ককরোচ জনতা পার্টি; স্যাটায়রিক্যাল দ্রোহ

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে

ভারতে ককরোচ জনতা পার্টি নামের একটি স্যাটায়রিক্যাল আন্দোলন হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো হাজির হয়েছে। বাংলাদেশে তরুণদের জুলাই বিপ্লব ও নেপালের জেনজি বিপ্লবের পর ভারতে এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্টও তরুণ প্রজন্মের দ্রোহের আগুন দেখে ভীত হয়ে পড়েছিল।

ভারত ও পাকিস্তানে ব্রিটিশ আমল থেকে ক্ষমতা-কাঠামোর দাসত্বের মাধ্যমে ভাগ্যবদলের সংস্কৃতি সমাজমনস্তত্ত্বে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে বাংলাদেশ বা নেপালের মতো দ্রোহের মনস্তত্ত্ব সেখানে বিকশিত হওয়া অত্যন্ত কঠিন। বৈষম্যে ধূসর দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সরকারি চাকরি অথবা সরকারি দলের ক্যাডার হিসেবে ভাগ্যবদলের হাতছানি সমাজে আপসের শেকড় গভীরে নিয়ে গেছে।

বাংলাদেশের কৃষক সমাজ কিংবা নেপালের পাহাড়ি মানুষের সমাজ দাসত্বের মাধ্যমে ভাগ্যবদলের চেয়ে মুক্তজীবন যাপনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশে জমিদারি ব্যবস্থার পতনের মাধ্যমে ভূমি সংস্কার হয়। ফলে কৃষকের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষক ও মেহনতি মানুষের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষাই মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা নিয়ে আসে।

কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানে জমিদারি ব্যবস্থাটা আজও টিকে আছে। ফলে জনমনস্তত্ত্বে দাসত্বের শৃঙ্খল এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। আর এ কারণেই স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও বৈষম্যে ধূসর রাষ্ট্রদুটোতে জমিদারি রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ নিজেকে একজন দলিত বলে দাবি করেছেন। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও ধর্মীয় কাস্ট সিস্টেমের বলি দলিত সম্প্রদায়। মানুষের এমন অমর্যাদা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটে বলে জানা নেই।

অভিজিৎ নিজেকে দলিত বলে পরিচয় দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন বিজেপির সাইবার সমর্থকেরা তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছে। ভারতীয় সমাজের বেহাল অবস্থাটি বিজেপি সমর্থকদের আচরণে আরও স্পষ্ট হয়েছে।

যে কোনো নতুন রাজনৈতিক চিন্তাকে গণতান্ত্রিক সমাজ উৎসাহিত করে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতি যেহেতু ব্যবসা ও ভাগ্যবদলের হাতিয়ার, তাই নতুন রাজনৈতিক চিন্তাকে দুধভাতে উৎপাত বলে মনে করা হয়।

অভিজিৎ একজন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। মাত্র ৩০ বছর বয়স তার। এর আগে আম আদমি পার্টির জন্য যোগাযোগ পরামর্শের কাজ করেছেন। করোনাকালে সচেতনতা তৈরিতেও অনলাইনে কাজ করেছেন। পুনেতে পড়ালেখা শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে উচ্চতর শিক্ষা নিচ্ছেন।

ভারতের এক বিচারপতি কর্মসংস্থানহীন তরুণদের ‘ককরোচ’ বলে তিরস্কার করলে ককরোচ জনতা পার্টি নামের এই স্যাটায়রিক্যাল দ্রোহের ধারণা অভিজিতের মাথায় আসে।

ফ্রানৎস কাফকার মেটামরফসিস আখ্যানের গ্রেগর সামসা যেভাবে পিতার আক্রোশে মানসিকভাবে ‘তেলাপোকা’ হয়ে গিয়েছিল, ককরোচ জনতা পার্টির মানসিক পরিস্থিতি ঠিক তেমনি। স্বাধীনতার নামে দেশলুণ্ঠনের লাইসেন্স নিয়ে যে রাজনৈতিক দলগুলো ভারত শাসন করেছে, সেই চিরস্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্তটি রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী আর দলীয় বিদূষকদের ভাগ্যবদলের জাদুর কাঠি হয়ে উঠেছে।

বলিউডের ইলিউশনে ভারত উদয়ের গল্প দেখিয়ে আলোর নিচে অন্ধকারে তারুণ্যের সম্ভাবনা ক্ষয়ে যাওয়ার পুনরাবৃত্ত ট্র্যাজেডি চলেছে। অলিগার্কের ছেলের বিয়েতে যখন বলিউড তারকারা নাচে, ফুটপাতে-বস্তিতে তখন উন্নয়ন প্রকল্পে উচ্ছেদ হওয়া ছোটখাটো মানুষের তেলাপোকা জীবন। ক্রিকেট জাতীয়তাবাদের নেশা যখন মাদকের মতো আচ্ছন্ন করে রাখে ভারতবাসীকে, তখন ঋণগ্রস্ত কৃষক আত্মহত্যা করে, কর্মহীন যুবক পলায়নে যায়। কর্মসংস্থানের দাবির মিছিলে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে হিংস্র নেকড়ের মতো।

প্রথমদিকে সেকুলারিজমের মুখোশ এঁটে লিবারেল বিশ্বে একটি ফাঁপা সভ্যতার দাবিদার হলেও ঠিকই কট্টর হিন্দুত্ববাদের আফিমনেশা উচ্ছজীবনে খেলনা শ্রেষ্ঠত্বের খোয়ারি নিয়ে হাজির হয়। দরিদ্র মানুষের পাতে এক খণ্ড রুটি নেই, পরনে এক খণ্ড কাপড় নেই, অথচ অখণ্ড ভারতের দিবাস্বপ্ন আছে।

প্রায় এক যুগ হলো হিন্দু ভারত আর কাল্পনিক প্রাচীন সভ্যতার ভ্রান্ত গর্বের আফিম খাইয়ে অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়লেও, বৈষম্যরেখা আরও প্রগাঢ় হলেও, ধনী বনাম দরিদ্রের আসল বিভাজন লুকিয়ে রাখতে গরিব হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনরেখা রক্ত দিয়ে আঁকা হচ্ছে। মারণ খেলার জাদুকর নরেন্দ্র মোদি ইতালির কট্টরপন্থী নেত্রী মেলোনিকে মেলোডি চকলেট উপহার দিলে গদি মিডিয়ার চাটুকারেরা যেন সেই মেলোডি চকলেটই চুষতে থাকে।

ইন্টারনেট যুগে জন্ম নেওয়া জেনজি ও জেন আলফাকে এসব বহু ব্যবহারে জীর্ণ রাজনৈতিক গিমিক দিয়ে ভাঁওতা দিয়ে এমন দুঃশাসন চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। সে কারণেই অনলাইন উপস্থিতিতে মোদির বিজেপিকে ছাড়িয়ে গেছে অভিজিতের ককরোচ জনতা পার্টি। তারুণ্যের এই দ্রোহের ঢল থামানো শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবও বটে।

পাকিস্তানে ককরোচ আওয়ামী পার্টির নড়াচড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে স্যাটায়রিক্যাল মুভমেন্ট হিসেবে। কারাবন্দী নেতা ইমরান খানের পিটিআইয়ের অনলাইন যোগাযোগে প্রশিক্ষিত তারুণ্য গত এক দশকে রাজনৈতিক স্যাটায়ার ও মিম-যুদ্ধের মাধ্যমে অনলাইন আন্দোলনের ক্ষেত্র প্রস্তুত রেখেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গ্রাউন্ড জিরো থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জার্মানি মাত্র বিশ বছরের মধ্যেই কল্যাণরাষ্ট্রের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। ঘরের কাছের মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরও অল্প সময়ের মধ্যেই দৃঢ় অর্থনীতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আর স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরও ভারত ও পাকিস্তান রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীদের দুষ্টচক্রের দেশলুণ্ঠন আর দুঃশাসনে অকল্যাণরাষ্ট্রের অশুভ বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তি ব্যবহার করে ককরোচ জনতা পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া আইডিগুলো বন্ধ করে দিলেও ককরোচ দ্রোহ ঠেকানো কঠিন। কারণ যে দ্রোহ তারুণ্যের মস্তিষ্কে, তাকে রাষ্ট্রীয় কলাকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

বরং ক্ষমতা-কাঠামোগুলোকেই তাদের পুরোনো বন্দোবস্তের জড়, জরাগ্রস্ত সামন্তচিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পুরোনো বন্দোবস্তের গোধূলিলগ্নে চিতা ও কবর থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে তারুণ্যের নতুন বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে লড়তে যাওয়া এক অসাড় কল্পনা।

পঠিত ... ১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top