শিরোনামের প্রশ্ন দেখে ব্রাজিলের পাঁড় সমর্থকেরা তেলে–বেগুনে জ্বলে উঠতে পারেন। তবে জ্বলার আগে একটু ভাবুন, প্লিজ। প্রেমে বা স্নেহে, বা কোনোকিছুতেই অন্ধ হওয়াটা কাজের কথা না। বরং আর্জেন্টিনার কাছে ব্রাজিলের কোচিং করা কতটা জরুরি, সেটি একটু বুঝে নিন। কারণ, হেক্সা মিশন পূরণ করতে হলে, জানতেও হবে।
যদি ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের হেক্সা হয়ে যাওয়া এবারেরটিসহ গত ৫টি বিশ্বকাপ আসরের দিকে চোখ বোলানো যায়, তাহলে কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে কোচিং করার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যাবে। ব্রাজিলপ্রেমী–এই পরিচয় একপাশে সরিয়ে যদি ফুটবলপ্রেমী হয়ে ওঠেন (যেটি ব্রাজিলপ্রেমীদের মধ্যে সংখ্যায় তুলনামূলক বেশিও অবশ্য), তাহলে দেখবেন ব্রাজিল আসলে দীর্ঘদিন ধরেই ঠিক ব্রাজিলের মতো খেলছে না। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের শুধু বল দখলের হিসাব দেখলেই বোঝা যায় যে, কেন ব্রাজিলের হারাই উচিত ছিল!
এবার একটু মিলিয়ে দেখুন। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর একটা বিশাল সময় আর্জেন্টিনার ফুটবলেও খরা গেছে। বছরের হিসাবে প্রায় ৩৬ বছর। ওই সময়ে ২০১৪ সালেই একবার ফাইনালে যেতে পেরেছিল মেসির দল। আর ২০২২ সালে তো কাপ জিতেছে। এর মধ্যে নানা জনের ওপর আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ভর করতে চেয়েছিল, স্বপ্ন্ দেখেছিল বিশ্বকাপ জয়ের। কিন্তু বাতিস্তা বলুন, বা অন্য কেউ—মেসি ছাড়া কেউই আশার পালে হাওয়া দিতে পারেননি।
আবার লিওনেল মেসিও কিন্তু একবারে কিছু করতে পারেননি। ২০০৬ সাল থেকে শুরু, শিকে ছিঁড়ল এসে ১৬ বছর পর। এর মধ্যে কান্নাকাটি, হুটোপুটি—কত কিছুই তো করতে হলো মেসিকে। তা, এই যে বার বার হেরে গিয়েও উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাটা করা—এটা আর্জেন্টিনা বা মেসি ছাড়া আর কার কাছে শিখতে পারবে ব্রাজিল? মনে রাখা দরকার, ২০০২ সালে পেন্টা মিশন কমপ্লিট হওয়ার ২৪ বছর পার হয়ে গেছে। আর নরওয়ের সাথে হারের পর তো ২৮ বছরের অপেক্ষার দিকে যাত্রা শুরু হয়েও গেছে।
এখন আর্জেন্টিনার মতো ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঠেকাতে উপযুক্ত কোচিং তাই জরুরি প্রয়োজন। আর সেই কোচিং আর্জেন্টিনা ছাড়া আর কে দিতে পারবে, বলুন তো? ওহে ব্রাজিল সমর্থক, একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলুন।
দুই দলই কিন্তু লাতিন আমেরিকার। বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে কাপের জন্য অপেক্ষার বহরও এখন কাছাকাছি। বিসর্জিত অশ্রুর পরিমাণও নিশ্চয়ই কাছাকাছিই হবে। আবার ফুটবল নিয়ে উন্মাদনার মাত্রাও দুই দেশে প্রায় একইরকম। সংস্কৃতিতেও তফাত নেই আকাশ–পাতাল। এখন বলুন, ব্রাজিলকে আর কে ভালো বুঝবে, আর্জেন্টিনা ছাড়া?
নরওয়ের ম্যাচে ফের ফেরা যাক। পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে পারেনি ব্রাজিল। এই পেনাল্টি মিসের আফসোস এখন ব্রাজিলের শিবিরে হাহাকারের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে দমে দমে। কিন্তু, হে ব্রাজিল সমর্থকেরা, একবার কি ভেবে দেখেছেন, বর্তমান দুনিয়ায় বিশ্বকাপে পেনাল্টি আদায় এবং তা থেকে গোল দিয়ে দিয়ে বৈতরণী পার করা দল কোনটি?
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, আর্জেন্টিনা। এই দলটি ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসেই সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি শ্যুটআউটে জয় পেয়েছে, ৬ বার। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হিসেবেও এটি স্বীকৃত। ২০০৬ সালে একবারই কেবল জার্মানির কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। আর কখনোই পেনাল্টিতে গিয়ে হারতে হয়নি মেসিদের।
পেনাল্টি পাওয়ার মাত্রাটাও দেখেন! ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ৫টি পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপে এরই মধ্যে ২টি পেয়ে গেছে। তা এত এত পেনাল্টি আদায় করা, পাওয়া এবং পেনাল্টিতে গিয়ে গোল করা দলের কাছে ব্রাজিল পেনাল্টির কোচিং নেবে না, তো কার কাছে নেবে?
আর্জেন্টিনার সাথে সাথে আকাশী–সাদার সমর্থকদের কাছেও কিন্তু ব্রাজিলের সমর্থকদের কোচিং নেওয়ার বাস্তবতা আছে। বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কথাই ভেবে দেখুন। এদের দীর্ঘসময় চড়তে হয়েছে আবেগের রোলার কোস্টারে। আর্জেন্টিনার অনেক সমর্থকই পাবেন যারা ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ দেখেইনি। কিন্তু সমর্থন করে গেছে নির্বিচারে। এভাবে আইসক্রিম জীবনেও চোখে না দেখেও মনে মনে চেখে নিয়েই আকাশ–কুসুম কল্পনার মধ্য দিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের ক্রমাগত মোকাবিলা করার যে বিষয়টা, এটা কিন্তু সামান্য না।
বরং এর জন্য প্রয়োজন হয় বঙ্গোপসাগরের মতো ত্যাগ, তিতিক্ষা এবং গন্ডারের চেয়েও বহুগুণ সহনশীলতা। অবস্থা যেমন দেখা যাচ্ছে, ব্রাজিল সমর্থকেরা কিন্তু সেই পথেই হাঁটা দিচ্ছে। ২৮ তো হয়েই গেল, ৩৬–ও যে হবে না, কে বলতে পারে? তাই আগে থেকেই এক ধরণের প্রতিরোধমূলক সহনশীলতা তৈরি করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে তেমন সহনশীলতা আর কে শেখাতে পারবে, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ছাড়া?
আচ্ছা, আগামী ১২/১৪ বছরের অপেক্ষা যদি করতেই হয় ব্রাজিল সমর্থকদের, তবে চোখ মুছতে কতটুকু টিস্যু লাগবে, সেই হিসাবও তো বের করতে হবে, তাই না? অন্তত তার জন্য হলেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সাহচর্য ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। কারণ তা না হলে টিস্যুর অপচয় ঠেকানো যাবে না। আর অপচয়কারী কার ভাই বা বোন, সেটি নিশ্চয়ই জানেন।
কি, এখনও আর্জেন্টিনার কাছে কোচিং নেওয়ার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না? খচখচ করছে? পেন্টার ইগো বাধা দিচ্ছে?
ঠিক আছে। সব বাদ দেন। শুধু কমিটির কাছের দল কীভাবে হওয়া যায়, কমিটির কতটা কাছে গেলে পেনাল্টি পাওয়ার পর তা গোলেও রূপান্তরিত হয়, কীভাবে মাঠে বা মাঠের বাইরেও যেখানে সেখানে ফ্রি কিক পাওয়া যায়—সেসব এই একবিংশ শতাব্দীতে আর কে শেখাবে আর্জেন্টিনা ছাড়া? আঙুল বাঁকা করে ঘি তোলার ব্যাপারটা কে শেখাবে?
প্লিজ, উত্তর দেন…
হে ব্রাজিলের সমর্থকেরা, আশা করি, উত্তর আপনাদের মানসপটে আঁকা হয়ে গেছে। কারণ ব্রাজিলের সমর্থকেরা আর যাই হোক, অতোটা যুক্তিহীন নিশ্চয়ই হবেন না। তাছাড়া নিজের ভালো পাগলেও যেহেতু বোঝে, তাই আর্জেন্টিনার কাছে কোচিং করতে ব্রাজিলের আপত্তি থাকা আর উচিত না।
এখন আর্জেন্টিনার কোচিং সেন্টারে ব্রাজিল ভর্তি হলেই হয়! আখেরে লাভই হবে, ক্ষতি নাই।



পাঠকের মন্তব্য