দেয়াল ভাঙার বসন্ত

২৩ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে

পশমি টুপি আর সাদা দাড়িওয়ালা মোবাশ্বের সাহেব যখন মহল্লার গলির মোড়ে দাঁড়াতেন, তখন চারপাশের বাতাসে একটা অদৃশ্য থমথমে ভাব নেমে আসত। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটির কাছে জীবন ছিল একটা আঁটসাঁট জ্যামিতিক বাক্স। তাঁর জগতের নিয়মগুলো সরল কিন্তু কঠোর: যা কিছু ধর্মীয় অনুশাসনের গণ্ডির বাইরে, তা-ই ক্ষতিকর। বিশেষ করে গান, কবিতা আর সিনেমাকে তিনি দেখতেন শয়তানের সবচেয়ে সুক্ষ্ম ফাঁদ হিসেবে, যা মানুষের মনকে চঞ্চল করে এবং খোদাবিমুখ করে তোলে।

তাঁর এই কঠোর দর্শনের সবচেয়ে বড় বলি ছিল তাঁর বাইশ বছরের ছেলে আরিশ। আরিশের টেবিলের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই কিংবা বালিশের নিচে রাখা মাউথ অর্গানটা মোবাশ্বের সাহেবের চোখে ছিল 'ঈমান ধ্বংসের হাতিয়ার'। একদিন সন্ধ্যায় আরিশ যখন ঘরে গুনগুন করে সুর ভাঁজছিল, মোবাশ্বের সাহেব আচমকা ঘরে ঢোকেন। রাগে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। মাউথ অর্গানটা কেড়ে নিয়ে ঘরের মেঝেতে আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেন তিনি।

এসব ফালতু আবেগ আর কাল্পনিক মিথ্যা মানুষকে কাপুরুষ বানায়, আরিশ! জীবন চলে কঠিন নিয়মে, কোনো সস্তা সুরে নয়, মোবাশ্বের সাহেবের কণ্ঠ ছিল পাথরের মতো শীতল ও অনমনীয়।

আরিশ বাবার দিকে তাকিয়েছিল। সেই চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক চরম শূন্যতা। সে শুধু বলেছিল, আব্বা, নিয়ম দিয়ে শরীর বাঁধা যায়, মন নয়। আপনি ঈশ্বরের নিয়ম বোঝেন, কিন্তু তাঁর দেওয়া মানুষের হৃদয়টা বোঝেন না। সেই রাতেই আরিশ ঘর ছাড়ে। কোনো চিঠি নেই, কোনো ঠিকানা নেই।

প্রথম কয়েক মাস মোবাশ্বের সাহেব নিজের অনমনীয় যুক্তিতে অটল ছিলেন। তিনি নিজেকে বোঝাতেন, তিনি যা করেছেন তা এক একজন আদর্শ বাবার দায়িত্ব। সন্তানকে 'নষ্ট' হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এই কঠোরতা জরুরি ছিল। কিন্তু সময় যত গড়াল, একাকীত্বের অন্ধকার ঘরটা তাঁর সেই যৌক্তিক দেয়ালে ফাটল ধরাতে শুরু করল।

বিশাল বাড়িটাতে তিনি একদম একা। ফজরের নামাজের পর যখন পুরো পাড়া নিস্তব্ধ থাকে, তখন ঘরের দেয়ালগুলো যেন তাঁকে গিলতে আসত। তিনি চা বানাতে গিয়ে কাপের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, আরিশের প্রিয় চায়ের মগটা ধুলো জমে সাদা হয়ে আছে। মোবাশ্বের সাহেব যুক্তি দিয়ে নিজের মনকে শান্ত করতে চাইতেন, আমি তো সঠিক ছিলাম। কিন্তু তাঁর অবচেতন মন পাল্টা প্রশ্ন করত, তাহলে এই বুকে এত সুক্ষ্ম ব্যথা কেন? কেন রাতে ঘুম আসে না?

 

তিনি বুঝতে পারছিলেন না, শুধু নিয়ম আর অনুশাসন দিয়ে কেন এই একাকীত্বের তীব্র হাহাকার কমানো যাচ্ছে না। যুক্তি যেখানে এসে থমকে দাঁড়ায়, মানুষের মন ঠিক সেখান থেকেই অন্য কিছুর সন্ধান করে।

অবরুদ্ধ মনে শিল্পের প্রথম আঘাত

আরিশ চলে যাওয়ার দুই বছর পরের ঘটনা। শীতের এক বিকেলে মোবাশ্বের সাহেব পুরোনো একটা ট্রাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে ধুলোবালি মাখা একটা ডায়েরি খুঁজে পান। ডায়েরিটা আরিশের। প্রচ্ছদে একটা শুকনো শিউলি ফুল লেপ্টে আছে। পাতা ওলটাতেই মোবাশ্বের সাহেবের চোখ আটকে গেল আরিশের গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কিছু লাইনে:

মা মারা যাওয়ার পর আব্বা যখন জায়নামাজে বসে একা কাঁদতেন, আমি দরজার আড়াল থেকে দেখতাম। আব্বার সেই নিঃসঙ্গ পিঠটার দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা ফেটে যেত। আমি তখন সুর দিয়ে আব্বার সেই কষ্টটা ছুঁতে চাইতাম। আমি চাইতাম আমার একটা কবিতা আব্বার এই একাকীত্বকে একটুখানি জড়িয়ে ধরুক...

লাইনগুলো পড়ার পর মোবাশ্বের সাহেবের হাতের ডায়েরিটা কেঁপে উঠল। তাঁর ভেতরে একটা তীব্র ভূমিকম্প হয়ে গেল। তিনি এতকাল ভেবে এসেছেন আরিশের এই কবিতা, এই সুর হলো অবাধ্যতা আর চারিত্রিক স্খলন। কিন্তু এখন আরিশের লেখা শব্দগুলো তাঁর সামনে এক অকাট্য সত্য উন্মোচন করল, শিল্প কোনো বিলাসিতা বা পাপ নয়, এটা ছিল তাঁর অবাধ্য ছেলের ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র ভাষা! যে ভাষা মোবাশ্বের সাহেব তাঁর কঠোরতার কারণে কখনো পড়তে চাননি। তাঁর এতকালের চেনা যুক্তির জগৎটা এক মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

ভেতরের এই তীব্র ছটফটানি আর অপরাধবোধ নিয়ে মোবাশ্বের সাহেব একদিন বিকেলে শহরের এক গলিতে হাঁটছিলেন। হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা না পেয়ে তিনি সামনের এক জীর্ণ চায়ের দোকানে এসে দাঁড়ালেন। জনা আস্টেক লোক আছে দোকানে। চা খাচ্ছে কেউ। কেউবা এমনি বসে আছে। তাদের চোখ আটকে আছে দোকানের ভিতরে লোহার খাচায় ঝুলানো একটা শয়তানের বাক্সে। ওদিকে চোখ পড়তেই মনে। অনে নাওযুবিল্লাহ বলে চোখ সরিয়ে নিলেন তিনি। তাঁর মনে এক তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছিল, তিনি এক 'গুনাহের জায়গায়' দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাত পাঞ্জাবি পড়া একটা লোক স্ক্রীনে দেখা গেল। তিনি আরেকবার তাকালেন ওইদিকে।

পর্দায় তখন একটা সাদাকালো ইরানি চলচ্চিত্র চলছিল। একজন অন্ধ বাবা ও তাঁর ছোট্ট ছেলের গল্প। বাবাটি তাঁর অন্ধত্বের কারণে ভীষণ খিটখিটে আর কঠোর, সবসময় ছেলেকে শাসন করেন। কিন্তু ছেলেটি লুকিয়ে লুকিয়ে প্রকৃতির শব্দ শোনে, পাখির ডাক নকল করে সুর তৈরি করে। সিনেমার এক পর্যায়ে, বাবাটি বুঝতে পারেন তাঁর কঠোরতা কীভাবে ছেলেটির ভেতরের নিষ্পাপ আনন্দকে মেরে ফেলছে। ছবির শেষ দৃশ্যে, সেই অন্ধ বাবা যখন বৃষ্টির মধ্যে তাঁর হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে পাগলের মতো খুঁজছেন এবং মাটির দিকে হাত বাড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছেন, তখন দোকানের অন্ধকার কোণে বসা মোবাশ্বের সাহেবের চোখ দিয়ে বাঁধভাঙা জল নেমে এল।

পুরো দোকান জুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। চায়ের কাপে হাত আটকে আছে। শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা বিষাদময় সুর বাজছিল। মোবাশ্বের সাহেব আর পর্দায় সিনেমা দেখছিলেন না, তিনি যেন এক জাদুকরি আয়নায় নিজের আত্মাটাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। যে সিনেমাকে তিনি 'মিথ্যা আর বিনোদন' বলে ঘৃণা করতেন, সেই সিনেমাই আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটাকে চোখের সামনে নগ্ন করে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন, শিল্প-সাহিত্য কোনো চরিত্র নষ্টের হাতিয়ার নয়; বরং তা মানুষের ভেতরের জমে থাকা পাথরকে গলিয়ে দেওয়ার এক স্বর্গীয় আলো। এটা মানুষকে অন্য মানুষের দুঃখ ভাগ করে নিতে শেখায়, সহমর্মী হতে শেখায়।

যখন মোবাশ্বের সাহেব দোকান থেকে বের হলেন, তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। চারপাশের আকাশটা তাঁর কাছে অন্যরকম লাগল। তিনি বুঝতে পারলেন, জীবনকে শুধু নিয়ম আর আদেশের ফ্রেমে বাঁধা যায় না; জীবন সুন্দর হয় সুর, রঙ আর অনুভূতির মেলবন্ধনে। ঈশ্বর মানুষকে কেবল মগজ দেননি, একটা নরম হৃদয়ও দিয়েছেন। আর শিল্প হলো সেই হৃদয়ের যত্ন নেওয়ার উপায়।

বাড়িতে ফিরে তিনি সোজা আরিশের ঘরে গেলেন। মেঝে থেকে আরিশের সেই ভেঙে ফেলা মাউথ অর্গানের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিলেন। পরম মমতায় সেগুলোতে হাত বুলালেন। তারপর আলমারি থেকে আরিশের ফেলে যাওয়া সব কবিতার বই পরম যত্নে নিজের বুকশেলফে, তাঁর ধর্মীয় বইগুলোর ঠিক পাশে সাজিয়ে রাখলেন।

পরদিন সকালে মোবাশ্বের সাহেব আরিশের এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়লেন। ছেলেটি মোবাশ্বের সাহেবকে দেখে ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল। মোবাশ্বের সাহেব তার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর চোখে তখন কোনো কঠোরতা ছিল না, ছিল এক পরম আর্দ্রতা।

তিনি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, বাবা, তোমরা পাড়ায় যে নাটকটা করতে চেয়েছিলে, তার খরচটা আমি দেব। আর... আরিশের খোঁজ যদি পাও, ওকে শুধু একটা বার্তা দিও, ওর আব্বা এখন কবিতা পড়তে শিখেছে। ও যেন বাড়ি ফিরে আসে, আমি নিজে ওর হাতে একটা নতুন মাউথ অর্গান তুলে দেব।

মোবাশ্বের সাহেবের সাদা দাঁড়ির ফাঁক দিয়ে তখন এক চিলতে আলো এসে পড়েছে, যেন বহু বছরের এক জড়ো হওয়া শীতের পর তাঁর মনে আজ প্রথম বসন্তের হাওয়া লেগেছে।

২৩ পঠিত ... ৬ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top