চোরের গ্রামের মাতব্বর

২১৩ পঠিত ... ১৫:৩৭, জানুয়ারি ০৭, ২০২৬

লেখা: জিহাদ শেখ 

সারিসুরি নামক গ্রামটিতে সবাই চোর! চোরের গ্রাম তাই গ্রামের সবাই বেশ সচ্ছল। আশেপাশের গ্রামগুলিতে মাতব্বর থাকলেও, এই গ্রামে কোনো মাতব্বর নাই। চোরদের আবার মাতব্বর লাগে নাকি? চোরদের লাগে সরদার!

মাতব্বর না থাকার কারণ অবশ্য অন্যটি। চোরেরা সারারাত চুরি করে আর দিনে ঘুমায়। এদের মধ্যে কোনো ঝামেলা নাই। তাই মাতব্বরের প্রয়োজন পড়ে নাই কখনও।

একবার এক চোর পাশের গ্রামে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। তাকে কেউ ছাড়াতে যায় নাই। তখন সে বুঝতে পারে, একজন বলিষ্ঠ মাতব্বর থাকলে তার এই দুর্দিন দেখতে হতো না। উকিলের মতো যে কোনোভাবেই মাতব্বর তাকে ছাড়িয়ে আনতে পারত। যাহোক, সেবার জুতার বাড়ি ও জুতার মালা পরে পার পেয়ে যায় সে।

গ্রামে এসে সবাইকে একত্রিত করে, মাতব্বরের গুরত্ব বোঝাতে চেষ্টা করে সেই চোরটি। সবাই যখন বুঝতে পারে, তখন কে হবে মাতব্বর এটা নিয়ে তাদের মধ্যে প্রথম বিবাদের শুরু হয়। কারণ, সবাই চোর এবং সবারই অভিজ্ঞতা ভাল। কিন্তু চুরি করা আর মাতব্বরি করা তো এক নয়!

এক চোর তো বলেই ফেলল, না জানি কত শত চুরির পর মাতব্বর হওয়া যায়! তোরা তো চুরি করোস কাপড় আর চাল! তোরা কেমনে মাতব্বর হবি?

এটা শোনার পর সবাই হইচই শুরু করলো। এবং কে কত বড় চোর, তার ফিরিস্তি বর্ণনা করলো। দেখা গেল সবচেয়ে বড় যে চোর, সে ছয় মাসের জেল খেটেছে এবং তার চুরির বিষয় ছিলো ছয় আনা সোনার চেইন। কিন্তু সে যোগ্য বলে বিবেচিত হলো না। সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল যে প্রথম গ্রামে ঢুকবে, সেই হবে তাদের মাতব্বর। কারণ চোরদের গ্রামে চোর আসে না, ভাল মানুষই ভুল করে আসে!

সারারাত চুরি না করে সবাই ঘুমাতে গেল, কারণ আগামীকাল সকালে উঠতে হবে। চোরদের গ্রাম, তাই সাধারণত কেউ আসে না। বহু প্রতিক্ষার পর একজন আসলো। চেহারা তার শ্যামলা, গায়ে গতরে ভালো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সে একজন মুচি৷ তার বাড়ি বহুদূরে। তার পরিবারে তেমন কেউ নেই। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে জানানো হলো, সে তাদের মাতব্বর। তাকে এখানেই থাকতে হবে। তার কোনো কাজ করতে হবে না, তার কাজ হবে শুধু মাতব্বরি করা! চাইলে তার পরিবারের কাউকে আনতে পারবে।

ভয় ও লোভের যুগপৎ আন্দোলনে মুচি রাজি হয়ে গেল। পরেরদিন থেকে সে কাজ শুরু করলো। সকালে উঠে মুচি দেখে পুরো গ্রাম ফাঁকা। গল্প করার কেউ নাই। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো, চুরির সময়টা সে একটু আগিয়ে আনবে। যাতে সে সকালে সবাইকে পায়।

মাতব্বরের হুকুম। সবাই রাজি। এর কুফল তারা পেতে শুরু করলো। একটার পর একটা চোর ধরা পড়তে লাগলো। মাতব্বরকে জানানো হলে সে, হম্বি তম্বি করে উঠলো। নানান কাজের ফিরিস্তি দেয়া শুরু করল। সে গ্রামে নতুন নতুন দোকান দিয়েছে, বাইরে থেকে লোক আনিয়েছে। ঘরামি, কামলা সবাই তার কারণে এসেছে। গ্রামে এখন ধান চাষ হচ্ছে।

একটার পর একটা উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিতে থাকলো সে। বেশি বেশি গরু চুরি করতে হবে, গাভি চুরি করা যাবে না। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, মুচি লবণ চুরি করতে সবাইকে হুকুম দিল!!

কানাঘুষা চোরদের মধ্যে চলছে। কারণ এই প্রথম সারিসুরি গ্রামে একটি গরু চুরি হইছে। চোরেরা তো নিজের গ্রামে চুরি করে না। তাহলে কে চুরি করলো? এদিকে মুচিও কিছুদিন পরপর দিনে বাসায় থাকে না। মুচির বাড়িতে গিয়ে একজন দেখেছে লবণের বস্তা।

আরও কিছুদিন পর জানা গেল, মুচি পাঁচ গ্রাম পর একটি হাঁটে গিয়ে জুতা বিক্রি করে। কিন্তু সে জুতা পায় কোথায়? বানানো জুতা তাকে কে দেয়?

গোপনে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মুচি তার স্বভাব পাল্টায় নাই। সে রাতে গরু মেরে চামড়া ছিলে, পরে জুতা বানায়। মুচি যে দোকানদারদের গ্রামে বসিয়েছে, তারাও সবাই মুচি। ঘরামি ও কামলারাও মুচি৷ এবং সবাই গরু চোর।

চোরেরা এবার বিরাট বিপাকে! মুচিরে ভাল ভেবে মাতব্বর বানালো, সেই তো বড় চোর!

 

পাদটীকা: মুচিকে চোরদের মাতব্বর বানালে সে তো মুচিদের স্বার্থই দেখবে!

শিক্ষা: এতে কোনো শিক্ষনীয় বিষয় নাই! কারণ ফেসবুকে সবাই শিক্ষিত!

ঘটনা: কোনো ঘটনার সাথে এই গল্পের মিল নাই। মিল পেলে সে বোকা!

২১৩ পঠিত ... ১৫:৩৭, জানুয়ারি ০৭, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top