এক শহুরে ইঁদুরের সঙ্গে এক গেঁয়ো ইঁদুরের বন্ধুত্ব ছিল। একদিন শহুরে ইঁদুর ভাবল, 'অনেকদিন আমার বন্ধুকে দেখিনি। একবার তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে মন্দ হয় না।' আবার ভাবল, 'কিন্তু আমি তো শহরের পথঘাট চিনি না। আচ্ছা তারচেয়ে এক কাজ করা যাক, চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞাসা করে দেখি গর্ত ম্যাপ বলে দিতে পারে কিনা। এই ভেবে গেঁয়ো ইঁদুরকে মেসেঞ্জারে লিখল, বন্ধু, অনেকদিন তোমাকে দেখিনি। তোমার সাথে দেখা করতে আসছি ASAP।
চিঠি লিখেই তার ভাবনা হল, 'এই যা, নেট তো চলে চলে গেল।' শহুরে ইঁদুর থাকত মোহাম্মদপুর এক আন্টির বাসায়। তার বেলকনিতে এক কোণে বাসা বেঁধেছিল চড়ুই। তার সঙ্গে ইঁদুরের খুব ভাব। বেলকনিতে গিয়ে ইঁদুর ডাকল, চড়ুই আপ্পি, ও চড়ুই আপ্পি।
চড়ুই বলল, আরে ইঁদুর-দাদা যে, এসো এসো, কী খবর!
ইঁদুর বললে, আপ্পি, একটা কাজ করে দেবে? বড্ড মুশকিলে পড়ে গেছি। নেট কাজ করছে না, একটু হটস্পট দেবে!
চড়ুই বললো, নিশ্চয়ই, এক্ষুণি দিচ্ছি। পাসওয়ার্ড ডিগবাজি ১ থেকে ৮।
ইঁদুর ধন্যবাদ জানিয়ে মেসেঞ্জারে মন দিল।
শহুরে ইঁদুরের মেসেজ গেঁয়ো ইঁদুর পেল পরদিন দুটোয়। বেচারার মোবাইলে চার্জ ছিল না। শহুরে বন্ধু আসবে। গেঁয়ো ইঁদুর তার যত্নআত্তির ব্যবস্থা নিয়ে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শহরের মতো ভালো জিনিস তো আর গ্রামে পাওয়া যায় না। তবু ওরই মধ্যে যেখানে যা ভালো জিনিস পেল ইঁদুর তাই জোগাড় করতে লাগল। একটা হাতপাখা, দু-তিন রকমের মাছ, হরেক রকমের ডাল, খানিক বার্গার, দু-চার টুকরো পুরোনো পিঠে, কয়েকটা বাদাম এমনি কত কী সে সারা রাত্তির ধরে জোগাড় করল।
রাত আটটা-নটার সময় শহুরে ইঁদুর এসে পৌঁছল। অমনি গেঁয়ো ইঁদুর ব্যস্ত হয়ে 'হেই, কীরে? হোয়াটসাপ, কতদিন পরে তোমায় দেখলাম' বলে তাকে বসতে দিল অনলাইনে কেনা একটা কাস্টোমাইজড সোফায়। তারপর দুই বন্ধুতে অনেক গল্প হল। গেঁয়ো ইঁদুর বলল, এবার তোমার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করি ব্রো। বড্ড রাত হয়ে গেছে।
বলে ফোল্ডিং টেবিল পেতে দিয়ে বন্ধুকে ডাকল, আর যত-কিছু সংগ্রহ করেছিল সব এনে সাজিয়ে দিল। শহুরে ইঁদুর ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দেওয়ার জন্য সবকিছুর ছবি তুলতে নিলেই গর্ত অন্ধকার করে আইপিএসের চার্জ চলে গেল।
ধুসসালা! বলে ক্যাঁচ করে উঠল সে। গেঁয়ো ইঁদুর ইতস্তত করতে করতে বলল, পাড়াগাঁয়ে আসলে তেমন বিদ্যুৎ থাকে না।
শহুরে ইঁদুর অন্ধকারে পথ না পেয়ে এটা সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। আর মাঝে মাঝে যেখানে সেখানে ধাক্কা খেতে লাগল। গেঁয়ো ইঁদুর বারবার বলতে লাগল, এসব জিনিস তোমাদের ভালো লাগবে না জানি, শহরে তোমরা কত বিদ্যুৎ পাও। কিন্তু কী করবে ভাই, বন্ধুর জন্য একদিন একটু কষ্ট করতেই হবে। ও কী! এদিকে তো ওয়াশরুম। দাঁড়াও আমি ফ্ল্যাশ জ্বালাচ্ছি।
ইচ্ছে না থাকলেও বন্ধুকে খুশি করবার জন্য শহুরে ইঁদুর চিৎকার না দিয়ে আস্তে আস্তে বললো, তা যাই বলো ভাই, তোমরা এই পাড়াগাঁয়ে যে কী করে দিন কাটাও আমি তা ভেবেই পাই নে। আসার পর থেকে নেটওয়ার্ক নেই, টু জি হয়ে আছে। কারেন্ট সেই যে গেল এখনও এল না। এখানে না পাওয়া যায় ভালো ইন্টারনেট, না আছে নেটফ্লিক্স। মেট্রোরেলও দেখলাম না। টেসলা নেই, পিৎজা হাট এমনি গ্রামীণচেক বা আড়ঙের শোরুমও নেই। তোমরা কী করে থাক বলো তো। আমি হলে এক দিনও টিকতে পারতাম না, তা তুমি যাই বলো-না কেন।
গেঁয়ো ইঁদুর বললে, যা বলছ মিথ্যে নয়, ব্রো। তবে কী জান, আমাদের সয়ে গেছে। আমাদের এখানে থাকতে কষ্ট হয় না। সরকারও জানে আমাদের এই কষ্ট সহ্য করাটাই নিয়তি। আমায় নিয়ে যাবে তোমার সাথে? গেস্ট রুমেই না হয় রাখলে। এটাচড বাথ না হলেও চলবে, আমার কমন ওয়াশরুম ব্যবহার করার অভ্যাস আছে।
এমন সময় হঠাৎ বাড়ির বিড়ালের ‘ম্যাঁও ম্যাঁও’, আওয়াজ ভেসে আসলো। শব্দটা আস্তে আস্তে তীব্রতর হচ্ছে।
শহুরে ইঁদুর বললে, ওএমজি! কল ফায়ার সার্ভিস, ইমার্জেন্সি, ৯১১! আয়হায় নেটওয়ার্কও নেই। কারেন্ট কখন আসবে? বড় আলো জ্বললে বিড়ালটা হয়তো পালিয়ে যাবে।
গেঁয়ো ইঁদুর বললো, রাতে কারেন্টই থাকে না ডুড। ঐ বিড়ালটাকে আমি ফেসবুকে ব্লক মেরেছি। তাই মাঝেমাঝে পোক মারতে আসে।
শহুরে ইঁদুরের বুক ঢিবঢিব করছে, আজ কারেন্ট থাকলে সে লাইভে চলে গিয়ে ভাইরাল একটা ভিডিও করতে পারত। গেঁয়ো ইঁদুরকে জিজ্ঞাসা করল, বিদ্যুৎ কখন আসবে?
গেঁয়ো ইঁদুর খানিক ভেবে জানাল, গতদিন এসেছিল ১৪ ঘণ্টা পর। এবার তো ২০ ঘণ্টা হয়ে এল প্রায়।
শহুরে ইঁদুর প্রথমে মুখ বাড়িয়ে বাইরে দেখল, বিড়ালটা কোথাও আছে কিনা। নাহ, কেউ নেই। তখন সে গেঁয়ো ইঁদুরের কানে কানে বললে, বন্ধু, এমন বিদ্যুৎহীন নিজের গর্তে থাকার চেয়ে আমাদের শহরে অন্যের বাড়িতে নিশ্চিন্ত মনে থাকা অনেক ভালো। তোমার গাঁয়ের লোডশেডিং নিয়ে তুমি থাকো। আমি শহরের ইঁদুর, শহরেই ফিরে যাচ্ছি।



পাঠকের মন্তব্য