তিনুর হাতে ইয়া বিশাল এক কাঁচা সবুজ আম! তিনুর একহাতে সেটা আঁটেনি। তাকে তার শিশু দুইহাত মেলে ধরতে হয়েছে আমটিকে পুরোপুরি হাতের মুঠোয় করে ধরতে। সে এত অবাক হয়েছে যে এখনো ভূতগ্রস্তের মত থমকে দাঁড়িয়ে। বৈঁচি কোথা থেকে হঠাৎ দৌড়ে এসে তিনুর হাতে এই বোম্বাই সাইজের আম দেখে এমন এক চিৎকার দিলো যে কেঁপে উঠে তিনুর শরীরে সাড় ফিরে এল।
: এম্মা! দ্যাখ না কেনে! কী বিশাল আম পইড়েছে গো তিনুর হাতে! ওরে তোরা আয়রে!
: চেঁচাসনি বৈঁচি! সেন মশায় আলেন বইলে! দেখলি পরা কাইড়ে নেবেনেন!
বৈঁচিও চটজলদি থেমে গেল। ফিসফিসিয়ে তিনুকে শুধালো, পালি কুহানে রে অ্যাত্ত বড় আমখানা? তিনু হাত দিয়ে সেনবাড়ির প্রধান ফটকের দিকে দেখিয়ে দিল। ওদিকে বৈঁচির হাক শুনে পুঁটি, বিশু, ফটিক, নোশাদ, পাখি সবাই হইহই-রইরই করে এদিকেই আসছে বোঝা গেল। তিনু বৈঁচিকে চুপ থাকতে ইঙ্গিত করে দ্রুত সেখান থেকে সরে এল।
সক্কালবেলা পাঠশালা থেকে ফিরে নাকেমুখে কিছু গুঁজেই নিজের প্লাটুনের সাথে বেরিয়েছিল তিনু। মা পিছু ডেকেছিলেন দিদির জ্বর হয়েছে বলে। তিনু ফিরে তাকায়নি। দিদির কাছে এখন গিয়েও লাভ নেই। দিদি জ্বরে বেহুঁশ। শুধু জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে। কী বলে তাও বোঝা যায় না। সেই দিদির কাছে থেকে লাভ কী? সে ছুটল। তার দল যে বিশাল মজা লুটছে সে ঘরে বসে থেকে সেগুলোকে বাদ দেয় কীভাবে? তাছাড়া তার আরও একটি কাজ আছে। সব কাজ কি সবাইকে দিয়ে হয়?
বাইরে বেরিয়ে ছুট্টে সে দলের সাথে মিশে গেল। সবাই মিলে যাচ্ছে রুপাইয়ের তীরে ডাহুকে বাচ্চা দিয়েছে তাই ধরে আনতে। সে বড় মজা! চড়ুইভাতি করা হবে। মা শুনলে সাড়ে সর্বনাশ! শুধু তার একার না, সকলেরই। তাই চড়ুইভাতি হবে গোপনে। মা ডাহুকের কাছ থেকে বাচ্চা চুরি করে আনা বড় দুঃসাহসের কাজ। মা ডাহুক তীরের মত ছুটে আসে কামড়াতে। বারবার তাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে শেষে ফাঁক-ফোকর বের করে ছানা নিয়ে পালাতে হয়।
তারা দুঘণ্টা গলদঘর্ম হয়ে দুটি ডাহুকছানা নিয়ে আসতে পারল। দলটির সকলের একান-ওকান জোড়া হাসি। বিশ্বজয় করেছে তারা। শুধু তিনুর মনটা একটু খারাপ। দিদিটা থাকলে তার মজা হয় দ্বিগুন। দিদির সবকিছুতেই তার বড় আনন্দ হয়। কতদিন যে হল দিদির জ্বর!
রুপাইয়ের পাড় থেকে ফিরে আসতে আসতে সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে সেন মশাইয়ের বাড়ির আশেপাশে উকিঝুঁকি মারল তিনু। এখানেই তার একটা বিশেষ কাজ আছে। কিন্তু সেন মশাই লোকটা বড্ড হাড়-কেপ্পন। তার সীমানার ধারেকাছে কাউকে বিশেষ করে তিনুদের দলটাকে দেখলেই বাঁশের লাঠিহাতে তাড়া করেন। তার বাড়ির ভেতরে আম, জাম, লিচু, তেতুল, বরই, চালতা মানে যা দেখলেই তিনুদের দলটির জিভে পানি এসে যায় তার সবকিছুই মজুদ আছে। আর এই ফলগুলোর বড় বড় গাছগুলি ফলের ভারে তার বাড়ির সীমানার বাইরে এদিক-সেদিক ঝুকে রয়েছে। এ তল্লাটে এতরকম ফল গাছওয়ালা বাড়ি আর নেই।
কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছু হয় না। কারণ সেন মশাই, সেন গিন্নী আর তাদের ছেলেমেয়েগুলোর গাছগুলোর দিকে যেন শ্যেনদৃষ্টি। বাইরের মানুষের হাতে ভুলেও যেন একটা বরই পর্যন্ত না পড়ে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা তারা করে থাকে। তাই যত ফলই চোখের সামনে ঝুলুক না কেন কারো ভাগ্যেই শিকে ছেঁড়ে না।
কাল দিদি জ্বরের ঘোরে আম-কাসুন্দি খেতে চাইলে। বাবা বাড়ি আসে না আজ ছমাস হল। মায়ের হাতে আর আর কিছু নেই যে তিনি বাজার থেকে আম-কাসুন্দি কিনে আনবেন। তিনু ও বাড়ির ভালোপিসির কাছে মাকে বলতে শুনেছে, নাকছাবিটা ছিল বলে এ যাত্রা মেয়েটার একটু ওষুধ-পথ্যি করতে পারছি ঠাকুরঝি। তবু তো মেয়েটা মুখে কিছু তুলতে পারছে না। জ্বরও ছাড়ছে না, আমি কী করি বলো তো?
তাই তিনু চিন্তা করে বেরিয়েছে সেনবাড়ির আমগাছ থেকে যেভাবেই হোক একটা আম সে পেড়ে আনবেই। সে দেখেছে সেনবাড়ির ফটকের কাছে ঝোপায় ঝোপায় বিশ-পঁচিশটি আম ঝুলছে। সেখান থেকে একটা না থাকলে তারা বুঝবেই না।
সেনবাড়ির সীমানা ঘেঁষে সে ঘিরে বেড়াচ্ছিল। দুপুরের পর থেকেই আঁধার হয়ে এসেছে চারিদিক। ঝড় এলো এলো বলে! তার আগেই তাকে বাড়ি ফিরতে হবে নইলে মা মেরে তক্তা বানাবেন।
কিন্তু বিধি বাম! হুড়মুড়িয়ে ঝড় এসে পড়ল আর বড় বড় ফোটায় বৃষ্টিও শুরু হল দেখতে দেখতেই। তিনুর দলটি ব্যস্ত ছিল ডাহুকের বাচ্চা লুকানোয়। তারা ঝড়-বৃষ্টি দেখে পাগল হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গান ধরল,
ঝড় এলো, এলো ঝড়
আম পড়, আম পড়
কাঁচা আম,ডাসা আম
টক টক মিষ্টি...
ঝড়ের তাণ্ডবে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তিনুর মাথায় ঘুরছে শুধু একটা আম! আবারও তার মন পুড়ছে! তার দিদিটা বৃষ্টি বড্ড ভালোবাসে। শীলপড়া বৃষ্টি তার আরও পছন্দের। যখন শীল পড়ে তখন দিদি আর সে রোয়াকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের চোখের আড়ালে শীল তুলে তুলে খায়। দিদিটা কটমটিয়ে শীল খেতে পারে, সে পারে না। রমেনকাকার দোকানের লেবেনচুষের মত চুষে চুষে খায়। দিদি তাকে দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ে আর হামহুম করে তাকে চুমো খেয়ে দেয়। সেও হাসে, দিদিও হাসে।
তিনুর কান্না পেয়ে গেল। সকালে সে যখন বেরিয়ে আসে তখনও মা দিদিকে ডেকে বলছিলেন, ও তিলু, ওঠ মা! একবারটি এই জাউটুকু মুখে তোল মা। এভাবে না খেয়ে পড়ে থাকলে সুস্থ কিভাবে হবি মা? দিদি উত্তর করে নি, চোখও খোলে নি, খায়ও নি। আজ তাকে যেভাবেই হোক আম নিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে। তবেই দিদি ভালো হবে আর একসাথে চড়ুইভাতি করবে, আম পাড়বে, শীল খাবে, মায়ের বকুনি খেয়েও বৃষ্টিতে ভিজবে।
মজা হচ্ছে ঘুরতে ঘুরতেই বাতাসের তোড়ে সেনবাড়ির ফটকের কাছে ঝুলে থাকা ঝোপা থেকে একটা বিশাল টসটসে আম একাই তিনুর হাতের ওপরে পড়ল! তিনু অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন বৈঁচির চিৎকারে সে তাকে থামিয়ে বললে, চেঁচাসনি! এ আমখানা দিদির জন্য নেব রে। দিদি খেতে চাইছিল।
তিলুর কথায় বৈঁচিরও চোখে পানি এসে গেল। ওরা পাশের বাড়িতেই থাকে। দিদির সব কষ্টের কথা জানে। ও মাথা নেড়ে সায় দিল। আর দুজন মিলে বাড়ির পথে দৌড়ুল। আজ এমনিতেই খবর আছে!
কিন্তু বাড়ির কাছে যাবার আগেই এই তান্ডবের মধ্যেও চিৎকার করে কান্নার রোল ভেসে এলো। তিনু, বৈঁচি দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কী হয়েছে তাদের বোধগম্য না হলেও বিভৎস কান্নার শব্দে ভীত হয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগোল ওরা। কিন্তু বাড়ির ভেতরে গিয়ে যা দেখল তাতে তিনুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দিদির বিছানায় দিদি নেই, কাপড়ে মোড়া কি একটা পড়ে আছে! মা আছাড়ি-পিছাড়ি করে কাঁদছেন আর ভালোপিসি তাকে জড়িয়ে আছেন শক্ত করে।
তিনু বুঝলো না কী হয়েছে। কিন্তু ভয়ে, আতঙ্কে আর কোন অমঙ্গলের আশঙ্কায় তার শিশুহৃদয় কেঁপে উঠল। চোখ ভরে গেল পানিতে। হঠাৎ মা তাকে দেখতে পেয়ে উঠে এসে ঠাটিয়ে চড় বসিয়ে দিলেন গালে। তিনু দেখতে দেখতে মাথা ঘুরে পড়ে গেল, হাত থেকে ছুটে গেল আম। মা চেঁচিয়ে বললেন, ছিলি কোথায় হতচ্ছাড়া? মেয়েটা আমার শেষ সময় পর্যন্ত তোর নাম করে করে মুখে ফেনা তুলে ফেললো, আমি কি পারলাম তোকে একটিবার তার চোখের সামনে ধরতে?
বলতে বলতে মা আরও কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন। ঘরে আর যারা ছিল তারা তিনুকে কোলের ভেতর লুকিয়ে ফেলে মায়ের হাত থেকে বাঁচালো।
তিনু তার বোনের জন্য আনা আমটি কুড়িয়ে নেবার জন্য ওত পেতে রইল। দিদিকে দিতে হবে, দিদি ঠিক খুব খুশি হবে। মা মেরেছেন তো কি হয়েছে? দিদি খুশি হলেই সব কষ্ট সেরে যাবে। তাই মার খেয়েও কাঁদল না তিনু।
ভালোপিসি বললেন, ওকে একটু দেখিয়ে নিয়ে যাও, সৎকারের লোক এলো বলে।
কেউ একজন তিনুকে বের করে দিদির বিছানার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল। তিনু ফাঁক পেয়ে আমটি তুলে নিল। তাকে বিছানার কাছে নিয়ে এসে কাপড়ের পোটলাটির মুখ খুলে দিল। তিনু দেখল তার দিদি ঘুমিয়ে আছে। সে আস্তে করে দিদিকে নাড়া দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললে, দিদি একটু তাকা। দ্যাখ কি এনেছি! ও দিদি...দ্যাখ না চেয়ে!
দিদির মুখের কাছে আমটা নাড়িয়ে দেখায় সে। বিশ্বজয় করে এসেছে সে। দেখছে না কেন তার দিদি?
সবাই চোখে আঁচল দিল। তিনুকেও সরিয়ে দিল। সে যেতে চাইল না দিদির কাছ থেকে। কিন্তু জোর করেই তাকে সরিয়ে দেয়া হল।
সৎকারের লোক এসে তার দিদিকে তুলে নিলো হরিবোল দিয়ে। মা চিৎকার করে জ্ঞান হারালেন। তিনু ডুকরে কেঁদে উঠে বললে, ওকে কোথায় নিচ্ছ? নিয়ো না, নিয়ো না ওকে। তিনুও জ্ঞান হারাল।
প্রচন্ড বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। তিনেশ্বর মজুমদার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। তার শিশুকন্যা বৃষ্টি থেকে শীল কুড়িয়ে মুখে পুরছে মায়ের দৃষ্টির আড়ালে। বাগানের এককোনে হুড়মুড়িয়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ল। মেয়েটি ভয় পেল না বরং এগিয়ে গিয়ে ভাঙা ডালটা থেকে ঝরে পড়া আম কুড়িয়ে নিল। দৌড়ে ফিরে আসছে এমন সময়ে তার মা তাকে ধরে ফেললেন।
লোচন? ওরে পাজি, কী হচ্ছে কী অ্যা? কী কচ্ছিলি দস্যিমেয়ে?
মেয়ে মায়ের কোলে মুচড়ে উঠল। দেখাতে চাইল না তার গোপন সম্পদ। কিন্তু মায়ের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে আমগুলো দেখিয়ে বললে, বাবা যাব। বাবা আমি আম খাব।
মা জলদি ফেরাতে চাইলেন। না মা, বাবা খাবে না, কাঁদবে। এসো, আমি তুমি মিলে খাই।
মেয়ে নাছোড়বান্দা। তার মা তার সাথে পেরে উঠছে না। তিনেশ্বর তার কন্যা ত্রিলোচনার মধ্যে তার স্বর্গীয়া দিদিকে খুঁজে পেলেন। লোচনের মুখটি যেন অবিকল তার দিদি তিলুর!
তিনি ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন উঠানে। মেয়ে তাকে দেখে ছুট্টে এল। তিনি হাত পাততেই ঝাঁপ দিয়ে কোলের মধ্যে পড়ল। আধোস্বরে বললে, বাবা... আম...
বাবার চোখে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু! বললেন, চল মা, একসাথে আম খাই। লোচন খুশিতে বাপের গলা জড়িয়ে ধরলে। আর ওপর থেকে অলক্ষ্যে কেউ যেন মুচকি হাসলে!



পাঠকের মন্তব্য