লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন
সকালবেলা মাজেদা খালার বিকট চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙল। আমি বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে এক কাপ বিস্বাদ চা খাওয়ার স্বপ্ন দেখছিলাম। খালার চিৎকারে সেই স্বপ্নটা মাঝপথেই 'ছায়া' হয়ে গেল।
আমি রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম, খালা বঁটি নিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন। তার সামনে একটা পলিথিন ব্যাগ। ব্যাগের ভেতরে কিচ্ছু নেই, কিন্তু ব্যাগটা ফুলে আছে।
আমি বললাম, খালা, সকাল সকাল বঁটি নিয়ে কার মুন্ডুপাত করবা?
মাজেদা খালা দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, হিমু, তুই তোর খালুকে আজই এই বাড়ি থেকে বের করবি। সে বাজার থেকে দেড় কেজি ওজনের এক ইলিশ মাছের 'ছায়া' কিনে এনেছে। মাছওয়ালা নাকি দয়া করে আসল মাছটা তার গদিতে রেখে শুধু মাছের ছায়াটা এই ব্যাগে ভরে দিয়েছে। তোর খালু এখন বলছে, আমি যেন এটা ধুয়ে হলুদ-মরিচ মাখাই!
খালু সাহেব পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তার চোখে এক অদ্ভুত জ্যোতি। তিনি বললেন, মাজেদা, তুমি সেকেলে রয়ে গেলে। আসিফ মাহমুদ সাহেব যখন ছায়ামন্ত্রিসভা করতে পারেন, আমি কেন ছায়া-ইলিশ খেতে পারব না? এই মাছের কোনো কাঁটা নেই, কোলেরস্টেরল নেই, এমনকি ধোয়ারও ঝামেলা নেই। প্যানটা চুলার ওপর ধরলেই ছায়া-ভাজি হয়ে যাবে।
আমি ব্যাগটার দিকে তাকালাম। ব্যাগটা শূন্য, কিন্তু খালু সাহেবের আত্মবিশ্বাস টইটম্বুর। আমি বললাম, খালু সাহেব, মাছের ছায়া তো কিনলেন, কিন্তু দাম কি আসল টাকা দিয়ে দিয়েছেন?
খালু সাহেব তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন, পাগল নাকি? আমি কি অত বোকা? আমি মানিব্যাগটা পকেট থেকে বের করে সেটার ছায়াটা মাছওয়ালার হাতে ঘষে দিয়ে এসেছি। মাছওয়ালাও খুব খুশি। সে বলল, 'স্যার, আসল টাকা তো ইজারাদার আইসা নিয়া যায়, ছায়া-টাকা কেউ কাইড়া নিতে পারবো না।'
বাদল এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। সে হঠাৎ ঘরে ঢুকে বলল, মা, তুমি চিন্তা কোরো না। আমি ছায়া-অর্থমন্ত্রী হিসেবে একটা প্রজ্ঞাপন জারি করেছি। আজ থেকে রান্নায় কোনো তেল লাগবে না। তেলের শিশিটা কড়াইয়ের ওপর ধরে রাখলে যে ছায়াটা পড়বে, তাতেই রান্না হয়ে যাবে। এটাকে বলে 'জিরো ক্যালরি শ্যাডো কুকিং'।
মাজেদা খালা বঁটিটা সশব্দে মেঝেতে ফেলে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি বুঝলাম, আজ কপালে আসল ভাত জুটবে না।
বিকেলে রূপার চিঠি এল। রূপা লিখেছে—
হিমু,
মা ইলিশ মাছের পেটি আর সরষে রেঁধেছে।কিন্তু তোমার জন্য পাঠাইনি। আমি জানি তুমি এখন ছায়া-ইলিশের গন্ধে মাতোয়ারা। চিঠির খামের ভেতরে এক চিমটি লবণের ছায়া পাঠিয়েছি। আজ রাতে ওটা দিয়েই তোমার ডিনার সেরে নিও। আমার সাথে দেখা করার দরকার নেই, আমার ছায়াটা বিকেল পাঁচটায় রমনা পার্কে একা বসে থাকবে। তুমি চাইলে ওটার পাশে গিয়ে বসতে পারো।
রুপা
আমি চিঠিটা হাতে নিয়ে বারান্দায় এলাম। রোদ পড়ে আসছে। খালু সাহেব নিচে দাঁড়িয়ে ড্রেন পরিষ্কার করা মেথরকে ধমকাচ্ছেন। তিনি বলছেন, এই মিয়া, ড্রেনের ময়লা কেন পরিষ্কার করছ? ওটার ওপর একটা ঢাকনার ছায়া দিয়ে দাও, গন্ধ আর বেরোবে না। আমি তো ছায়া-পরিবেশ মন্ত্রী হওয়ার পাইপলাইনে আছি!
আমি খামটা খুললাম না। রূপার হাতের লেখার ওপর আঙুল বুলালাম। খামটা ভেজানো হয়নি, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, খামের ভেতর থেকে সরষে ইলিশের একটা হালকা ঘ্রাণ আসছে। কিন্তু সেটা কি আসল ঘ্রাণ নাকি ঘ্রাণের ছায়া?
সূর্য ডুবে গেল। চারপাশের সব ছায়া দীর্ঘতর হতে হতে একসময় অন্ধকারের সাথে মিশে গেল। খালু সাহেব ঘর থেকে অন্ধকারেই চেঁচিয়ে বললেন, মাজেদা, বাতি জ্বালিও না! এখন থেকে আমরা ছায়া-আলোতে থাকব। কারেন্ট বিল বেঁচে যাবে!
অন্ধকার ঘরে আমি বসে রইলাম। রূপার না-খোলা চিঠিটা হাতের মুঠোয়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অন্ধকারে মানুষের কায়া দেখা যায় না, কিন্তু মনে হয় সারা ঘর জুড়ে অসংখ্য অদৃশ্য ছায়ামন্ত্রীর আনাগোনা শুরু হয়েছে। তারা নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলছে, সব হবে, সব হবে... শুধু দেখা যাবে না।
অসমাপ্ত অন্ধকারটা ক্রমশ গাঢ় হতে লাগল...



পাঠকের মন্তব্য