত বলা আছে যে কীভাবে গঠন হবে, কারা সদস্য হবে এসব!
৯/ সংসদে নারী সদস্য সংখ্যা ক্রমান্বয়ে ১০০তে উন্নীত করা হবে। আগামী ইলেকশনে দলগুলো কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিবে, পরের ইলেকশনে ১০%... এভাবে ৩৩% পর্যন্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে। এটা নিয়ে কথা আছে। গত সংসদেও ১৯% নারী প্রতিনিধি ছিল, অথচ এবার যারা মনোনয়ন ফরম কিনেছে তারা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪%! জামাত ও ইসলামি দলগুলো ১ জনকেও মনোনয়ন দেয় না। বড় একটা অংশ স্বতন্ত্র! মানে ইউনূস সরকার যে নির্বাচন করবেন এর মধ্য দিয়ে সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে অলমোস্ট সর্বনিম্ন সংখ্যক নারী সংসদে যাচ্ছেন বলে ধারণা করি। একটা এনজিও সরকারের কাছ থেকে এটা আশা করিনি। ওনাদের জন্য সদিচ্ছা থাকত, তাহলে এই সংসদ থেকেই কেন ৫% এর বিধান বাধ্যতামূলক করলেন না?
১০/ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে অনেকগুলো ধারা আছে। রাষ্ট্রপতি আর প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারবেন না, ওটা আপিল বিভাগ থেকে হবে, দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য রাস্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে পারবে, এখন প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়, তখন গোপন ভোটে নির্বাচন করতে পারবেন—এসব!
১১/ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে অসংখ্য ধারা আছে সনদে। এসব ধারায় সরকারের পরিবর্তে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টকে ক্ষমতায়িত করা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, প্রত্যেক বিভাগে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপন, হাইকোর্টের নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে প্রধান বিচারপতি করবেন।
১২/ পিএসসির লোকবল এখন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেন। ‘হ্যাঁ’ পাশ হলে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, বিরোধী দলের চিফ হুইপ, এরকম ৭ জনের টিম এই কাজ করবেন।
১৩/ এখন দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয় প্রধানমন্ত্রী। ‘হ্যাঁ’ পাশ হলে সংসদ সদস্য, আপিল বিভাগের প্রতিনিধি, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিনিধি এরকম লোকবলের সমন্বয়ে এই নিয়োগে হবে।
১৪/ এখন সব সরকারি কর্মচারি সরকারের অধীনে থাকে, তখন স্থানীয় সরকারের সব প্রতিনিধি এমপিদের অধীনে থাকবে। মানে যেখানে যে দলের এমপি সেখানে জেলা উপজেলা ইউনিয়ন চলবে তার মতো করে। এটা বাস্তবতা বিবর্জিত প্রস্তাব। এভাবে জনপ্রশাসন ভালভাবে চলার নজির কোথাও নেই।
১৫/ সরকারি কর্মচারির বিরুদ্ধে মামলা করতে দুদককে সরকারের অনুমতি নিতে হবে না। আইনজীবিরা রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন হতে পারবে না। দুটোই ভাল প্রস্তাব!
১৬/ এখন কেউ সাজা পেলে ৫ বছর পর ইলেকশন করতে পারে, ‘হ্যাঁ’ জিতলে সেই ব্যক্তির জনপ্রতিনিধি হওয়ার খায়েশ শেষ। একবার সাজা হলে সে আর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবে না? রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা ও বিচারবিভাগকে প্রভাবিত করার প্রবণতা তাতে বাড়বে না?
১৭/ ‘হ্যাঁ’ জিতলে কালো টাকা সাদা করার আইন করার কথা বলা হয়েছে।
১৮/ এখন বিভাগ ৮টা আছে, তখন ১০টা হবে। কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ হবে।
আগেই বলেছি, লিস্টটা বেশ লম্বা। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, আমি অনেকগুলো সুপারিশের পক্ষে। কিন্তু অনেকেগুলো সুপারিশের বিপক্ষেও আমি। বিশেষ করে রাষ্ট্রের চার মূলনীতি, ধর্মনিরেপেক্ষতার মত বিষয় বাদ দেওয়ার বিপক্ষে আমার অবস্থান। এতে করে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য দেশটা আরও কঠিন হয়ে যাবে।
যদি জিজ্ঞেস করেন যে, এই যে ১৭% থেকে দারিদ্রতার হার ২৮% এ উঠে গেল, মানুষ চারটা ভাত খেতে চাইছে, এই যে শিক্ষার মানের ভয়াবহ অবস্থা, স্বাস্থ্যখাতে বিশৃঙ্খলা, একটা ভাল মানের সরকারি হাসপাতাল নাই, একটা ক্যান্সার হাসপাতাল নেই, প্রবল দুর্নীতি-চুরি-চামারি বন্ধ, দিনেদুপুরে মানুষ হত্যা, ধর্মের নামে রাজনীতি করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা কি বন্ধ হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। বরং সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা বাদ দেওয়ার আইডিয়াটা পাকিস্তানের সংবিধান থেকে নেওয়া হয়েছে, এটা খুবই বিরক্তিকর!
বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও না ভোট জিতে নাই। সরকার জিততে দেয় নাই। এবারও সরকার ‘হ্যাঁ’কে জেতাতে উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ তাদের উচিৎ ছিল ওপরের বিষয়গুলো মানুষকে জানানো। মানুষ সিদ্ধান্ত নিত সে কোনটার পক্ষে রায় দেবে...
ভোট আপনার, সিদ্ধান্তও আপনার!



পাঠকের মন্তব্য