না, যত সামান্যই হোক, এরকম একটা শিহর অনুভব করব তা ভাবিনি।
একটা চিঠির ছেঁড়া কটা টুকরো।
পরপর জুড়লে গোটা চিঠিঢা যে পাওয়া যায়, তা নয়। বাদ থাকে অনেকখানিই—আর সেই সঙ্গে চিঠির খুব জরুরি কিছু অংশও নিশ্চয়।
তবু সামান্য যে দু-একটা টুকরো আছে, শিহরটা তাতেই জাগে।
কিন্তু শিহরটা কী জাতের?
একটা অস্ফুট যন্ত্রণার তরঙ্গ যেন বিদুৎগতিতে বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে চলে যায়, সেইরকম কি?
না, কোথায় একটা আচ্ছন্ন আত্মপ্রসাদের মতো অস্পষ্ট অনুভূতির মধ্যে থেকে থেকে হঠাৎ একটা সংশয়ের তীক্ষ সূচিবিদ্ধতার মতো।
এ শিহর শুধু তাই নয়। দুই-এ যেন মেলানো।
অথচ চিঠিটার কিছুই পড়ার যোগ্য আর নেই বললেই হয়। এমন কুচিকুচি করে সেটা ছেঁড়া হয়েছিল যে, একটা দুটো ছাড়া সম্পূর্ণ একটা শব্দও কোথাও পাওয়া যায় না, প্রায় সম্পূর্ণ সেরকম শব্দের একটা হল মালপুর। শব্দটা যে অসম্পূর্ণ তা বুঝতে আমার অজানা নয়। শব্দটা ছিল ‘জা’ এবং সেটা মিলিয়ে সমস্ত কথাটা যে জামালপুর দাঁড়ায়, সেটুকু আমার অজানা নয়।
হ্যাঁ, ছেঁড়া চিঠিটায় জামালপুর নামটাই সুপ্ত স্মৃতিতে একটা ঝংকার তোলার পক্ষে যথেষ্ট তার ওপর দ্বিতীয় টুকরোর প্রায় সম্পূর্ণ কথাটা থেকেই সেই দুর্বোধ শিহর জেগেছে।
কোথায় ছিল চিঠিটা এতদিন?
ছিল আরো অদরকারি নানারকম বাতিল কাগজপত্র ভরা একটা পুরোনো, এদিকে-ওদিকে ছেঁড়া দোমড়ানো সেকেলে ফাইবারের স্যুটকেসের মধ্যে।
অনেক অনেক আগে এই স্যুটকেসটা আমার ভ্রাম্যমাণ চাকরি জীবনে সাক্ষী ছিল। হাতের একটা চামড়ার ফোলিও আর একটা ক্যাম্বিশের ব্যাগ নিয়েই তখন ওষুধ তৈরির এক ছোটোখাটো কোম্পানির সেলসম্যান প্রতিনিধি হয়ে বিহারের ছোটোখাটো শহরে কিছুদিনের জন্যে ডেরা বেঁধে দালালি করে ঘুরি।
আমি নতুন লোক। দ্বারভাঙ্গা পাটনা ভাগলপুরের মতো বড় শহর আমার চেয়ে পাকা লোকের জন্যে বরাদ্দ। ওই জামালপুরের মতো ছোটোখাটো জায়গাতেই কিছুদিন ধরে কাজ করে আমায় আমার যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়।
হ্যাঁ, জামালপুর শহরে বেশ কিছুদিন, অন্য সব ঘাঁটির চেয়ে একটু বেশি দিন আমায় থাকতে হয়েছিল।
শুধু সেই জন্যেই কি শহরটার নামটা স্মৃতির মধ্যে অমন একটা ঝঙ্কার তোলে?
না, তার সঙ্গে ছেঁড়া চিঠির আর একটা টুকরোর মধ্যে পাওয়া প্রায় সম্পূর্ণ একটা কথাও সমস্ত ব্যাপারটার স্মৃতিকে তীক্ষ্নভাবে নাড়া দিয়েছে।
ছেঁড়া কাগজের টুকরোব ছোট্ট কথাটুকু হল, ‘তুমি আস নি।’
কে কোথায় কেন আসে নি আর কার সম্বন্ধে এই করুণ অনুযোগ যা ছেঁড়া কাগজের কুচির মধ্যে বেরিয়ে গেছে অতীতের অন্ধকারে?
বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাবে এই আশায় অবহেলায় সরিয়ে রাখলেও সামান্য একটা ছেঁড়া চিঠির টুকরো এমন জ্বলন্ত যন্ত্রণা হয়ে আজও জেগে আছে—তার ইতিহাসটা কেমন করে জানাব বুঝতে না পেরে সোজাসুজিই আত্মস্মৃতির একটা পর্ব এখানে মেলে ধরছি।
ওষুধ বেচার দালালির কাজ নিয়ে তখনকার ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের লুপ লাইনের একটা জংশন জামালপুর স্টেশনে যখন নামি, তখন জায়গাটা আমার সস্পূর্ণ অচেনা।
নেহাৎ নগণ্য একটা শহর। গঙ্গার তীরবর্তী ইতিহাসবিশ্রুত মুঙ্গের শহরের ব্র্যাঞ্চ লাইনটা এখান থেকেই বেরিয়েছে। তা ছাড়া রেলওয়ে কোম্পানির একটা লোকো কারখানা এখানে থাকার দরুণ জায়গাটার যা কিছু দাম।
লোকো কোম্পানির বেশিরভাগ কর্মচারীই তখন বাঙালি। কিন্তু তাদের নিজেদের জন্যে সংরক্ষিত মেসগুলিতে বাইরের লোকের জায়গা নেই। নিরুপায় হয়েই তাই বাজারের একটা স্থানীয় বিহারী হোটেলেই উঠতে হয়েছে খাওয়া-দাওয়া খারাপ নয়, কিন্তু সারাদিন বাজারের হট্টগোল আর নর্দমার গন্ধটা দিন-রাত্তিরগুলোকে কেমন নোংরা করে রাখে।
এরপরের যা ঘটনা তা নেহাৎ মামুলি ব্যাপার, নিয়তির কৌতূকের সেই বস্তাপচা কাহিনী।
স্টেশনে কোম্পানির পাঠানো একটা ওষুধের রেল-পার্শেল নিতে গিয়ে মাল ছাড়িয়ে চলে আসবার সময় মালবাবু হঠাৎ খপ করে ডানহাতটা চেপে ধরে কড়া গলায় বলেছেন, সে কি মশাই, জাল সই দিয়ে মাল নিয়ে সরে পড়ছেন? উঁহু সেটি হচ্ছে না। দাঁড়ান পুলিশ ডাকি।
প্রথমটা সত্যিই চমকে গেছলাম। তারপরই মালবাবু যখন হাতটা আলগা করে ধরে গেয়ে উঠলেন—‘ম্যায় ছোড়ি দে রে সঁইয়া ছোড়ি দে রে।’ তখন অফিসঘরের উপস্থিত আর দু-চার জনের সঙ্গে হেসে উঠে তাঁর দিকে চেয়ে অবাক হয়ে বললাম,—অমরেশদা।
হ্যাঁ, এতক্ষণে অমরেশদা! তা এতক্ষণ চিনতে পার নি হতভাগা! বলে টেবিলে উঠে এসে অমরেশদা বললেন,—আমি তো এখানে ঢোকামাত্র চিনেছি।
রেল কর্মচারীর সাজটার দরুন আসল চেহারাটা লক্ষ করি নি তাই, নইলে অমরেশদার মতো মানুষকে একবার দেখে আমারও না চেনবার কথা নয়। লেখাপড়াটা ভাগ্যে যতটা ছিল শেষ করার পর চাকরির প্রত্যশায় কিছুদিন দিল্লির একটা বাঙালি মেসে থাকবার সময় অমরেশদার সঙ্গে পরিচয় হয়। বেকার না হয়েও কেন যে তিনি তখন দীর্ঘদিন ধরে ও মেসে ছিলেন, তা জানি না, জানার কৌতূহলও বোধ করি নি। অত্যন্ত আমুদে মিশুক রসিক মানুষ হিশেবে অমরেশদা সারা মেসকে মাতিয়ে রাখতেন, সেটুকু স্পষ্টই মনে আছে।
এবার কাঁধে হাত রেখে প্ল্যাটফর্মের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বললেন,—এই যমের অরুচি কতদিন এসেছ?
বেশিদিন নয়, জানিয়ে বললাম,—তা যমের অরুচি বলছেন কেন? আর কিছু না থাক এ শহরের বড়াই করবার পাহাড়গুলো আছে।
ও পাহাড়গুলো এর মধ্যে ঘুরে আসা হয়েছে বুঝি—বলে হেসে পিঠ চাপড়ে দিয়ে অমরেশদা বললেন—ওই পাহাড় না, ন্যাড়া পাথরের ঢিবির চেয়ে ভালো জায়গা আছে চলো সেখানে।
মৃদু আপত্তি যতটা জানাবার জানালাম, কিন্তু তা যে নিষ্ফল হবে আগেই জানতাম। অমরেশদার সঙ্গে তাঁর এখানকার বাসাতেই যেতে হল। তিনি অবশ্য তাঁর নিজের চাপরাশি দিয়ে আমার রেল-পার্শেলে আসা বাক্স দুটো আমার বাজারের হোটেলের ঠিকানায় পাঠাবার ব্যবস্থা করে এলেন।
অমরেশদার কোয়ার্টারে গেলাম। তিনি রেল কর্মচারী, কিন্তু রেল কলোনিটা,তখনো নেহাৎ ছোট ছিল বলে তাঁর সেখানে কোয়ার্টার মেলে নি। বাজার থেকে অদূরে একটা সাধারণ একতলা, ভাড়াবাড়িই জুটেছে তার বদলে।
বাড়ির দরজায় এসে অমরেশদা কড়া নাড়ার সঙ্গে সারাপাড়া-জাগানো গলায় চিৎকার করে বললেন—আরে খোলো খোলো, জলদি দরওয়াজা খোলো, নইলে চিড়িয়া ভাগ যাবে।
দরজা খুলতে দেরি হল না। যিনি খুললেন তিনি যে অমরেশদার স্ত্রী সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তাকে ঘুরে দাঁড়াবার অবসরটুকুও না দিয়ে অমরেশদা আগের মতন সারাপাড়া-জাগানো গলায় বললেন—কাকে ধরে এনেছি জানো রুমা? কাকে নয় কি-ই বলা উচিত। গন্ধ পাচ্ছ না ওখান থেকেই। একেবারে আস্ত একটা ওষুধ বোঝাই মেডিসিন চেস্ট। আর অসুখবিসুখের জন্য ভাবনা নেই। ওই যে তোমার নিত্যি মাথার যন্ত্রণা হয় সন্ধে হলেই প্রায়—যা খাও অম্বল হয়, ওসব জ্বালা এখন থেকে শেষ। শুধু মেডিসিন চেস্টটির ডালা খুলে কটা বড়ি বার করে নেওয়া।…
অমরেশদার সঙ্গে ছোট উঠোনটা পার হওয়া, নীচে বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে গিয়ে বসতে বসতে—আঃ, কী হচ্ছে অমরেশদা! বলে একটা প্রতিবাদ নিশ্চয়ই আমার জানানো উচিত ছিল।
কিন্তু কিছুই আমার গলা দিয়ে বার হয়নি।
আমি তখন স্তব্ধ, কেমন বিহ্বল।
নিয়তির সেই মামুলি পুরোনো ছক বড় বেশি দূর টেনে নিয়ে ভাগ্যের এক এক বড় নিষ্ঠুর কৌতুক।
হ্যাঁ অমরেশদার সঙ্গে দেখা হওয়াটা একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী হিশাবে এই সুদূর প্রবাসের এক নগণ্য শহরে রুমাকে!
না, অস্বীকার করে লাভ নেই। রুমাকে আমি চিনতাম চোখের চেনা নয়, যত গভীর করে একজন আর একজনকে চিনতে পারে, তেমনি করেই। কৈশোর ও প্রথম যৌবনের ভাব-বিহ্বলতা তার মধ্যে নিশ্চয়
কিছুটা ছিল, কিন্তু এর সঙ্গে অনেক অতল অনেক অক্ষয় কিছু।
কিন্তু শাস্ত্রে যা বলে তা মিথ্যে নয়। ও বয়সের প্রেম কখনো সার্থকতা পৌঁছয় না। আমাদের বেলা যা নিত্যসিদ্ধ তার ব্যতিক্রম হয় নি।
যতটা সম্ভব পড়াশুনা সেরেই কাজের ধান্দায় বার হয়ে দেশেই আর ফেরা হয় নি। মন থেকে না হলেও জীবন থেকে রুমা হারিয়েই গিয়েছিল।
সে হারিয়ে যাওয়া রুমা এমনভাবে ফিরে পাব তা ছিল কল্পনারও বাইরে।
কী করেছিলাম এমনভাবে পরস্পরকে আবিষ্কার করে?
সে যা করেছিল, আমিও তাই। বাইরে কোনো ধরা পড়ার মতো এতটুকু চাঞ্চল্য কেউ প্রকাশ হতে দিই নি। সম্পূর্ণ অচেনার মতোই ব্যবহার করছি। আমার নিজের দিক দিয়ে বলতে পারি সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে যাবার একটা কঠিন সংকল্পও মনের মধ্যে তখন গড়ে তুলছি।
তার জন্যে এই দুজনের সংস্রব ত্যাগ করবার একটা চেষ্টাও যে না করেছিলাম তা নয়।
ইচ্ছে করেই কাজের ছুতোয় দু-একদিন আসিনি। সন্ধ্যার পরও যাতে হোটেলের ঘরে আমায় না পায়, তার জন্যে অনেক রাত পর্যন্ত অকারণে শহরের অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়ে নিজেকে ক্লান্ত করেছি।
কিন্তু তাতেও নিস্তার পাই নি। ভোর হতে না হতে হোটেলের দরজায় অমরেশদার অফিসের চাপরাশি তাঁর চিঠি নিয়ে খাড়া। চিঠিতে অত্যন্ত জরুরি তলব—আজ সন্ধ্যায় আসা চাই-ই কোনো ওজরা শুনব না। আজ না এলে হুলিয়া বার হবে সেটা মনে রেখো।
যেতে হয়েছিল নিরুপায় হয়ে।
অমরেশদা সরু বারান্দায় মেঝের ওপরই বসে একটা কুলো নেড়ে কি যেন ঝাড়ছিলেন। আমায় দেখে প্রায় লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কোঁচার খুঁটটা মাথার ওপর ঘুরিয়ে ফেলে—নাচের ভঙ্গিতে দুপাক ঘুরে গেয়ে উঠেছিলেন, এসো এসো বঁধূ এসো আমার আধ-আঁচরে বোসো।
তারপর গান থামিয়ে গম্ভীরমুখে ভেতরের দিকে চেয়ে হাঁক দিয়ে বলেছিলেন—কই গো রুমা, জলদি এসো। এসে দেখো আমাদের কয়েদ-পালানো আসামী আপনি এসে হাজির। তা না এসে যাবে কোথায়? তোমার হাতের ঘুগনি আর চা যে একবার খেয়েছে সে যে….।
বলতে বলতে হঠাৎ নেমে অমরেশদা বেশ একটু র্ভৎসনার সুরেই রুমাকে বলেছেন,—আচ্ছা, তুমি কি বলো তো? এতদিন বাদে মানুষটা এল। তা একটু মিষ্টিকথা বলে অভ্যর্থনাও করতে পারো না! কিছু না হোক মুখটা একটু হাসি-হাসিও করতে পারো। নইলে মনে করবে তোমার গালে বুঝি যা আছে—হাসতে গেলে গাল চড়বড় করে। ওদের কোম্পানির ওষুধটা হয়তো নিয়ে আসবে এরপর।
নেহাৎ স্থূল শস্তা রসিকতা। তবু হেসে ওঠবার ভান করে বলেছি,—কি যা তা বলছেন অমরেশদা! ওঁকে মিছিমিছি অপ্রস্তুত করে আমার না আসার অপরাধটা বাড়িয়ে তুলছেন। ঠিক আছে এখন থেকে যেমন করে হোক রোজ আসব।
বেশ বেশ। তাহলেই হলো। বলে সন্তুষ্ট হয়ে অমরেশদা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছেন।
অমরেশদা এতদিনে লক্ষ করেছেন কিনা জানি না যে তাঁর স্ত্রীকে আমি কখনো সাধারণ রীতি অনুসারে বউদি বা বৌঠান বলি না। রুমাও আমাকে নাম ধরে বা অন্য কোনো কিছু বলে কখনো সম্বোধন করে না।
আসলে সে আমার সঙ্গে পারতপক্ষে কথাই বলে না। কিন্তু এ বাকসংযম যখন ভাঙে তখন কথাগুলো খুব মধুর থাকে না।
একাদন অমরেশদা কি কাজে স্টেশন থেকে ফিরতে দেরি করছিলেন। সময় মতো গেলেও অমরেশদাকে না দেখে পরে আসব বলে তখনকার মতো চলে যেতে গিয়ে রুমার কাছেই বাধা পেলাম। সে ভেতরে রান্নাঘরে অমরেশদার ফরমাশ মতো কিছু একটা রান্নায় ব্যস্ত ছিল। সেটা শেষ করে কিনা জনি না—ঠিক আমার যাবার সময়ে একটা তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এসে বলেছিল,—যাচ্ছ কেন? বোসো। এখুনি আসবে। তোম্যর জন্য নতুন সব রসিকতা বানিয়ে আনছে। তুমি না থাকলে শোনাবে কাকে!
একসঙ্গে এত কথা রুমাকে এবার এখানে দেখা হওয়ার পর থেকে কোনোদিন বলতে শুনিনি। ফিরে আসতে আসতে একটু হেসে বলেছি,—আমাকে শোনাবার জন্যে বুঝি রসিকতা বানিয়ে আনে। সেই জন্যেই আমার খাতির?
তাছাড়া কি!—রুমা বেশ তিক্ত স্বরে বলেছে,—রসিক বলে খ্যাতিটা চালু রাখবার জন্য তোমার মতো শ্রোতা এখানে পাচ্ছে কোথায়?
তার চাপা ক্ষোভটা বেশ স্পষ্ট বুঝতে পেরে একটু বিস্ময় দেখিয়েই বলেছি—তো রসিকতা বানিয়ে আর তা শুনিয়ে খুশি হলে দোষটা কি?
না দোষ কিছু নেই।—বলেছে রুমা,—শুধু মজা এই যে রসিকতা শুনিয়ে অন্যদের যারা হাসায় নিজেরা তারা নিজরা কখনো হাসে না। হাসতে জানেই না।
এ আবার কিরকম কথা…?
একথার পেছনে কী ধরনের ইঙ্গিত থাকতে পারে?
সে খোঁজের চেষ্টা করার সময় আর হয় নি। অমরেশদা তখনই ফিরে এসছেন। ফিরে এসে আমায় দেখে খুশিতে প্রায় ডগমগ হয়ে বলেছেন—যাক, বাড়িত আমায় না দেখে সেই ছুতোয় পালাও নি তাহলে? রুমা অন্তত সে উসকানি দেয়নি।
বাঃ, উনি উসকানি দিতে যাবেন কেন?—আমি বিস্ময়ের সঙ্গে সত্যি একটু অপ্রসন্ন স্বরে বলেছি,—মিছিমিছি ওঁর নামে দোষ দিচ্ছেন কেন?
দোষ নয় গো দোষ নয়। হেসে উঠে বলেছেন অমরেশদা—ওটা ওদের প্রশংসা করার মতো একটা গুণ। স্বামীর বন্ধুদের ওরা কখনো ভালো চোখে দেখে না।
একটু চেষ্টা করা হাসাহাসির মধ্যে প্রসঙ্গটা সেদিন শেষ হয়েছে।
একলা পাওয়ার সুযোগে রুমার মানর তিক্ততার আভাস কিন্তু পরে আরো কয়েকবার পেয়েছি।
একদিন বলেছে,—এখানে আসা থোক যদি রেহাই পেতে চাও তাহলে তোমার চাকরির ঘাঁটিটা অন্য কোথাও বদল করে নাও।
হেসে উত্তর দিয়েছিলাম?—বদলিটাও আমার হাতে নয়।
তা যদি না হয় তো পুরোনো সব রসিকতার গল্প দশ—বাঘ্নার জায়গায় বিশ ত্রিশ পঞ্চাশ বার শোনা আর হেসে লুটোপুটি খাওয়ার ভান করো।
কী একটা উত্তর একথার দিয়েছিলাম ঠিক মনে নেই—তবে রুমার মনের তিক্ততাটা কেন অমন করুণ লেগেছিল ঠিক বুঝতে পারি নি।
কিছুটা বোঝা গিয়েছিল বুঝি সেই পাহাড়ের চূড়ায় সাধুবাবার কাছে যাবার দিন।
জামালপুরের শহরের কাছাকাছি থেকে পরপর—যে পাহাড়ের সারি দাঁড়িয়ে আছে, তার প্রথমটার চূড়ায় এক প্রৌঢ় সাধু লতাপাতা আর গাছের ডালপালায় একটা সামান্য কুঁড়ে বেঁধে থাকেন। শহরের লোকেরা মাঝেমাঝে পাহাড়ে উঠে তাঁকে দর্শন করে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে আসে। কিন্তু প্রণামীও রেখে আসে সেই সঙ্গে। এছাড়া স্থানীয় বিহারী ভক্তরা তাঁকে আটা নুন চিনি ঘি-র মতো প্রতিদিন প্রয়োজনের জিনিশ দরকার মতো দিয়ে আসে।
প্রৌঢ় সাধুটি অতি সজ্জন ভালোমানুষ। ধর্মকথাটা শোনান না, উপদেশ-টুপদেশও কিছু দেন না। শুধু যে প্রণাম করতে যায়, তাকে ‘ভলা রহো’ বলে আশীর্বাদ করে একটু হাসেন।
অমরেশদা খেয়ালে সেদিন বিকেলে রুমাকে সঙ্গে নিয়ে ওই পাহাড়ের সাধুবাবার আশ্রম দেখবার জন্য বার হতে হল। পাহাড়ে আর উঠলেন না।
পাহাড়ের নীচের জংলা প্রান্তরে সরকারি জরিপদারেরা তখন কটা তাঁবু ফেলেছে। একটা তাঁবুতে তাঁর চেনা অফিসারের দেখা পেয়ে অমরেশদা আর পাহাড়ে উঠতে চাইলেন না। অজুহাত দিলেন তাঁর হৃদযন্ত্রের দুর্বলতার। বললেন, সত্যি, বড় কম উচুঁতে উঠতে হবে না। এখানে এস দেখে ভয় হচ্ছে। তাই ভাবছি কাজ কি ও ঝক্কি নিয়ে। আমি এখানেই বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। তোমরা দুজনে ঘুরে এসো।
কিছু হয়তো এরপর বলার ছিল, কিন্তু তার সুযোগ দিল না। অমরেশদার কথা শুনেই রুমা তখন পাহাড়ের দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি হেঁটে গিয়ে তাকে ধরতে হল। চূড়ায় ওঠবার সময় বেশি কিছু কথা হল না। চূড়ায় ওঠার সহজ চড়াই-এর পথটা রুমার আমার চেয়ে ভালো করে চেনা। অনেকবার এর আগে অমরেশদার সঙ্গে তাকে আসতে হয়েছে। তাব চেনানো পথেই চূড়ায় উঠে সাধুবাবার আস্তানায় পৌঁছলাম। ব্যাপারটা বেয়াড়া হয়ে উঠল তারপরই।
সাধুজির কাছে অন্য ভক্তটক্ত তেমন কেউ নেই। দুজনে কাছে গিয়ে প্রণাম করতেই তিনি আশীর্বাদ করে দেহাতি হিন্দিতে যা বললেন, তার মানে হল, দুজনে মিলে লছমী নারায়ণের মতো চিরসুখী হও।
সাধুজির দিকে একবার চমকে চেয়ে তারপর তাঁকে প্রণামী হিশেবে কিছু দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম।
নামবার পর খানিকক্ষণ কেউহ কোনো কথা বলিনি। তারপর রুমাই প্রথম কথা বলল।
হঠাৎ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করল,—তুমি বদলির চেষ্টা করেছ?
সত্যি কথাটা গোপন করলাম না। বললাম—বদলি হয়ে গেছে।
—হয়ে গেছে? রুমার গলায় ওরকম উচ্ছ্বাসের সুর শুনব ভাবি নি। কোথায় হল, সে জিজ্ঞাসা করল এবার।
খুব দূরে নয়, মোকামায়—তাকে জানালাম।
এবার তার প্রশ্ন—কবে যাচ্ছ?
এখনো ঠিক হয় নি।—সত্যকথাই জানালাম,—তবে পরের সপ্তাহে কোনো একদিন যেতে হবে।
পরের সপ্তাহে!—রুমা কি যেন ভাবল। তাব্বরে জানতে চাইল—খবরটা জানিয়েছ তোমার অমরেশদাকে?
না এখনো জানাইনি।
কোনোদিনই জানাবে না।—জোর দিয়ে বলল রুমা,—কবে যাচ্ছ তাও নয়।
কিছুই জানাব না? রুমার কথার একটু বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম,—কেন?
কেন!—রুমা খানিক চুপ করে রইল। তারপর দৃঢ়স্বরে বলল, কারণ আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি বলে।
তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ? কি বলছ রুমা? কিন্তু…
কোনো কিন্তু কোথাও নেই।—রুমা আমার কথাটা থামিয়ে দিয়ে বললে আমি সব দিক ভেবেই বলছি।
সব দিক ভেবে!—আমি আমার দ্বিধাটা প্রকাশ না করে পারলাম না—মানে আমি ভাবছিলাম অমরেশদার কথাটাও….
হ্যাঁ, তার কথা ভেবেই বলেছি—আবার আমায় থামিয়ে দিয়ে বললে রুমা,—আমাকে তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই। গরিবের ঘরের এক অরক্ষণীয়া মেয়েকে দুদিনের জন্যে তাদের শহরতলির এক আত্মীয়বাড়ি ঘুরে যেতে এসে, আত্মীয় স্বজনের পেড়াপিড়িতে নেহাৎ দয়া করে তিনি উদ্ধার করেছিলেন। যাকে উদ্ধার করেছিলেন একদিক দিয়ে সে তাঁর কাছে এক অবাঞ্ছিত বোঝা ছাড়া আর কিছু নয়। নিত্যনতুন আলাপীর কাছে চিরনবীন আমুদে রসিকমানুষ বলে যে পরিচয়টা তিনি উজ্জ্বল করে তুলতে চান, আমি তার এক অবাঞ্ছিত বাধা। তাঁর বাছাই-করা শত রসিকতাগুলো দশ বিশজন নতুন আলাপীকে বলার সময় হাজার হাজারবার শোনা একজন সাক্ষী হিশেবে থাকাটাই একটা বিশ্রী অস্বস্তির কারণ। সে সব শুনে আমি জোর করে হাসলেও তা নকল বেসুরো লাগে, আর আমায় না হেসে নির্বিকার হয়ে থাকাটাও তেমনি চোখে পড়বার মতো অস্বাভাবিক। না, না। ওঁর জীবন থেকে আমি বাদ পড়লে ওঁর কিছুই আসবে যাবে না, কিন্তু আমি সতি করে বাঁচব। তাই যখন নিশ্চিত করে বুঝেছি তখন কেন তোমার সঙ্গে এমন করে দেখা হচ্ছে? যাওয়াটা নিয়তির নির্দেশ বলে মানব না, কেন আজ এই সাধুজির আশীর্বাদটা জীবনে সফল করে তোলাই প্রতিজ্ঞা হয়ে উঠবে না আমাদের কাছে! যে নিয়তি নির্মমভাবে আমাদের সরিয়ে দিয়েছিল পরস্পরের কাছ থেকে সেই আজ পরম করুণায় আমাদের মেলাবার উপায় করে দিয়েছে। কেন তার এ দান আমরা নেব না!
অভিভূত হয়ে গেলেও দু-একটা কথা বলার আছে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু তা বলতে পারি নি।
সেখানেই ঠিক হয়েছে কাউকে কিছু না জানিয়ে আমি নির্দিষ্ট দিনে জামালপুর স্টেশন থেকে মোকামায় রওনা হয়ে যাব, যে গাড়িতে যাব, সেটা খুব ভোরের সময় জামালপুরে আসে। যত ভোরেই হোক রুমা যথাসময়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে পৌঁছবে, বাড়ি থেকে আসতে কোনো অসুবিধাই তার হবে না। হলেও সে তা অনায়াসে কাটাতে পারবে।
এরপর বেশি কিছু জানাবার নেই।
নির্দিষ্ট দিনের আগেই ট্রেনে নয় বাস-এ করে আমি জামালপুর ছেড়ে গেছি তাও মোকামায় যাই নি। অফিস থেকে তার আগেই চিঠি লিখে কিছুদিন ছুটির ব্যবস্থা করে কিছুদিনের জন্যে মুঙ্গের-এই চলে গিয়েছিলাম।
সেখান থেকে ছুটির পর মোকামার কর্মস্থলে গিয়ে রুমার চিঠিটা পেয়েছিলাম সে আমার কোম্পানির উল্লেখ দিয়ে মোকামায় তাদের অফিসে চিঠিঢা পাঠিয়েছিল।
চিঠিটা সবটাই এখনো বোধহয় স্মরণ করে বলে দিতে পারি।
ওই ‘তুমি আস নি’-র জায়গাটাও।
কি মনে হয়েছিল সেটা পড়ে! একটা কঠিন আত্মত্যাগের মহত্ত্বের আত্মপ্রসাদ?
না, একটা গভীর সংশয়ের দুঃসহ হৃদয়-ছিঁড়ে ফেলা প্রশ্নের যন্ত্রণা।
মহৎ হওয়ার চেয়ে সার্থক হবার দাবি কি বড় ছিল না আমাদের জীবনে?



পাঠকের মন্তব্য