সাম্প্রতিক নির্বাচনে দেশের কোন কোন এলাকায় ইসলামপন্থীরা বেশি ভোট পেয়েছে; তা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বেশ জল্পনা-কল্পনা লক্ষ্য করলাম। বাংলাদেশে যেহেতু হিন্দুত্ববাদী মনোভঙ্গিটাই প্রগতিশীলতা বলে অনুশীলিত; তাই বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে গেরুয়া প্রগতিশীলেরা বলে উঠল, উত্তরবঙ্গের লোক মফিজ তো, তাই ইসলামপন্থীদের ভোট দিয়েছে। এই সুইপিং কমেন্ট যারা করছে, এদের প্রোপিক দেখলে বোঝা যায় দারিদ্র্যে বিশীর্ণ নদীভাঙ্গনের মানুষ ভাগ্যান্বেষণে রাজধানী ঢাকায় ছুটে এসে বস্তির ছাপড়া থেকে ক্রমান্বয়ে দালানে উঠে; কিংবা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে বাড়ি-জমি দখল করে প্রচণ্ড জাতে উঠে জাত্যাভিমানে ভুগছে।
আর আওয়ামী লীগের পতনে 'অখণ্ড ভারতে'র স্বপ্ন দূরাশা হয়ে যাওয়ায় এখন ঘন ঘন ইসলামকে দুষছে।
সীমান্ত হত্যা, পদ্মা-তিস্তা নদীতে পানি আটকে মরুকরণে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। কৃষিনির্ভর এই জনপদগুলোতে ফারাক্কা বাঁধ অভিশাপ হিসেবে বিরাজ করে। শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা আটকে রেখে খরা সৃষ্টি আর বর্ষা মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধ খুলে দিয়ে বন্যায় প্লাবিত করা; হিন্দুত্ববাদী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই নদী আগ্রাসনের ভিক্টিম এই এলাকার মানুষ বাংলাদেশে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাখান করে। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং সম্পর্ক আছে প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শত্রুতা মোকাবেলা করার।
ভারত তার প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের সীমান্তে কোন হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সাহস পায়না। কিন্তু বাংলাদেশের সরকারগুলোর ভারতের প্রতি নতজানু নীতির কারণে; বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দিল্লি তার শৌর্য ও বীর্য যতটুকু আছে তা প্রদর্শন করে। যে জনপদে সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকে কিশোরীর লাশ; যে এলাকায় প্রায়ই সীমান্তে হত্যার লাশ নিয়ে ফিরে আসে গ্রামবাসী; সেখানে খুনে প্রতিবেশীর প্রতি ক্ষোভ জন্মাবে সেটাই স্বাভাবিক।
কাজেই গেরুয়া প্রগতিশীলদের ঐ কেষ্টা ব্যাটাই চোর (ইসলাম ব্যাটাই চোর) জাতীয় যে বয়ান; তাতে নরভোজিতার এক্সরে রিপোর্ট আছে তা স্পষ্ট। যে কারণে ভারতবর্ষের এত জায়গা থাকতে পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে ঢুকেছিল বৃটিশ উপনিবেশ; সেই একই কারণে ভারত বাংলাদেশে তার ছায়া উপনিবেশ স্থাপন করতে পেরেছে। ব্যক্তিগত লাভের জন্য মাতৃভূমিকে শত্রুর হাতে তুলে দেবার মীরজাফর-জগতশেঠ-এর ডিএনএ আমাদের আশেপাশেই কিলবিল করে; ফেসবুকে নির্লজ্জের মতো দাঁত কেলিয়ে হাসে।
ঠেলেগুঁজে কোনমতে একটু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পারলেই; ছাপড়ি ভদ্রলোক সাজার পথ খোঁজে। বেঙ্গল রেনেসাঁ অনেক কষ্টে ভদ্রলোকের একটা কস্টিউম দাঁড় করিয়েছিলো। সেগুলো পরে ভদ্রলোক সেজে ফেসবুকে এসে সমাজবিজ্ঞানী হয়ে ব্যাখ্যা করে; দারিদ্র্য-শিক্ষার অভাব-ইহকালে সুখ না পেয়ে ওরা ইসলামপন্থীদের ভোট দিয়েছে। নিজে যে সাংস্কৃতিক দারিদ্র্য, ইংরেজি শিক্ষার অভাব ও হীনমন্যতা থেকে গেরুয়া প্রগতিশীল হয়ে 'অখণ্ড ভারতে' স্বর্গ খুঁজছে; সেই পশ্চাদপদতার কথা তাকে কে মনে করিয়ে দেবে!
সুলতানি, মুঘল ও নবাবী আমলের মুসলিম এরিস্ট্রোকেসির অঞ্চল এই উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গ। সুলতানি আমল থেকে হিন্দু-মুসলমান শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সংস্কৃতি এখানে। বাংলা ভাষার উচ্চারণে; কবিতা-সংগীত-সরলতা-ঔদার্য্যে আনন্দময় এক জনপদ। ফারাক্কা সন্ত্রাসে পদ্মা ও তিস্তা শুকিয়ে যাবার পর; ইতিহাসের সমৃদ্ধতম এই অঞ্চল 'মঙ্গার দেশ' হিসেবে পরিচিতি পায়। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান যেভাবে বৈষম্যে ধূসর হয়েছে; স্বাধীন বাংলাদেশে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ জনপদ একই বৈষম্যে ভুগেছে। পাকিস্তান উপনিবেশে শোষক ছিল পিণ্ডি; আর স্বাধীন বাংলাদেশে শোষক হয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ কালের শাসক শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা; এরা প্রত্যেকে এ অঞ্চলের মানুষ হবার পরেও; তারা যেহেতু আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট নন; তাই আঞ্চলিকতাপ্রবণ লোকেরা যারা পিয়ন হিসেবে কোনো অফিসে ঢুকে ধীরে ধীরে নিজের পাতকূয়া গ্রাম থেকে আরো বাইশটি পিয়ন নিয়ে আসে নিজের অফিসে; তাদের আঞ্চলিকতার সংকীর্ণতা দেখেও না দেখার ভান করেছেন তারা।
সেই আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট পিয়নের নাতি-নাতনি বিরাট ভদ্রলোক সেজে 'কেনু উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে' ইসলামপন্থীরা ভোট পেল; ছ্যা ছ্যা ছ্যা করছে। ফকিন্নির চাড়ি সারাদিন ইসলাম নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করলে; পোস্ত ভাত খেয়ে জীর্ণ গৃহে বসে থাকা কপালে লাল তিলক আঁকা কলকাতার দাদু তাকে প্রগতিশীলতার উত্তরীয় পরিয়ে দিতে পারবে না; তাই সমাজবিজ্ঞানী সেজে ভোট বিশ্লেষণ করতে এসেছে। সামষ্টিক সমাজের স্পিরিটটাই যে বোঝে না; বিভাজন আর বিদ্বেষের বিষ যার অবচেতনে; সে এসেছে সমাজ বিশ্লেষণ করতে।



পাঠকের মন্তব্য