লেখা: ইশতিয়াক আহমেদ শোভন
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া ওপেন করলেই মনটা বিষিয়ে ওঠে। বিশেষ করে সেই সব মানুষদের দেখে, যাদের কপালে অদৃশ্য এক 'শাহবাগী' সিল মারা আছে। এদের অত্যাচারে শান্তিতে একটু অন্ধত্বও ভোগ করার জো নেই। আপনি হয়তো সুখে-শান্তিতে একটা গুজব ছড়াচ্ছেন কিংবা কোনো মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে জাস্টিফাই করছেন, অমনি কোথা থেকে এক শাহবাগী এসে হাজির হবে আপনার সব 'আবেগ' ধুলোয় মিশিয়ে দিতে। তাদের হাতে থাকে তথ্যের তলোয়ার আর মুখে থাকে যুক্তির বিষ। কী ভয়ানক!
এই শাহবাগীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো এদের স্মৃতিশক্তি। আরে ভাই, বাঙালির স্মৃতি হবে স্বল্পস্থায়ী।এটাই তো নিয়ম। কিন্তু না! এরা একাত্তরের সেই পচাত্তর বছরের পুরনো ইতিহাস টেনে আনবে। এরা দাবি করবে, যারা ৩০ লক্ষ মানুষকে মারল, যারা মা-বোনের ইজ্জত নিল, তাদের নাকি বিচার করতে হবে! কী অদ্ভুত একগুঁয়েমি, তাই না? দেশটা তো সুন্দর 'ক্ষমা' আর 'ভুলে যাওয়া'র নীতিতে চলছিল। খুনিরা মন্ত্রী হয়ে পতাকাবাহী গাড়িতে ঘুরছিল, সমাজটা একটা স্থিতিশীল অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এই শাহবাগীরাই তো এসে সেই স্থিতিশীলতা নষ্ট করল। তাদের কারণেই তো আজ আমাদের শিখতে হচ্ছে যে অপরাধ করলে বিচার হয়, এমনকি সেটা ৪০ বছর পরেও। এই 'বিপজ্জনক' শিক্ষা কি আমাদের সমাজের জন্য ভালো? একদম না!
তার চেয়েও বড় জ্বালা হলো এদের 'চেতনা'। এই চেতনা শব্দটা শুনলেই এখন গায়ে জ্বর আসে। এরা নাকি চায় রাষ্ট্র হবে সবার। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই সমান নাগরিক সুবিধা পাবে। ভাবুন একবার! সংখ্যাগুরুদের দাপট থাকবে না, এটা কোনো কথা হলো? তারা আবার বিজ্ঞানের কথা বলে, মহাকাশ গবেষণার কথা বলে, লিবারেলিজমের কথা বলে। অথচ আমাদের কত সুন্দর সুন্দর কুসংস্কার ছিল, কত চমৎকার সব অন্ধবিশ্বাস ছিল। সেগুলো সব এই শাহবাগীরা 'যুক্তি' দিয়ে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এরা চায় এদেশের তরুণরা রোবটিক্স শিখবে, সাহিত্য পড়বে, আর মুক্তচিন্তা করবে। আরে বাপু, মুক্তচিন্তা করলে তো মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে! আর মানুষ প্রশ্ন করতে শিখলে তো আমাদের মতো 'কর্তা'দের গদি নড়বড়ে হয়ে যায়।
এদের পারিবারিক শিক্ষা নিয়েও আমার সন্দেহ আছে। এরা নাকি নারীদের ঘরের বাইরে দেখতে চায়! শাহবাগের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আমরা কী দেখলাম? মেয়েরা স্লোগান দিচ্ছে, রাতভর রাজপথে বসে আছে, ইনসাফের দাবি জানাচ্ছে। এরা চায় নারীরা লিড দিক, তারা উদ্যোক্তা হোক। অথচ আমরা জানি, নারীদের কাজ হলো হুকুম তামিল করা। এই শাহবাগীরাই মূলত নারীদের মাথায় 'অধিকার' নামক এক অদ্ভুত পোকা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তারা চায় জেন্ডার ইকুয়ালিটি। ছিঃ ছিঃ! সমাজটা তো উচ্ছন্নে গেল।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এদের আপনি যত গালি দেবেন, এরা তত বেশি হাসবে। আপনি তাদের বললেন 'নাস্তিক', তারা বলবে 'মানুষ হওয়াটাই আসল'। আপনি বললেন 'ভারতীয় দালাল', তারা বলবে 'আমাদের একাত্তরের ঋণ আমরা ভুলিনি।কিন্তু ফেলানী নিয়েও আমরা কথা বলব।'
আপনি তাদের বললেন 'শাহবাগী' (যেটা এখন গালিতে রূপান্তরিত করা হয়েছে), তারা এটাকে মেডেলের মতো বুকে নিয়ে ঘুরবে। এই যে গালিকে গৌরবে রূপান্তর করার ক্ষমতা, এটাই তো সবচেয়ে বড় বিপদ। নেলসন ম্যান্ডেলা বা মার্টিন লুথার কিংদের মতো এদের চামড়া বড় বেশি শক্ত। এরা নাকি মরে গেলেও পচে না, এদের আইডিয়াগুলো নাকি বাতাসে ঘুরে বেড়ায়।
তাই সাবধান! এই শাহবাগী ভাইরাসটি বড় ছোঁয়াচে। একবার যদি এদের পাল্লায় পড়েন, তবে আপনারও সত্য বলার অভ্যাস হয়ে যেতে পারে। আপনিও হয়তো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বসবেন। আপনিও হয়তো কোনো শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যাবেন। তখন সমাজ আপনাকেও ত্যাজ্য করবে, আপনাকেও গালি দেবে। আপনি কি চান আপনার জীবনটা এত 'আদর্শিক' আর 'ঝুঁকিপূর্ণ' হয়ে উঠুক? তার চেয়ে ভালো, চোখ-কান বুজে থাকাই নিরাপদ। শাহবাগীরা তো পাগল, তারা তো ন্যায়ের পেছনে ছুটে জীবন পার করে দিল। আমরা বরং অন্যায়ের সাথে আপস করে একটু 'সুখে' থাকি, কী বলেন?



পাঠকের মন্তব্য