সকাল সোয়া এগারোটা। রাজধানীর এক অভিজাত ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে থমথমে পরিস্থিতি। বেইজ কালারের সোফায় বসে আছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল ইনফ্লুয়েন্সার। চোখে-মুখে লাইভ ভিডিওর সেই চেনা আত্মবিশ্বাস নেই, বরং সেখানে স্পষ্ট এক ধরনের অস্তিত্বের সংকট। গতকাল রাতেই যিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় শরীয়াহ আইনের পক্ষে স্ট্যাটাস দিয়ে ‘ভাইরাল’ হয়েছিলেন, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় সেই আইন কার্যকর হওয়ার খবর শোনার পর থেকেই তাঁর আইফোনটি বারবার হাত থেকে পড়ে যাচ্ছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত বিমর্ষ অবস্থায় তিনি আমাদের বিশেষ প্রতিনিধিকে এই একান্ত সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন।
প্রতিবেদক: ভাই, শুভ সকাল। গতকাল তো আপনার ফেসবুক কমেন্ট বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। আজকে ঘুম থেকে উঠে দেশের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন দেখে কেমন লাগছে?
ইনফ্লুয়েন্সার: (মাথায় হাত দিয়ে, ভাঙা গলায়) ভাই, শুভ সকালের কী দেখলেন? আমি তো এখনো ভাবছি এটা কোনোপ্র্যাঙ্ক ভিডিও কি না! আমার লাইফের সবচেয়ে বড় ব্লান্ডারটা মনে হয় সেদিন রাতেই করে ফেলছি। ঘুম থেকে উঠে দেখি ইনবক্স আর কমেন্ট সেকশনে খালি স্ক্রিনশট আর শরীয়াহর হদ-সংক্রান্ত ধারার লিংক। ভাই, আমি তো জাস্ট নরমাল একটা কমেন্ট করছিলাম, রিচ বাড়ানোর জন্য। পাবলিক সেন্টিমেন্ট ক্যাশ করতে চাইছিলাম। ওরা যে সত্যি সত্যি সকালের মধ্যেই আইন পাস করে দেবে, এটা কে জানত! এখন আমার মাথায় ঘুরতেছে একটাই গান, ‘কী করি, আমি কী কী কী করি...’!
প্রতিবেদক: কিন্তু আপনি তো নিজেই লিখেছেন যে আপনি ১০০% শরীয়াহ আইন চান। তাহলে এখন এত চিন্তিত কেন?
ইনফ্লুয়েন্সার: (সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে) ভাই, আপনি বোঝেন না কেন? আইন তো আমি অবশ্যই চাই, কিন্তু সেটা তো অন্যদের জন্য, আমার জন্য না! আপনারা তো আমার পুরোনো ইন্টারভিউ আর পডকাস্টের ক্লিপগুলো ডিলিট করেন নাই। ওইখানে আমি ফ্লোয়ের চক্করে পড়ে বলে দিছিলাম যে লাইফে দেড়শোর বেশি রিলেশনশিপ ছিল! এখন পাবলিক ওইটা হিসাব করে বের করছে যে আমার অপরাধের ক্যাটাগরি কোনটা। ভাই রে ভাই, হুজুররা নাকি অলরেডি ক্যালকুলেটর নিয়ে বসছে! ১৫০ গুণন কত লাখ পাথর লাগবে, সেই হিসাব চলতেছে ফেসবুকে।
প্রতিবেদক: ফেসবুকে তো একটা খবর রটেছে যে আপনার শাস্তি কার্যকরের জন্য সিলেট ও পঞ্চগড় থেকে ট্রাকে করে পাথর আনা হচ্ছে। এটা কি সত্যি?
ইনফ্লুয়েন্সার: (জানালার পর্দা সরিয়ে ভয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে) ভাই, একটু আগেই ব্যালকনি দিয়ে দেখলাম খিলক্ষেতের ওইদিকে চার-পাঁচটা ডাম্প ট্রাক দাঁড়িয়ে। ট্রাকে বালি নাই ভাই, সব নুড়ি পাথর আর বড় বড় বোল্ডার! আমার এক ফলোয়ার মেসেজ দিয়ে বলল, ভাই, আপনার জন্য স্পেশাল কোয়ারি থেকে সিলেক্টিভ পাথর আসতেছে। কসম ভাই, আমার নিজের ঘরের আইফোনের ওয়ালপেপার, স্কিনকেয়ারের দামি সিরাম, সবকিছুর কালার এখন আমার কাছে পাথরের মতো লাগতেছে। আমি তো তখন অবিবাহিত ছিলাম, বেত্রাঘাতের অপশনও তো আছে। কিন্তু মানুষ যেভাবে ট্রাকে ট্রাকে পাথর লোড করতেছে, আমার তো মনে হচ্ছে ওরা হিসাব ভুল করে ডাইরেক্ট এক্সট্রিম লেভেলের প্রিপারেশন নিচ্ছে!
প্রতিবেদক: আপনি তো পরে বিয়ে করেছেন এবং অতীতের জন্য তওবা করার কথাও বলেছেন। শরীয়াহ আইনে তো তওবার একটা বড় গুরুত্ব আছে...
ইনফ্লুয়েন্সার: (চোখ মুছে) হ্যাঁ ভাই, ওইটাই এখন আমার শেষ ভরসা। আমি সকাল থেকে গুগলে সার্চ করতেছি, তওবা কবুল হওয়ার ইনস্ট্যান্ট ডিজিটাল সার্টিফিকেট পাওয়া যায় কীভাবে। কিন্তু মুশকিল হলো, পাবলিক তো তওবা বোঝে না, ওরা বোঝে জাস্টিস আর কনটেন্ট। অলরেডি কয়েকজন ক্রিয়েটর ইভেন্ট খুলে ফেলছে, লাইভ স্টোন পেল্টিং ফ্রম দ্য ভেন্যু। ভাই, আমার এত বছরের ক্যারিয়ার, এত লাখ সাবস্ক্রাইবার, শেষমেশ কি আমি নিজেই একটা রিয়েল লাইফ হিট কনটেন্টহ য়ে যাব?
প্রতিবেদক: আপনার ফলোয়ার ও সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে এখন আপনার শেষ বার্তা কী?
ইনফ্লুয়েন্সার: (ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে) ভাই, আমি হাত জোড় করে বলছি, আপনারা ওই স্ট্যাটাসটা আর শেয়ার দিয়েন না। ওটা একটা এআই জেনারেটেড পোস্ট ছিল ধরেন! আর যারা ট্রাকে করে পাথর নিয়ে আসতেছেন, ভাই দোহাই লাগে, দেশের কনস্ট্রাকশনের কাজে অনেক পাথর লাগে, পদ্মা সেতুর মেইনটেন্যান্স আছে, মেগা প্রজেক্ট আছে, ওইসব জায়গায় পাথর দেন। আমার পিঠ অত বড় মেগা প্রজেক্ট না ভাই! আর শেষ কথা... কেউ যদি পারেন, আমারে একটু বর্ডার পার করায়া দেন। আমি আর ইনফ্লুয়েন্সিং করব না, আমি নরমাল চাকরি করব। তাও এই পাথরের দেশে আমি আর নাই!



পাঠকের মন্তব্য