বিশ্ব ইচ্ছা দিবস ও একটি অপূর্ণ স্বপ্ন

পঠিত ... ২ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

 

চার বছরের ছোট্ট আশমিন স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে দিন পনেরো হলো। সে বেচারা এখনো বুঝতে পারছে না, স্কুল কী, নিয়ম-কানুন কী, পড়াশোনা কী, বন্ধু কী, টিচার কী! কিন্তু তাকে বেশ খুশিই দেখা যায় স্কুলে যেতে পেরে; জীবনে নতুন কিছুর আগমন ঘটেছে তার।

সকালে সে ঠিক সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে পারে না, তাই প্রতিদিনই ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে যায়। তার মা তার হাত ধরে টেনে টেনে সব কাজ করিয়ে তাকে স্কুলে নিয়ে যায়। তার চোখ ভরা থাকে ঘুমে, তবুও সে বিরক্ত হয় না। মাকে তাকে টেনে নিয়ে যেতে দেয়। স্কুলটা ভালোই লাগে তার, একরকম। শুধু হোমওয়ার্কটা বিরক্ত লাগে, কান্না পায়। কারণ লেখার হাত এখনো আসেনি তার। যা লিখতে যায়, তা হয় না, অন্য কিছু হয়ে যায়। তাই তার রাগ হয়, তার মায়েরও রাগ হয়। মা বকা দেন, তার কান্না পায়।

প্রায় দিনই তার স্কুলে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়। তখন তার মিসরা তাকে যেকোনো একটা জায়গায় বসিয়ে দেন। তার ক্লাসে একটি ছেলে আছে, নাম সাইফান; যার একটা ইউনিকর্ন ব্যাগ আছে! তা থাকলে কী হবে, ছেলেটা বেজায় দুষ্টু। মিসরা প্রায়ই আশমিনকে সাইফানের পাশে বসিয়ে দেন। সাইফান তাকে চিমটি দেয়, তার স্পাইডারম্যান ব্যাগ, পানির বোতল, ডায়নোসর পেন্সিল বক্স নিয়ে টানাটানি করে, নিজের ক্রেয়ন হারিয়ে চিৎকার করে কাঁদে, হাউমাউ করে চেঁচায়, মানে টিচারদের একদম অস্থির করে ফেলে। আশমিন ওর পাশে বসে ভয়ে ভয়ে নিজের জিনিসগুলো বাঁচিয়ে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। সেভাবেই সতর্কভাবে বসে লেখে, পড়ে, টিফিন খায়, তবুও তার স্কুল পছন্দ।

আজ মা বলেছেন, ক্লাস শেষে নানুবাসায় যাবে। আশমিন খুশিতে লাফিয়ে উঠল। নানুবাসায় মামা আছে, খালামনি আছে, নানাভাই-নানুন সবাই। সারাদিনই শুধু মজা আর মজা। খুশিমনে সে স্কুলে ঢুকে গেল।

ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সাইফান আজ একটা প্লেন চালাচ্ছে। মুখে ‘বু বু’ শব্দ করতে করতে হাতে করে উড়িয়ে দিচ্ছে। আশমিন বলল, প্লেন এভাবে ‘বু বু’ শব্দ করে না।

সাইফান বলল, এভাবেই শব্দ করে। তুমি জানো না।

আশমিন রেগে গিয়ে বলল, আমি জানি। আমার মামা সত্যি প্লেন উড়ায়। ওই যে ছোট ছোটগুলো আকাশে দেখা যায়, ওগুলো আসলে অনেক বড়, অনেক অনেক বড়। হাল্কের মতো বড়। আমার মামা ওগুলো উড়ায়।

সাইফান চোখ বড় বড় করে হা করে তাকাল। কিন্তু তবুও সে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশে রাজি নয়। সে বলল, তাহলে তুমি বলো, কেমন শব্দ করে?

আশমিন ইঞ্জিনের শব্দ মুখে করে দেখিয়ে দিল। সাইফান মুখ ভেংচে বলল, তুমি কিছুই জানো না, বলে চলে গেল। আশমিন মুখ কালো করে বসে রইল।

কিন্তু ব্রেক টাইমে আশমিনের মন খুশি হয়ে গেল। টিফিন খুলে দেখল, মা নাশতায় কাবাব দিয়েছেন। সে খুশিতে পা দোলাতে দোলাতে কাবাব খেতে লাগল। ওদিকে ক্লাসের সবাই হাউকাউ করছে। আশমিন হাসিমুখে সহপাঠীদের দেখছে। শুধু প্রিয়ন্তি বেঞ্চে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে। ওর কাল জ্বর এসেছিল, তবুও আজ স্কুলে এসেছে।

স্কুল শেষে মা আর আশমিন নানুবাসায় গেল। মামা দরজা খুলে দিলে আশমিন ঝাপ দিয়ে মামার কোলে উঠে গেল। মামা তার সারাগায়ে সুড়সুড়ি দিতেই সে হাহা করে হাসতে লাগল। নানুবাসায় সে একমাত্র শিশু, তাই তার আদর-আহ্লাদের বিশাল পরিসর।

নানুবাসায় এলে সে তার মামার জীবন ত্যানাত্যানা বানিয়ে ফেলে। সবারটাই বানায়, তবে মামারটাই বেশি। তার মামা পাইলট হওয়ায় খুব ব্যস্ত থাকে, তাকে বাসায় পাওয়াই যায় না। কিন্তু যখন আসে, তখন আশমিনের জন্য নানারকম জিনিস নিয়ে আসে। এবার এনেছে বিশাল সাইজের একটা পাজল প্লেন। টুকরো টুকরো করা, মিলিয়ে লাগাতে হবে। মামা সেটা বের করে দিলেন। দুজনে মিলে বসে লাগাতে লাগল।

হঠাৎ আশমিনের মনে পড়তেই সে বলল, মামা, তুমি কাল আমাকে তোমার প্লেন দেখাবে?

মামা অবাক হয়ে বললেন, কেন, মি. মিন? তুমি আমার প্লেন দেখে কী করবে?

আশমিন বলল, আমি তোমার প্লেনের সবকিছু দেখব, কিভাবে চলে, কিভাবে ওড়ে, সবকিছু শিখব। তারপর আর একটু লম্বা হলেই আমিও তোমার প্লেন চালাব। তুমি পাশে বসে থাকবে আর আমাকে দেখাবে। আমি ঠিক উড়াতে পারব। আমিও তোমার মতো পাইলট হয়ে যাব।

মামা বললেন, ঠিক আছে, মি. মিন! তুমি তাহলে বড় হয়ে পাইলট হবে?

আশমিন খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, হ্যাঁ, আমি বড় হয়ে তোমার প্লেনের পাইলট হব।

সেদিনই সন্ধ্যাবেলা ছোট্ট আশমিনের জ্বর এলো। আগে থেকেই একটু ঠান্ডা, সর্দি লেগে ছিল। সন্ধ্যার পর থেকে তার গায়ে হালকা লালচে ফুসকুড়ি দেখা গেল। নানুবাসার সবাই চিন্তিত হয়ে তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখে বললেন, শিশুটির হাম হয়েছে।

আশমিন প্রায় খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তিন দিন হয়ে গেছে। সারাদিনই সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে। টিকা পাওয়া গেল না। আশমিনের মামা লাল চোখে ফিরে এলেন। ওর মাথার কাছে বসলে শিশুটি চোখ মেলে তাকাল। খুব দুর্বল স্বরে বলল, মামা, প্লেন কবে দেখাবে? আমি পাইলট কবে হব?

মামা তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। নানুন চোখে আঁচল চাপা দিলেন। রাত গভীর হলো। কিন্তু আশমিনের নানুবাসায় পরদিন ভোর আর হলো না। ছোট্ট আশমিন তার পাইলট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমাল দূর অজানায়।

দিনটি ছিল ২৯ এপ্রিল। এদিন বিশ্বে নানা দেশে পালিত হয় বিশ্ব ইচ্ছা দিবস, ওয়ার্ল্ড উইশ ডে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মেক আ উইশ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এটি চালু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে একটি শিশু স্বপ্ন দেখেছিল, সে বড় হয়ে পুলিশ কর্মকর্তা হবে। কিন্তু ভাগ্য তাকে সে সুযোগ দেয়নি। লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত সাত বছরের ক্রিস গ্রেসিয়াসের হাতে আর বেশি সময় ছিল না। বিষয়টি জানার পর স্থানীয় পুলিশ বিভাগ তার স্বপ্নপূরণের নায়ক হয়ে ওঠে। তারা ক্রিসকে এক দিনের জন্য পুলিশ বানিয়ে তার স্বপ্ন পূরণ করে। দিনটি ছিল ১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল। পরে ২০১০ সাল থেকে দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উইশ ডে হিসেবে পালিত হতে থাকে।

অনেক বছর আগে এই দিনে একটি শিশুর স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল। আর আজ আমাদের দেশে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে কত শত স্বপ্ন, ঝরে পড়ছে কত শত শিশুর প্রাণ।

আজকের এই ইচ্ছা-পূরণের দিনে আমাদের কামনা, আর কোনো শিশু যেন আমাদের গাফিলতি, অবজ্ঞা আর স্বার্থপরতার কারণে অকালে ঝরে না যায়। তাদের ইচ্ছেগুলোও একদিন হাসি-আনন্দে পূরণ হোক।

পঠিত ... ২ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top