১
পুরান ঢাকার কলুটোলা। গলিগুলো এতই সরু যে দুই বন্ধু পাশাপাশি হাঁটলে তৃতীয় বন্ধুর জন্য জায়গা থাকে না। সেই গলির এক নোনাধরা পুরনো দালানের দোতলায় আনিস সাহেব আর রাবেয়ার সংসার। একুশ বছর পার হয়ে গেল, অথচ মনে হয় এই তো সেদিন আনিস সাহেব হলুদ পাঞ্জাবি পরে রাবেয়াকে প্রথম দেখতে গিয়েছিলেন। সংসারে উপচে পড়া ভিড় নেই, কোনো বাচ্চার কান্নার শব্দ নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা যা মাঝেমধ্যে আনিস সাহেবের চটি জুতোর শব্দে কিংবা রাবেয়ার দীর্ঘশ্বাসে ভেঙে যায়।
আজ রোজা। ফাল্গুনের শেষ দিকে গরমটা জেঁকে বসেছে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে আনিস সাহেব ঘরে ফিরলেন। তার মুখটা শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। কপালে ঘামের বিন্দু। উত্তরা থেকে কলুটোলা এই পথটুকু পার হওয়া মানে এক ছোটখাটো মহাযুদ্ধ জয় করা।
আনিস সাহেব ধপাস করে সোফায় বসে চোখ বুজলেন। রাবেয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন শরীরটা বেশি খারাপ লাগছে কি না, মুখটা খুব কালচে দেখাচ্ছে।
আনিস সাহেব চোখ না খুলেই বিড়বিড় করে বললেন যে ঢাকা শহরটা আদৌ মানুষের জন্য কি না, নাকি লোহার খাঁচায় বন্দি কতগুলো প্রাণীর জন্য। উত্তরা থেকে বাসে উঠে ভেবেছিলেন দুই ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন, কিন্তু বনানীতে এসে বাস এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল যেন রাস্তার সাথেই তার জন্মের সম্পর্ক। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন এক বুড়ো মানুষ ডিভাইডারে বসে কাঁদছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই লোকটি বলেছে সে নাকি তিন বছর ধরে এই জ্যামে বসে আছে, আজ ইফতারিটাও কি রাস্তায় করতে হবে।
রাবেয়া একটু হেসে বললেন তিনি সবসময় অতিরঞ্জিত কথা বলেন।
আনিস সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। তার চোখে এক চিলতে বিষাদ। তিনি বললেন এটা অতিরঞ্জন নয়, এটাই সত্য। একুশ বছর ধরে তারা এই শহরে টিকে আছেন, এটাও এক অলৌকিক ঘটনা। এয়ারপোর্ট রোডে জ্যামে বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল তাদের জীবনটাও এই জ্যামের মতো, এগোচ্ছে না আবার পিছিয়েও যাওয়ার উপায় নেই। পাশে এক দামী প্রাইভেট কারে এক দম্পতিকে ঝগড়া করতে দেখলেন। তাদের সব আছে, শুধু শান্তি নেই। আর তাদের শান্তি আছে, কিন্তু ভীষণ একা।
রাবেয়া পাখা থামিয়ে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আনিস সাহেবের গলার স্বরে মায়া মাখানো ক্লান্তি। তিনি বলতে লাগলেন ফার্মগেটে একদল ছেলেপেলে জটলা পাকিয়ে আছে, ট্রাফিক পুলিশ হাত তুলে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, কেউ কাউকে মানছে না। এই বিশৃঙ্খলা দেখে মনে হয় সবাই যেন এক বড় গোলকধাঁধায় আটকে গেছে। তবে আজানের সময় কোটি মানুষ এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়, সেই ক্ষণিকের স্তব্ধতার জন্যই বোধহয় মানুষ বেঁচে থাকে।
রাবেয়া আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। একুশ বছরে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু আনিস সাহেবের এই দার্শনিক কথাবার্তা বদলায়নি।
আনিস সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন বাজারে লেবুর হালি নাকি একশ টাকা ছুঁয়েছে। যে লেবু চিপে শরবত খাওয়া হয়, সেটাই এখন বিলাসিতা। মধ্যবিত্তের জীবনটাও সেই লেবুর মতো, সবাই চিপে রস বের করে নেয়, শেষে পড়ে থাকে শুধু ছিবড়া।
রাবেয়া কিছু বললেন না। রান্নাঘর থেকে পেঁয়াজুর ঘ্রাণ ভেসে আসছে। বাইরে কলুটোলার আকাশে সন্ধ্যার আবছায়া নামছে। একুশ বছরের পুরনো এই ঘরে বিষাদ আর ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
২
আনিস সাহেব ইফতারের দস্তরখান পেতে বসেছেন। সামনের পিরিচে গোটা তিনেক পেঁয়াজু, খানিকটা মুড়ি মাখানো আর দুই টুকরো শসা। রাবেয়া গ্লাসে লেবুর শরবত ঢালছেন। এই একুশ বছরে তার হাতের শরবতের স্বাদ বদলায়নি, বদলেছে শুধু বাইরের পৃথিবী।
আনিস সাহেব গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসলেন। বললেন এই শরবতের একেকটা চুমুক এখন সোনার চেয়েও দামী। বাজারে গিয়ে লেবুর দাম শুনে মনে হয়েছিল দোকানদার বুঝি রসিকতা করছে। তিনি নাকি বলেছিলেন তিনি লেবু কিনতে এসেছেন, দোকানের অংশীদার হতে নয়। দোকানদার দাঁত বের করে হেসেছিল, আর মানুষের দাঁত এত সাদা কেন লাগে সেটাও তার কাছে এক রহস্য।
রাবেয়া বললেন দাম বাড়ুক, তারা তো আর দুই ডজন লেবু খাবেন না। একুশ বছর অল্পতেই চলে গেছে, এখনো যাবে।
আনিস সাহেব শরবতে চুমুক দিয়ে বললেন সরকার নাকি ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে। টিভিতে দেখেছেন লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ কার্ড নিচ্ছে, তাতে চাল ডাল তেল সস্তায় পাওয়া যাবে। কিন্তু নিয়ম হলো কার্ড বাড়ির গিন্নির নামে হবে। অর্থাৎ সংসারে তার কোনো অস্তিত্ব নেই, সব রাবেয়ার।
রাবেয়া মৃদু হেসে বললেন এতে মন্দ কী, এতদিন যেমন চলেছে তেমনই কাগজেও চলবে।
আনিস সাহেব বললেন আসল ব্যাপার হলো তামাশা। তাদের জীবন এখন তামাশায় ভরা। টিভিতে একজন মন্ত্রী বলছেন বাজারে কোনো কিছুর দাম বাড়েনি। শুনে মনে হয় তিনি অন্য কোনো গ্রহের বাজারের কথা বলছেন। আবার কিশোর গ্যাং নিয়ে আলোচনা চলছে। তাদের সময়ে কিশোররা পেয়ারা চুরি করত, এখনকার কিশোররা মানুষের শান্তি চুরি করে। সমাজটা যেন উল্টে যাচ্ছে।
রাবেয়া শান্ত গলায় বললেন এত চিন্তা না করতে।
কিন্তু আনিস সাহেব থামলেন না। বাসে আসার সময় দেখেছেন এক মধ্যবিত্ত বাবা মেয়েকে নিয়ে ইফতার কিনছে। মেয়েটা জিলাপি দেখিয়ে চাইলে লোকটা পকেট হাতড়ে চুপচাপ চলে গেছে। সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে তাদের নিঃসন্তান জীবন একদিক দিয়ে আশীর্বাদ, কারণ সন্তানের আবদার রাখতে না পারার কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারতেন না।
রাবেয়ার হাত থেমে গেল। শরবতের গ্লাস রাখার সময় টুং শব্দ হলো। পুরনো ঘড়ি টিকটিক করে সময় জানাচ্ছে। আনিস সাহেব বুঝলেন কথা বলতে গিয়ে তিনি বেশি দূরে চলে গেছেন।
তিনি রাবেয়ার হাত চেপে ধরে বললেন রাগ করতে নেই, তিনি মজা করছিলেন। তাদের জীবন কোনো কার্ড নয় যা চাইলেই পাওয়া যায়। তাদের জন্য ওপরওয়ালা আলাদা হিসাব লিখে রেখেছেন, সেখানে চাল ডাল নেই, আছে শুধু ভালোবাসা।
বাইরে তখন মাগরিবের আজান ভেসে এলো। কলুটোলার নোনাধরা দেওয়ালে সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তারা খেজুর মুখে দিয়ে রোজা ভাঙলেন। পৃথিবী বদলেছে, লেবুর দাম বেড়েছে, জ্যাম বেড়েছে, কিন্তু তাদের নিঃশব্দ ভালোবাসা একই জায়গায় রয়ে গেছে।
৩
ইফতারের দস্তরখানটা আজ একটু বেশিই ফাঁকা লাগছে। শসা আর মুড়ি ছাড়া তেমন কিছু নেই। আনিস সাহেব শরবতের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছেন যেন তার ভেতরে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।
রাবেয়া এসে বললেন শরবতের লেবু আর আগের মতো নয়, এখন একশ টাকার লেবুতে রসের চেয়ে দীর্ঘশ্বাসই বেশি থাকে।
আনিস সাহেব হাসলেন। বললেন বাসে ফার্মগেটে আটকে থাকতে থাকতে মানুষের মুখ দেখছিলেন, সবার চোখে যুদ্ধের ছাপ। কেউ লেবুর জন্য চিন্তিত, কেউ জ্যামের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। উত্তরা থেকে আসতে যে সময় লাগে, সেই সময়ে মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যায়, আর তারা যায় এক সিগন্যাল থেকে আরেক সিগন্যালে।
রাবেয়া বললেন মন্ত্রীরা তো বলছেন বাজারে কোনো কিছুর অভাব নেই।
আনিস সাহেব উত্তর দিলেন মজুত তো থাকবেই। সরকারের কাছে জিনিসের মজুত আছে, আর তাদের কাছে সহ্যশক্তির মজুত। টিভিতে সবাই অন্যের স্ক্রিপ্টে অভিনয় করছে বলে মনে হয়। যে বাজার বোঝার কথা সে থাকে এসির নিচে, আর যে নীতির কথা বলার কথা সে পড়ে থাকে বাজারের জাঁতাকলে। জীবনটাই যেন এক অদ্ভুত রঙ তামাশা।
তিনি আবার বললেন আজ নিউজে দেখেছেন কক্সবাজারে এক এমপির গাড়ির নিচে পড়ে আট বছরের এক শিশু মারা গেছে। হয়তো ইফতারের জন্য কিছু কিনতে যাচ্ছিল। তখন মনে হয়েছে তাদের নিঃসন্তান জীবন হয়তো এক অদ্ভুত রক্ষা, কারণ এই শহরে শিশুকে বড় করা নিজেই এক ঝুঁকি।
আনিস সাহেব জানালা দিয়ে সরু গলির দিকে তাকালেন। অন্ধকারের মাঝেও মানুষ ছুটছে। কেউ ফ্যামিলি কার্ডের লাইনের কথা বলছে, কেউ বাজারের হিসাব কষছে।
তিনি রাবেয়ার হাত ধরে বললেন ঢাকা শহরটা একটা বিশাল পাজল, একুশ বছর ধরে তারা টুকরো মেলাতে চেয়েছেন, কিন্তু শেষে নিজেরাই হারিয়ে যাওয়া টুকরো হয়ে যাচ্ছেন। তবুও এই ছোট ঘরে শান্তি আছে। বাজারে দাম বাড়ুক, জ্যামে জীবন আটকে থাকুক, দিনশেষে রাবেয়ার হাতের এই সাধারণ শরবত পেলেই মনে হয় জীবন এখনো খুব খারাপ না। সাধারণ মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে।
বাইরে তখন আজানের রেশ মিলিয়ে গেছে। কলুটোলার নোনাধরা দেওয়ালে শব্দের প্রতিধ্বনি থেকে গেছে। তারা নিঃশব্দে রোজা ভাঙলেন। একুশ বছরের ভালোবাসা আর বর্তমানের কঠিন বাস্তব মিলেমিশে সেই ঘরটিতে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে রইল।



পাঠকের মন্তব্য