১.
কুয়াশায় আবছা এক চৈত্র মাসের ভোর। চৈত্রমাসে কুয়াশা? রাজশাহীর পুঠিয়া। এই অঞ্চলে এমনটাই হয়। সেই ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসছেন রাবেয়া। মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করলে মা বলতেন, আমাদের এখানে প্রকৃতি লজ্জা বেশি পায় রে মা, তাই সে কুয়াশার ঘোমটা দেয়।
আজ মা নেই। ছিলেন না তো রাবেয়া নিজেও। আট বছরের এক লম্বা সময় পর ঢাকা থেকে বাপের বাড়ির ভিটায় ফিরলেন রাবেয়া বানু চৌধুরি। সাথে নিয়ে এসেছেন তার সতেরো বছর বয়েসী মেয়ে তটিনীকে। মেয়েও ঠিক তার মায়ের ছোটবেলার মত চেহারা করে গাড়ির বাইরে মুখ রেখে অবাক চোখে তাকিয়ে মাকে প্রশ্ন করল,
: এ কোন সময়ের কুয়াশা মা?
রাবেয়া অবাক হয়েও হেসে ফেললেন,
: আমাদের এখানে প্রকৃতি লজ্জা বেশি পায় রে মা, তাই ভোরবেলা সে কুয়াশার ঘোমটা মুড়ি দেয়!
মেয়েটার অবাক ভাব কিছুক্ষণ থাকল। তারপরই তার স্বাভাবিক ‘'যা খুশি হোক গে' চেহারায় ফিরে এলো। তটিণী তার নানাবাড়িতে আসতে রাজি ছিল না। এটা জমিদারবাড়ি ঠিকই কিন্তু সে ঢাকার জাঁকজমকের জীবন ছেড়ে এখানে পড়ে থেকে কি করবে?
আসতে রাবেয়ার নিজেরও খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু, বড় ছেলে তন্ময়ের ভুল ব্যবসা আর স্বামীর মৃত্যুর পরও রাবেয়া বেগমের বিলাসী জীবনের কারনে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণে আজ অন্য সবকিছুর সাথে তাদের এই জমিদার বাড়িও নিলামের মুখে।
এসব চিন্তা করতে করতেই পুঠিয়ার স্টেশনে এসে থামল তাদের বিলাসবহুল গাড়িটি। অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়েছে, কিন্তু চক্ষুলজ্জায় আজও চৌধুরীরা সবচেয়ে বিলাসি জিনিস ব্যবহার করে।
স্টেশনে তাদের নিতে এসেছে মোস্তফা। মোস্তফার পরনে দামি স্যুট, আঙুলে সোনার আংটি। রাবেয়া অবাক হলেন। তাঁর স্মৃতিতে ছিল মোস্তফার ছেড়া প্যান্ট, গায়ে একটা কোনরকম -গায়ে দিতে হয় তাই দেয়া এমন একটা জামা। তার মা তাকে পাঠিয়েছে রাবেয়ার মায়ের কাছ থেকে কিছু চাল ভিক্ষা নিতে। আজ নাকি এই মোস্তফা বিশাল ব্যবসায়ী হয়েছে। তাঁর মনে পড়ল, এই মোস্তফার বাবা একসময় এই বাড়ির বাগানে আম পাড়ার অপরাধে চাবুকের বাড়ি খেয়েছিল।
বাড়ির সদর দরজায় পা রাখতেই রাবেয়া বেগমের চোখ জলে ভরে উঠল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখা যায় মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত তাদের বিখ্যাত আমের বাগান। শুধু রাজশাহী কেন, পুরো বাংলা অঞ্চল জুড়ে ছিলো এই বাগানের নাম! এমনই ছিলো এই জমিদারবাড়ির আর এই আমবাগানের গরিমা! এখন কেবল গাছে গাছে মুকুল এসেছে, মৌ মৌ গন্ধে চারপাশ মায়াবী।
হুড়মুড়িয়ে যেন রাবেয়ার আবেগ চোখে মুখে ছুটে এলো। মেয়েকে বললেন,
: তটিনী, ঐ দেখ আমাদের ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি আর ফজলি আমের বাগান। এই বাগানের ছায়ায় আমার মা আমাকে কোলে নিয়ে বসতেন। কতদিন বাবার সাথে এখানে দাবা খেলেছি। আমার শৈশব, কৈশোর, আমার যৌবনের সব স্মৃতি, তোর বাবার ভালোবাসা এই বাতাসে মিশে আছে। এই বাগান আমি ছাড়া বাঁচবে না, আর বাগান ছাড়া আমিও বাঁচব না।
২.
নানা কথায় অনেক দেরি হয়ে গেল। দুপুরে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বাগানের মাঝখানের যে বিশাল দীঘি তার শানবাঁধানো ঘাটে সবাই এসে বসেছে। মোস্তফাও আছে। সে খুব হিসাব নিকাশ করে রাবেয়া বানুকে বোঝাতে চাইল,
: বড়মা, আবেগ দিয়ে তো ব্যাংকের লোন শোধ হবে না। আগামী বাইশে শ্রাবণ এই জমি আর বাগান নিলামে উঠবে। আমার একটা বুদ্ধি একটু শোনেন। এই একশ বছরের পুরানা গাছগুলো সব কেটে ফেলেন। আমি নকশা তৈরি করে আনছি, এই পুরো বাগানের জমি সমান করে এইখানে একটা আধুনিক শপিং মল আর কটেজ রিসোর্ট বানান। কোটি টাকা লাভও হবে, আপনার ঋণও শোধ হবে।
রাবেয়া বানুর গা কেপে উঠল। হাত দিয়ে কান ঢাকা দিলেন,
: চুপ করো মোস্তফা! তুমি ব্যবসায়ী, তুমি কী বুঝবে এই গাছের মুল্য? এই বাগান কাটা মানে আমার কলিজা কেটে ফেলা। কোনো না কোন উপায়ে ঠিক টাকার জোগাড় হয়ে যাবে। তুমি চিন্তা করো না বেশি।
তটিণীর এক ক্লাসমেটও তাদের সাথে এসেছে- নাম মাহফুজ। সে আবার আদর্শবাদী ছাত্র। এ অঞ্চলের ইতিহাস সম্পর্কে জানে অনেক। সে তটিণীকে বলল,
: তটিনী, এই বাগানের প্রতিটি আমের গাছের ছায়ায় লুকিয়ে আছে তোমাদের পূর্বপুরুষদের শোষণের ইতিহাস। প্রজাদের রক্ত চুষে এই বাগান গড়া হয়েছে। এই রক্তের দাম কিভাবে শোধ হবে,বল? এই বাগান ধ্বংস হওয়াই উচিত, তবেই নতুন মুক্ত পৃথিবীর জন্ম হবে।
তটিনী মাহফুজের চোখের দিকে তাকিয়ে এক নতুন ভবিষ্যতের আলো দেখতে পেল।
৩.
আজ বাইশে শ্রাবণ। আজই এই বাড়ির নিলামের রাত। অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার! রাবেয়া বানু নিজের বাস্তবতাকে আড়াল করতে সেই রাতেই জমিদার বাড়ির নাচঘরে এক বিশাল জলসার আয়োজন করেছেন। বাঈজি নাচছে, গ্রামের মোড়লদের দামি আতর আর দামি পোলাও খাওয়ানো হচ্ছে। অথচ রাবেয়া বানুর নিজের কাছে একটা টাকাও নেই! তিনি কাঁপছেন আর অপেক্ষা করছেন তার ভাইয়ের জন্য, যে শহরে গেছে নিলাম ঠেকাতে।
রাবেয়া এতসব হৈচৈ এর মাঝেও চিন্তা করছিলেন নিজের ভবিষ্যত নিয়ে। জন্মেছিলেন জমিদার-কন্যা হিসেবে। আরামের জীবনই কাটিয়েছেন বাবার বাড়িতে। বিয়ে হয়েছিলো আরেক ধনী লোকের সাথে। রক্তের সাথে মিশে যাওয়া বিলাসী জীবন কিভাবে বাদ দেবেন তিনি জীবন থেকে? ঢাকায়ও তাঁর আরামের বিলাসের জীবন ছিলো। কিন্তু আজ কী হবে? আরে নাহ- তিনি পারবেন না সাধারনের মত জীবন যাপন করতে। সম্ভব না।
রাত বারোটায় ভারী বুটের আওয়াজ তুলে ঘরে ঢুকল মোস্তফা। তখনও জলসাঘরের মচ্ছব শেষ হয়নি। মোস্তফার হাত কাঁপছিল, চোখে এক আদিম হিংস্র আনন্দ। রাবেয়া বানু ছুটে গেলেন তার কাছে- যেন হাজার বছরের পুরনো বন্ধু সে। জিজ্ঞেস করলেন,
: মোস্তফা! বিক্রি হয়ে গেলো নাকি? নিলাম হয়ে গেলো আমাদের জমিদারবাড়ি আর বাগানের? কে কিনল আমাদের বাগান? লোন কি শোধ হলো?
মোস্তফা পকেট থেকে দলিলটা বের করে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। তারপর হা হা করে হেসে উঠে বলল,
: বাগান আমি কিনেছি বড়মা! হ্যাঁ, আমি... মোস্তফা! যার বাবা এই বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে কথা বলার সাহস পেত না, যার ছেলেবেলা কেটেছে এই বাড়ির ভিক্ষার চালে- আজ এই পুরো পরগনা তার পায়ের নিচে! কাল থেকে এই বাগানের মালিক আমি!
পুরো জলসাঘর চুপ হয়ে গেল। রাবেয়া বানু সোফায় ভেঙে পড়লেন, তার চোখ দিয়ে কেবল নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। অভিজাত শ্রেণীর অহংকার আজ ধুলোয় মিশে গেল নতুন টাকার শক্তির কাছে।
৪.
পরদিন সকাল। আজ আকাশ মেঘলা। কিছু পুরনো জিনিসপত্র আর স্মৃতি নিয়ে জমিদারকন্যা রাবেয়া বানু আর তাঁর মেয়ে তটিনী সারাজীবনের জন্য বাড়ি ছাড়ছেন। গাড়িতে উঠবার সময় তটিনী মা কে বলল,
: কেঁদো না মা, আমরা শহরে গিয়ে আবার নতুন করে বাঁচব।
তারা গাড়িতে উঠলেন। গাড়ি ছেড়ে দিল। রাবেয়া বানু শেষবারের মতো পেছনের জানলা দিয়ে তাকালেন তার শৈশবের বাগানের আর জমিদার বাড়িটির দিকে।
কিন্তু এতসবের মধ্যে এই বাড়ির ভেতরেই তারা ফেলে গেল এ বাড়ির আশি বছরের বুড়ো চাকর কার্তিক দাদুকে। কার্তিক দাদু রাবেয়া বানুর বাবার জন্মের আগে কলকাতা থেকে তাদের এই জমিদারবাড়িতে কাজ করতে এসেছিলো। আজ তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। অন্ধকার ঘরের মেঝেতে শুয়ে কাঁপতে কাঁপতে বিড়বিড় করে সে বলতে লাগল,
: বড় মা চলে গেল? সবাই চলে গেল? আমাকে ফেলে গেল? জীবনটা যে কীভাবে পার হয়ে গেল, টেরই পেলাম না…
এরপরই এই নীরবতাকে ফালি ফালি করে কেটে বাইরে থেকে একটা শব্দ ভেসে আসতে লাগল শব্দ,
ঠক... ঠক... ঠক…
মোস্তফার লেবাররা এসে গেছে। নতুন শপিং মলের ভিত গাড়তে। তাই কুড়ালের আঘাতে একশ বছর পুরোনো হিমসাগর, আম্রপালি আর ল্যাংড়া গাছগুলো মাটিতে লুটিয়ে পড়তে শুরু করেছে। একটি প্রাচীন যুগের বুক চিরে জন্ম নিচ্ছে এক নিষ্ঠুর আধুনিকতার।
(আন্তন চেখভের দ্য চেরি অর্চার্ড নাটকের ছায়া অবলম্বনে)



পাঠকের মন্তব্য