সকাল থেকে খুব তাড়াহুড়ো করছে দুর্গা। খুশি-খুশি চঞ্চল চিত্তে এ ঘর-ও ঘর হাঁটছে সে।
‘অপু—ও অপু, তাড়াতাড়ি স্নানটা সেরে তৈরি হয়ে নে।’
আয়নায় নতুন শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নানাভাবে দেখে নিচ্ছে—নাহ, মানাবে!
‘কী রে অপু… গতকাল পাশের বাড়ির কাকুর ফোনে মেসেজ পাঠিয়েছেন শঙ্কু আঙ্কেল। দুপুরের ট্রেন ধরতেই হবে।’
চিন্তায় পড়ে গেছেন জটায়ু; ‘সোনার কেল্লা’ নাকি ‘বাদশাহী আংটি’? উফ্, আবার গুলিয়ে গেল! কথায় কথায় একবার জেনে নিয়েছিলাম, আবার ভুলে গেলাম কী করে! তোপশেকে একটাবার জানিয়ে থাকলে এখন আমায় মনে করিয়ে দিত।
‘এই তোপশে, কোনটা নেব একটু বলো না?’
তোপশে ভ্রুকুটি করে বলল, ‘আপনি আপনার অসমাপ্ত উপন্যাসটা নিয়ে নিন। এটার একটা গতি এবার হয়ে যেতে পারে।’
‘ফেলুদা কই?’
জটায়ু মুখ বেঁকালেন, যার সম্ভাব্য অর্থ—কী জানি!
এদিকে হীরক রাজা পড়েছেন মহাবিপদে। নিজ রাজ্য বাদে কোথাও চেনেন না। সৈন্যগুলোও হয়েছে মহা ত্যাঁদর—বলে কিনা, ‘চিনি না হুজুর, আপনাকে কী করে নিয়ে যাব!’
‘আমাকে তো ঐখানে যেতেই হবে।’
উপায়ান্তর না পেয়ে লজ্জা, সম্মান আর স্বৈরাচারীত্বের মাথা খেয়ে তিনি দ্বারস্থ হলেন গুপী গাইন আর বাঘা বাইনের। এদিকে গুপী-বাঘা তো হেসেই কুটি কুটি। রাজার একী দুরবস্থা!
‘ঠিক আছে, আমরা যাওয়ার সময় আপনাকেও নিয়ে যাব বগলদাবা করে। ওইখানে ভালো-মন্দ তো খাওয়াবে, তাই আমরা এখন কিছু খাচ্ছি না। আপনি কিছু খাবেন? একটু মুড়ি দিই? হা হা...’
রাজা মনে মনে কটমট করলেও সব নীরবে হজম করলেন—আজ এটুকু তো হজম করতেই হবে।
বিমল, সন্দীপ, চারুলতাও রওনা করেছে। ওরা আপাতত জ্যামে আটকে গেছে। চারুলতা একটু পর পর মোবাইলে নিজের চেহারা দেখছে; এভাবে যদি আরও কিছু সময় জ্যামে থাকে মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে। এই মুখে যাওয়ার চেয়ে না যাওয়া ভালো।
তারিণীখুড়ো ন্যাপলাদের নিয়ে ‘উড়ন্তপঙ্খী’তে উঠে পড়েছেন। ন্যাপলা জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
জবাবে খুড়ো বললেন, ‘তোদের কাছে সেরা গল্পের জাদুকর কে?’
: ‘তুমি।’
: ‘আর আমার গুরু তিনি। চল, গেলেই বুঝতে পারবি।’
ফটিকচাঁদ, বঙ্কুবাবু, পিঙ্কু গ্রুপে মেসেজ দিল—তারা ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে। প্রফেসর শঙ্কু, নিউটন আর বিধুশেখরকে নিয়ে করিডোরে উপস্থিত। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাকিরাও চলে আসবে।
দক্ষিণ কলকাতার ১/১ বিশপ লেফ্রয় রোডের একটা বাড়ি—একজন খুব আভিজাত্যের ভঙ্গিতে হাসি হাসি মুখে ইজি চেয়ারে বসে আছেন। সবাই একে একে পৌঁছে গেল, কিন্তু ফেলুদারই খবর নেই। এদিকে তোপশে বারবার দাঁতে নখ খুঁটছে, ফেলুদা ফোনও ধরছে না। হঠাৎ গাড়ির শব্দ—ওই তো ফেলুদা!
‘কোথায় ছিলে তুমি?’ দুশ্চিন্তা জটায়ুর কণ্ঠে।
শঙ্কু বললেন, ‘তোমার জন্যই অপেক্ষা করছি, চলো ভিতরে।’
ধীর পায়ে সবাই ভিতরে প্রবেশ করল। চেয়ারে বসা ব্যক্তিটি মুচকি হাসছেন। অপু জিজ্ঞাসা করল, ‘কে ইনি?’
দুর্গা বলল, ‘ইনিই তো সে, যার জন্য তোকে-আমাকে পৃথিবীর মানুষ এত ভালোবাসে। উনি একজন সত্যিকারের মহারাজা—সত্যজিৎ রায়।’
ফেলুদা বললেন, ‘আজ আপনার জন্মদিনে কী আনব পাচ্ছিলাম না। আমরা সকলে তাই চলে এলাম। আজকের এই দিনে কথা দিন, প্রতি বছরটা আমাদের সাথে কাটাবেন?’
সত্যজিৎ রায় আবার সেই মনভোলানো হাসি দিলেন। গুপী আর বাঘা সুর ধরল—
‘মহারাজা, তোমারে সেলাম…’



পাঠকের মন্তব্য