ও বাজান! দেহেছিস, কি চোটে বাজ পড়িতেছে?
মাথার মাথালটাকে হাত দিয়ে আটকে যাতে পড়ে না যায় সেই ব্যবস্থা করে বাপের দিকে তাকায় মতিন। বাপের মাথায় তখন এই চিন্তা যে কিভাবে এই বজ্রপাতের মধ্য দিয়ে এই বিশাল মাঠটা পার হয়ে ছেলেকে নিয়ে নিরাপদে বাড়িতে গিয়ে পড়তে পারবে। তাই সে ছেলেকে ধমক দিল,
পা চালায়ে চল বাপ। ওদিক দেহার টাইম নেইরে। জলদি চল।
সে এত দ্রুত হাটছে যে ছেলে তার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। তাকে দৌড়ুতে হচ্ছে। মতিন বাপের কথায় হাঁটায় আরও মনোযোগ দিল। বিশাল মাঠ। পার হতে প্রায় বিশ মিনিট লাগে। আর যে হারে বাজ পড়ছে তাতে আজকে ভালোয় ভালোয় বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা আল্লাহ মালুম!
এসব চিন্তার মধ্যেই তিনহাত দুরের তালগাছটা বাজ পড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। বাপ-ছেলের কানে তালা লেগে গেল। কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। চোখেরও অবস্থা তথৈবচ।
বাপ জোরে পড়ে উঠল,
লা হাওলা ওয়ালা....
...ইল্লা বিল্লাহ!
মতিন কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না, তবু বাপের মুখ নড়তে দেখে বুঝল বাপ দোয়া পড়ছে। সেও সঙ্গে সঙ্গে মুখ নাড়াতে লাগল। কী পড়ছে জানে না, তাই সব মিলায়ে বলল,
লা হাওলা... ভাত ডাল... ইল্লা বিল্লাহ...
বাপ ধমক দিল, ওকি পড়তিছিস রে ছাগল?
মতিন চমকে উঠল, কই? আমি তো তুমি যা পড়তিছ তাই পড়লাম!”
এরই মধ্যে আরেকটা বাজ এমন শব্দে পড়ল যে মাঠের একধারে দুটো গরু বাধা ছিল তারা দড়ি ছিড়ে একসাথে 'হাম্বা!` করে ভোঁ দৌড় দিল। একটা গরু মতিনকে ধাক্কা দিয়ে পাশের কাদায় ফেলে দিল। মাথাল উড়ে গিয়ে দূরে পড়ল।
মতিন চিল্লায়, বাপ! মাথাল গেইছে!
বাপ কইল, মাথাল যাক, আগে মাথা বাঁচা!
বৃষ্টি এমনভাবে পড়ছে যেন আকাশের কেউ বালতি দিয়ে জল ঢালছে। বাপ এক হাতে লুঙ্গি, আরেক হাতে মতিনকে টানছে। মতিন আবার পিছলে পড়ল।
বাপ বিরক্ত হয়ে বলল, তোরে নিয়ে মাঠ পার হওয়া মানে হচ্ছে গিয়ে একখান ভেজা বস্তা টানা!
মতিন মুখ বাঁকায়, আমি কি নিজের ইচ্ছায় পিছলাই?
হঠাৎ সামনে গ্রামের হাশেম চাচা দেখা দিল। তালগাছের গোড়া ধরে বসে আছেন।
বাপ চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, চাচা, এইহানে ক্যান?
হাশেম চাচা শান্ত গলায় বলল, বাড়ি যাইতেছিলাম... কিন্তু বাজ পড়ে গাছটা আগুন ধরাইছে। তাই ভাবলাম, আগুন নিভলি পরে যাই।
বাপ মাথায় হাত দিল, বাজের ভয়ে আগুনের নিচে বসিছ!
হাশেম চাচা নিজের আধা-টাক মাথাটায় হাত বুলালেন। বললেন,
ভয় পাইয়া বেদিশ হইছি। এহন তো মনে হচ্ছে বাড়ির রাস্তাও ভুলছি। কিরাম অইরে যাই ক' তো বাপ!
মতিনের বাপ লুঙ্গিধরা হাতেই হাশেম চাচারে ধরল। কইল,
এহন আমাগে সাথেই আসোদিনি। পরে বৃষ্টি থামলি বাড়ি যাইয়ে কেনে!
হাশেম চাচাও যেন হাতে হ্যারিকেন পেলেন। নিজেই মতিনের বাবার হাতের সাথে ঝুলে ঝুলে এগোতে লাগলেন।
আবারও বাজ পড়লো। মতিন, মতিনের বাপ আর হাশেম চাচা তিনজনই কেঁপে উঠল। এর মধ্যে হাশেম চাচার পকেটে তার ছেলের দেয়া বাটন ফোনটা ভ্রুম ভ্রুম শব্দ করে বেজে উঠল। হাশেম চাচা নিজেই 'ও মাওলা' বলে মতিনের বাপের গায়ের সাথে সেঁধিয়ে গেলেন। মতিনের বাপও তার কাঁপাকাঁপি দেখে ভড়কে গিয়ে আল্লা-খোদার নাম করা শুরু করল। সারা মাঠ খালি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে বিজলির চমকে। আর বৃষ্টিতে মাঠ এতোটাই কর্দমাক্ত যে চাইলেও তারা মিনিটে পাঁচ-ছয় কদমের বেশি চলতে পারছে না। ভেজা কাক হয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগোচ্ছে। হঠাৎ একটি বড় বজ্রপাতে মতিন শব্দ করে কেঁদে ফেলল।
বাপ বলল, বাজান, কান্দে না। আল্লা মালিক। দোয়া পড় বাজান।
বলতে বলতেই একটি বাজ পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে!
তারা তিনজন দলা পাকিয়ে হাটছিলো। ফলে, এক বাজেই তিনজনের কম্ম-কাবার হল। এক তীর, তিন নিশান! শরীরগুলো ধপাধপ শব্দে পড়ে গেল কাঁদার মধ্যে। মতিনের বাপ শুধালো,
কিসের শব্দ হল রে বাজান?
মতিন ঠিকই বুঝলো। সে যে জেন যি সদস্য! আপডেট ভার্সন। সে নির্বিকার গলায় বলল,
বাজান, বাজ একখান আমাগে উপরও পড়িছে। আমরা গেইছি।
তার কথা শুনে হাশেম চাচা থমকে গেলেন। বললেন,
ও মতির বাপ। তোমার ছাওয়াল কয় কি?
মতিনের বাপও রাগ হল। বলল,
গাধা ছাওয়াল চাচা। কি কতি কি কচ্ছে!
অমনি মতিন রাগ হয়ে গেল। বলল,
নিচে ইট্টু তাকায় দ্যাখ না বাজান। তালি পরাই বুঝতি পারবিনি।
তার কথা শুনে বাকি দুজন সত্যিই তাকিয়ে দেখল, তাদের শরীরগুলো ভেজা কর্দমাক্ত মাঠে পড়ে রয়েছে, কালো কয়লা হয়ে যাওয়া চেহারা নিয়ে। হাশেম চাচা ডুকরে কেঁদে উঠলেন আর মতিনের বাপ হতভম্ব চেহারায় দাঁড়িয়ে রইল। একমাত্র মতিনই স্বাভাবিক। সে বলল,
ও দাদা, ডরাও ক্যা? এহনই তো আরও ভাল্লাগতিসে! ওজন নাই হয়ে গেইছে। কি হালকা লাগতিছে!
মতিনের বাপ ছেলের কথায় অবাক হয়ে খেয়াল করল আসলেই তাই। সে বেশ একটু খুশি হয়ে গেল। কিন্তু হাশেম চাচা প্রবীণ মানুষ। তার বোধহয় নিজের বহুকালের পুরনো শরীরটা এভাবে ছেড়ে দিতে কষ্ট হচ্ছিল।
মতিন হালকা হয়ে গিয়েছে বলে এক লাফে তিন হাত ওপরে উঠে দেখালো,
বাজান! দেখিছ? বাঁইচে থাকতি এত উঁচুতে উঠতে পারি নাই!
ওদিকে হাশেম চাচার আত্মাটাকে বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার পায়তারা কষছিল। তিনি কেঁদে ফেলে বললেন,
আমি তো জীবনে জমি কিনতি পারলাম না... মরার পরে বাতাসও আমারে জায়গা দেচ্ছে না!
যাইহোক, ওই রাতের বজ্রপাতে মতিন, মতিনের বাপ আর হাশেম চাচার যা হবার তা হয়েই গিয়েছিল। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, মরার পরেও তিনজনের স্বভাব একটুও বদলায় নি। শুধু শরীর নেই, কিন্তু দায়িত্ব বাড়ছে।
কিছুদিন তারা ভবঘুরের মত ঘুরে ফিরে ঠিক করল যে তারা সমাজ উন্নয়নে কিছু করবে। মানবজীবনে তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোত, কাউকে কখনো সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়নি। কিন্তু এখনকার ভুতজীবনে তাদের তো কোন কাজ-কাম নেই। তাই তারা মানবসেবায় লাগবে। কিন্তু কী করা যায়? এই বুদ্ধিও বেরুলো আমাদের জেন যি সদস্যের মাথা থেকেই। সে বলল, তাদের বানানো উচিত 'গ্রাম বজ্রপাত সচেতনতা দপ্তর (ভূত বিভাগ)'।
যেই কথা, সেই কাজ! যখনই আকাশে মেঘ করে, বিদ্যুৎ চমকায়, অমনি তিন ভূত ডিউটিতে বের হয়। বেতন নেই কারোই, কিন্তু দায়িত্ব ফুলটাইম!
একদিন বিকেলে গ্রামের করিম গরু নিয়ে মাঠে গেছে। আকাশ কালো। দূরে বাজ গর্জে উঠছে। করিম তালগাছের নিচে দাঁড়িয়ে বিড়ি ধরাবার তাল করছে। হঠাৎ তার কানের কাছে ঠান্ডা গলায় আওয়াজ,
ও বাজান... শেষ বিড়ি খাইচ্ছিস নাকি রে?
করিম পেছনে তাকিয়ে দেখে কেউ নাই। এদিক-সেদিকে তাকিয়েও দেখল, কোথাও কেউ নেই। আবার আওয়াজ,
গাছের নিচে দাঁড়ালি ক্যান রে বাবা? মরার শর্টকাট খুঁজতিছিস নিকি?
করিম এবার দেখে তালগাছের ডালে তিনজন উল্টো হয়ে ঝুলছে। একজনের মাথায় ভাঙা মাথাল, একজনের হাতে ধরা লুঙ্গি বাতাসে পতপত করে উড়ছে, আরেকজন আধা-টাক মাথা চুলকাচ্ছে।
করিম 'ওআল্লা!' বলে বিকট চিৎকার করেই দে দৌড়! কিন্তু মতিন ছাড়ল না। ভাসতে ভাসতে সামনে গিয়ে দাঁড়াল,
অ কাকা, দৌড়য়ে না। জাইনে যাও। বজ্রপাতের সময় গাছের নিচি দাঁড়াতি নেই!
মতিনের বাপ কড়া গলায় ধমকাল,
পাকা ঘরে যা! গাছের নিচে দাঁড়ালি পরে তোরে আমাগে অফিসে ভর্তি কইরে নিবানি! আইছে মাঠে 'লায়ক' সাজতি!
মতিন বলল, নিয়া লাগবিনানে রে বাপ! আপনি আইসে ভর্তি হবেনে।
হাশেম চাচা আফসোসের গলায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন,
আমিও একদিন ভাবিছিলাম গাছ ছাতা দেবে... তা না, আগুন দেলো।
আরেকদিন। রহিম ছাদের উপর দাঁড়ইয়ে মোবাইলে পীরিতের আলাপ সারছে।
না না, তুমিই আগে রাখো... না তুমি আগে রাখো...
হঠাৎ ফোনের ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা,
ওপারেত্তে কচ্ছি, দুইজনেই রাখ, রাইখে আগে নিচে নাম!
রহিম চমকে হাত থেকে ফোন ফেলে দিল। স্ক্রিনে তিনটা মুখ। মতিন দাঁত বের করে হাসে।
বজ্রপাতের সময় খোলা ছাদে দাঁড়ায়ে ফোনে নাটক ইট্টু কম করবা পিও।
মতিনের বাপ বলল,
রোমান্স করতে যায়ে রোস্ট হয়ে যায়ে না বাবু!
হাশেম চাচা বলল,
নিচে নাইমে নে, পরে 'মিস ইউ' কইস।
রহিম থ!
আরেকদিন স্কুলের কাচ্চা-বাচ্চারদল বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল খেলছে। বল মারতেই দেখা গেল বলটা মাঝআকাশে থেমে গেছে। সবাই অবাক। এ আবার কি? দেখা গেল বলটার উপর মতিন তার ক্যাসপার বডিটা নিয়ে পা তুলে বসে আছে। রিনরিনে কন্ঠে বলল,
খেলা বন্ধ। বজ্রপাতের সময়,মাঠ ফাঁকা করো।
কাচ্চা বাচ্চা চেঁচাল,
বল নামাও!
মতিন বলল,
আগে সকলি ঘরে যাও, পরে বল নামায়ে ঘরে দিয়ে আসপানি।
হাশেম চাচা বত্রিশপাটি বের করে রেফারি সেজে বাঁশি দিলেন, স্বপ্ন ছিলো তার ফুটবল রেফারি হবার! কিন্তু বাঁশির শিসের বদলে বের হল,
হাম্বা!
হাশেম চাচা নিজেই আতঙ্কে বাঁশি ফেলে উড়ে গেলেন। আর কাচ্চাবাচ্চার দল গরুভুতের হাত থেকে পালাতে ঘরে গিয়ে খিল দিল।
আরও একদিন রফিক পাঠশালা থেকে ফিরছিলো। আকাশ কালো হয়ে এসেছে অনেকক্ষণ। রফিক পা চালিয়ে চলছিলো। মা দুশ্চিন্তা করবেন। হঠাৎ বড় বড় শব্দে বাজ পড়তে আরম্ভ করল। রফিক কিছু করার ন পেরে মাটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। অমনি ভুতসেবকদল হাজির!
হাশেম চাচাই আগ বাড়িয়ে বললেন,
ওরে, শুইস নে! পা দুইডে একসাথে রাইখে নিছু হয়ে বয় যাতে মাটির ছোঁয়া কম লাগে। বুঝলি ছোড়া?
রফিক ভয় পেয়ে গেল দারুন। কিন্তু কথামতই কাজ করল। সে শুনেছে তাদের গ্রামে কেউ বিপদে পড়লে 'তেনারা' এসে সাহায্য করেন! দেখেশুনে হাশেম চাচা মতিনের বাপকে বললেন,
ছোড়াটা ভালো, তাই নাকি'! নলি আজকের যুগের কোন পোলাপান এট্টা কথা শোনে ক'দি।
মতিনের বাপও কথাটায় একমত হল।
ধীরেধীরে এখন তাদের গ্রামের নিয়ম হয়েছে মেঘ ডাকলেই মাঠ খালি হয়ে যায়, গাছতলা ফাঁকা পড়ে রয়, সবাই পাকা ঘরে ঢুকে পড়ে, ছাদেও কেউ যায় না।
কারণ সবাই জানে, এই নিয়মমত না চললে রাতের বেলা জানালার বাইরে তিনটা মুখ ভাসতে ভাসতে হেসে হেসে বলবে,
ও বাজান... সাবধান কইছিলাম তো!



পাঠকের মন্তব্য