স্কুলে স্যারের হাতে কায়দামতো মার খেয়ে এক আমগাছের মাথায় উঠে বসে আছে সুমন। মেজাজ তার বেজায় খারাপ। মাঝে মাঝে রাগের চোটে আমগাছের পাতা ছিঁড়ে মুখে নিয়ে একটু চিবিয়ে ফেলে দিচ্ছে। গাছের ঠিক নিচেই স্কুলের পুকুর। খুব ইচ্ছা হচ্ছে এই পুকুরে একটা ঝাঁপ দিতে। কিন্তু ও শুনেছে, এই পুকুরে এক বুড়ি ভূত আছে, ছেলেপেলে নামলে পা টেনে নিয়ে যায়। সেই ঝামেলার জন্য লাফটাও দিতে পারছে না।
এরই মধ্যে ঝন্টু স্যার, মানে যে স্যার তাকে মে*রেছে, গাছের নিচে হাজির। ঝন্টু স্যার হলেন স্কুলের সেই স্যার, যার ভয়ে বাঘে হরিণে এক ঘাটে পানি খায়। স্যার গাছের ওপরে তাকিয়ে বাজখাঁই গলায় বললেন, এই বান্দর, নিচে নাম।
সুমন অত্যন্ত রাগে গরগর করতে করতে বলল, নামব না, নামলে আপনি মারবেন।
স্যার দাঁত কিঁড়মিড় করে বললেন, মারব না, নিচে আয়, ক্লাস করবি না?
সুমন আরও জোরে চেঁচিয়ে বলল, নামব না, দেখি কোন বাপের ব্যাটা আমাকে নামায়, বলেই একটা চাবানো আমপাতা নিচে ফেলল।
পড়বি পড়, মালির ঘাড়ের মতোই সেই চাবানো আমপাতা ঝন্টু স্যারের চকচকে টাকের ওপর পড়ল। আর যায় কোথায়, বারুদে আগুন লাগার মতো ফস করে জ্বলে উঠে ঝন্টু স্যার বললেন, তবে রে, তোকে দেখাচ্ছি মজা। মজনু, এই মজনু, স্কুলের মইটা নিয়ে আয়।
মজনু হলো এই স্কুলের চা-ফরমাশ খাটার ছেলেটা। সে স্যারের থেকে একটু নিরাপদ দূরত্বে ছিল। স্যার বলতেই দৌড়ে গেল মই আনতে।
স্যারের শরীরের যে অংশটি সবার আগে কারও চোখে পড়ে, তা হলো মেদ। আর এই অসম্ভব বড় ভুঁড়ির কারণে স্যারকে ছোটও দেখা যায় খানিকটা। এজন্যই স্যার গাছে ওঠার রিস্ক নিলেন না। রাগে গাছের নিচে গজগজ করে পায়চারি করতে লাগলেন, দেখাচ্ছি মজা, বান্দরের হাড় লাগিয়েছিস গায়ে? এত্ত বড় সাহস, গাছে উঠে বসে আছে।
এদিকে সুমনও একটু টেনশনে পড়ে গেল। এই মই নিয়ে এলে স্যার যদি আসলেই গাছে উঠে যায়, সে করবে কী, পুকুরেও তো ঝাঁপ দিতে পারবে না। চিন্তা করতে করতে সে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল।
এর মাঝে মজনু মই নিয়ে হাজির। সুমন একটু নড়েচড়ে বসল। স্যার গাছের গায়ে মইটা লাগালেন। তবে সেই মইটা সুমন যে ডালে বসে আছে তার ধারে কাছেও এলো না। এটা দেখে সুমনের বেশ মজা লাগল। এই মই দিয়ে স্যার কোনোভাবেই তার কাছে পৌঁছাতে পারবেন না।
স্যারও এটা বুঝতে পেরে আরও রেগে গজগজ করতে করতে খুঁজতে লাগলেন, গাছে ঠিক কোথায় মইটা লাগালে তিনি সুমনের নাগালে পাবেন। কোনোভাবেই কায়দা করতে না পেরে রেগে বোমা হয়ে স্যার বললেন, তবে রে হারামজাদা, গাছের মগডালে উঠে আমাকে বোকা বানানো, তুই কি ভেবেছিস আমি গাছে উঠতে পারি না? জানিস ছোটবেলায় কত গাছে উঠেছি? তোর চেয়ে বড় বান্দর ছিলাম। দাঁড়া, দেখাচ্ছি।
বলেই হাতের চিকন বেতটা ফেলে দিয়ে গাছ বেয়ে ওঠার চেষ্টা করতে থাকলেন। সুমন দেখল, এ তো নতুন বিপদ। স্যার আসলেই যদি বেয়ে উঠে যায়? সে তাড়াতাড়ি ডাল বেয়ে আরও একটু সামনে গিয়ে বসল।
এদিকে ঝন্টু স্যার হাঁচড়পাঁচড় করে গাছের অনেকটা ওপরে উঠে পড়লেন। একবার ব্যালেন্স করে দাঁড়াতে পেরেই উনি বেশ খুশি হয়ে সুমনকে বললেন, এবার কী করবে বাছা, তোমাকে তো আমি ধরবই।
সুমন ভয় পেয়ে গেল। এখন যদি স্যার গাছের ডাল থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়, তাহলে পিঠের ছাল আর থাকবে না। সে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল।
এদিকে স্যারও ডাল বেয়ে ওর দিকে আসছেন। সুমন এদিক ওদিক পালানোর উপায় খুঁজছে। হঠাৎ করে কড়াক, একটা আওয়াজে স্যার আর ছাত্র দুজনই পুকুরে ঝপাং।
পুকুরে পড়েই স্যার চিৎকার শুরু করলেন, ওরে মা রে, বাঁচাও রে, এই পুকুরে সাপ আছে রে, খেয়ে ফেলবে রে।
সুমন একটু অবাক হয়ে আবিষ্কার করল, তাদের এই ভয়াবহ ঝন্টু স্যার সাপের ভয়ে পুকুরে পড়ে কেঁচো হয়ে গেছেন। ও ভূতের ভয় পাবে কী, স্যারের ভয় দেখে ওর মাথায় চেপে বসল আরেক দুষ্টু বুদ্ধি। আস্তে আস্তে স্যারের পেছনে সাঁতরে গিয়ে স্যারের পায়ে আলতো করে খোঁচা দিল।
স্যার তো আরও জোরে, বাবারে, মারে, সাপ রে, সাপ রে, বলে হাত পা ছুঁড়তে লাগলেন।
এদিকে ততক্ষণে স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষিকা, ছাত্র ছাত্রী কেউ বাকি নেই পুকুরে আসতে। সবাই মিলে তাড়াতাড়ি টেনে তুললেন ঝন্টু স্যারকে।
ভয়েই হোক বা অসময়ে পুকুরে ভিজেই হোক, স্যারের ভীষণ জ্বর এলো। এটা শুনে সুমনের খুব খারাপ লাগল। যতই পেটাক, তার জন্যই তো স্যার পুকুরে পড়লেন। তাই একদিন পর ভয়ে ভয়ে স্যারের জন্য কয়েকটা কাঁচা আম নিয়ে দেখতে গেল।
স্যার ওকে দেখেই গম্ভীর হয়ে বললেন, তুই কেন আসছিস?
হাতে কী?
কাঁচা আম।
রোগী দেখতে কেউ কাঁচা আম আনে, গাধা কোথাকার, গাধাই থাকবি সারাজীবন।
হঠাৎ করে স্যারের এই কথাটা শুনে সুমনের কেন যেন একটু হাসি পেয়ে গেল। ফিক করে হেসে বলল, স্যার, আপনি সাপে ভয় পান?
স্যার গম্ভীর স্বরে বললেন, হ্যাঁ পাই, তুই পাস না?
না, আমি শুধু আপনাকে ভয় পাই।
আমাকে এত ভয় পাস, তাহলে ফেললি কেন?
স্যার, আমি তো আপনাকে ফেলতে চাইনি। আমি খুব সরি, স্যার।
আচ্ছা, যা, মাফ করে দিলাম। আর এমন করিস না। আর হোমওয়ার্ক করিস। তোদেরকে কত কষ্ট করে পড়াই, তোরা পড়া না পারলে আমার ভালো লাগে, বল?
হঠাৎ স্যারের কথা শুনে সুমনের একটু অন্যরকম লাগল। যেন অন্য এক ঝন্টু স্যারকে দেখছে।
স্যারও একটু কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, শাসন করলেই বুঝি রাগ দেখাতে হয়? তোদের পড়াতে আমার কষ্ট হয় না? যা, বাসায় যা। বাসায় গিয়ে মন দিয়ে পড়। আমগুলো এনেছিস, ভালো হয়েছে। মুখে রুচি নেই, ঝাল করে ভর্তা করে খাব।
সুমনের কেন যেন খুব কান্না পেয়ে গেল। আমগুলো কোনোমতে স্যারের টেবিলে রেখে এক দৌড়ে বাড়ির পথ ধরল। কখন যে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, সুমন নিজেও জানে না।



পাঠকের মন্তব্য