আস-সালাতু খয়রুম মিনান নাউম... ঘুম হতে নামাজ উত্তম।
ফজরের আজান হচ্ছিল। ঝপ করে ঘুমটা ভেঙে গেল। বাজে একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। রূপকথার ডাইনি বুড়ি আমাকে আদর করে খুব খাওয়াচ্ছে, যাতে আমি মোটাতাজা হয়ে উঠলে আমাকে খেতে পারে। আজান হয়ে যাওয়ায় সেটা আর পারেনি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল আমার। কাল রাতে তিতিরের সাথে কথা বলতে বলতে রাত শেষ হয়ে যাওয়ায় ঘুম হয়েছে অল্প একটু। তাই বোধহয় আজেবাজে স্বপ্ন দেখছিলাম।
ঈদের সকাল। কাল একমাসব্যাপী রোজা শেষ হল। কাল ইফতারের পর থেকেই আমার মায়ের তড়বড়ানি শুরু হয়েছে। কত কাজ! চারদিকে শুধু রান্না আর রান্না। প্রতি ঈদেই দেখি আমার মায়ের জীবনপণ মিশন রাঁধো আর খাওয়াও। তাই ঈদ আসলে আমি একটু আতঙ্কেই থাকি। মা বাবাকে বেশি যন্ত্রণা করতে পারেন না, কারণ বাবার ডায়াবেটিস আর ব্লাড প্রেসার দুইই আজীবন সঙ্গী। বরং বাবাই মাকে তুলোধুনো করে ছেড়ে দেন। এখান থেকে এটা লুকিয়ে খেয়ে ফেলছেন, ওখানে সেটা রাখা ছিল আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এমন অবস্থা। তাই মায়ের সবেধন নীলমণি আমি একাই।
আজ ভোর থেকেই মা এমন ঝলমলে মুখে রান্নাঘরে আছেন, যেন মনে হচ্ছে কোনো সুপারভিলেন কোনো মাস্টারপ্ল্যান বানাচ্ছেন। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন, যা, তৈরি হয়ে নে। তোর বাবা একটু পর নামাজে বের হবেন। এর মধ্যে আবার কিছু মুখেও তো দিতে হবে।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, যাই মা।
আমি রেডি হয়ে এসে দেখি মা বাবার সামনে একটা পিরিচে দুটি খেজুর আর এক পিরিচে পায়েস রেখেছেন। বাবা ঘ্যানঘ্যান করছেন, শায়লা আজ ঈদের দিন। আজ তো একটু বেশি দেবে। একমাস রোজা রেখে দুর্বল হয়ে গেছি। তার ওপর অল্প কিছু মুখে দিয়ে বেরিয়ে নামাজ পড়তে গিয়ে যদি মাথা ঘুরে যায়?
মা বলছেন, এর চেয়ে বেশি খেলে দুর্বলতায় নয়, বিপি বেড়ে মাথা ঘুরে যাবে তোমার। তবু বাবা প্যানপ্যান করেই চলেছেন আর একটু দেওয়ার জন্য।
আমি ঢুকলাম। আমাকে দেখেই মায়ের মুখে হাজার পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে উঠল, আর আমার আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। মা যে পাত্রে আমার জন্য পায়েস বেড়ে রেখেছেন, ওটাকে গামলাও বলা চলে না, মিনি পুকুর বললে ঠিক হবে।
আয় বাবা আয়। ডাক শুনে আমার মনে হল মা স্বয়ং রূপকথার গল্পের সেই বুড়ি, যাকে ভোরে স্বপ্নে দেখেছিলাম। ভোরের স্বপ্ন নাকি আবার সত্যি হয়। আল্লাহ মাফ কর। কী যা তা ভাবছি।
কাছে গেলাম। মা নিজ হাতে তুলে নিলেন চামচ। খাইয়ে দেবেন। গামলাটার ভেতর তরকারি বাড়ার চামচও ছোট হয়ে গেছে। ছেড়ে দিলে তলিয়ে যাচ্ছে। আমি দুর্বল চেহারায় হা করছি। মা মুখে তুলে দিচ্ছেন। ওই ঢাউস সাইজের চামচের সাত আট চামচ খাওয়া হয়ে গেছে। ইচ্ছে হল মাকে বলি, মা চামচটা উঠিয়ে নাও, আমি এর মধ্যে নেমে যাই। একটা সাঁতার দিয়ে আসি। সেটা বলার তো আর উপায় নেই, তাই আমি মিন মিন করে মাকে বললাম, মা ঈদের নামাজের দেরি হয়ে যাচ্ছে, এবার ছেড়ে দাও। ফিরে এসে বাকিটা খাব।
মা ধমক দিয়ে বললেন, ফিরে এসে খাওয়ার অনেক কিছু আছে। এইটুকুন খেয়ে যা সোনাবাবা।
সাথে সাথে বাবা প্রতিবাদ করলেন, যে খাবে না তাকে ঠেসে গেলাচ্ছ, আর যে চাইছে তাকে দাও না।
মা বাবার দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিলেন। তাড়াতাড়ি বাবা কই রে চল দেরি হয়ে গেল তো বলে টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লেন। আমিও এই ফাঁকে মায়ের হাত গলে বেরিয়ে এলাম।
নামাজ শেষে বাসায় ফিরে শুয়েছি একটু। ভাবছি তিতিরকে ফোন দিয়ে ঈদ মোবারক জানাই, মা এসে হাজির।
আয় বাবা নাশতা করে নে। দেরি হয়ে গেলে আবার দুপুরের খাবার খেতে পারবি না।
মাত্রই তো এক গামলা পায়েস খেলাম মা। ক্ষিধে লাগে নি।
গামলা আবার কিরে ছেলে। আর ওইটুকুনি তো কখন হজম হয়ে গেছে।
সো, আবার খাবার টেবিল। সকালের নাশতায় মা খিচুড়ি রেঁধেছেন। সাথে আছে গরুর গোশত ভুনা, বেগুন ভাজা, আলু কুচিয়ে মচমচে করে তেলে ভাজা, ডিম ভুনা, তেঁতুলের টক।
আমি পড়েছি মোঘলের হাতে চেহারা করে খেতে বসেছি। মা পাতে খিচুড়ি তুলে দিলেন। তারপর একের পর এক সব আইটেম তুলে দিতে লাগলেন। আমি দুপুরে কেন সারাদিনেও আর কিছু খাব না বলে হুমকি দিয়েও কোনো লাভ হল না। অল্প খিচুড়ি দিয়ে সব আইটেম শেষ করে উঠে পড়ব পড়ব, মা বললেন, খিচুড়িটা বোধহয় রান্না ভালো হয়নি। তুই তো খেতে পারলি না। দাঁড়া লাচ্ছা পরোটা করেছি নিয়ে আসি।
আমি আতঙ্কে নীল হয়ে গেলাম। মাকে বারবার বোঝালাম আর পারব না। লাভ হল না। দুটো পরোটা দিয়ে আবার সবকিছু খাওয়া লাগল। দম ফেটে বের হওয়ার জোগাড়।
পেট নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। তবু বিছানায় গড়িয়ে পড়ার লোভ সামলালাম। বাসায় যতক্ষণ আছি মা গিলিয়েই যাবেন। যেন আমি একটা মানুষ না, ফুড স্টোরেজ। তার চেয়ে পালাই। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে তিতিরকেও একটু সময় দিতে হবে।
বেরিয়ে গেলাম বন্ধুদের আড্ডায়। আজব অবস্থা। এখানেও দেখি সবাই খাচ্ছে। পিৎজা, বার্গার, চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফাস্টফুডের বৈঠকখানা যেন। কিন্তু কী করি। না খেলে ইয়ার দোস্ত ও ডায়েট মারো, এহ আইছে আমগো শাকিব খান, কি রে ডার্লিং খাইতে না কইরা দিসে নাকি ইত্যাদি টিপ্পনী শোনা লাগছে। তাই বাধ্য হয়ে টুকটাক যা পারছি মুখে দিয়ে যাচ্ছি।
ওদিকে পেট হরতাল ঘোষণা করছে। সে সকালের হেভিওয়েট আপ্যায়নের পর ফাস্টফুডের আতশবাজি নিতে পারছে না। আমি গুরুত্ব দিলাম না। ঠেলে নিয়ে গেলাম। যা থাকে কপালে।
ফাইনালি, বন্ধুদের আড্ডা থেকেও মুক্তি। এখন বাকি আছে শুধু তিতির। ওর কাছে গেলে ভয় নেই। রাতে বাসায় ফেরা পর্যন্ত নিশ্চিন্তি।
আমি গিয়ে দেখি তিতির বসে আছে। ওর হাতে কিসের যেন ব্যাগ বস্তা। গিফট টিফট হবে হয়তো। ওর অনেক আজগুবি শখ আছে। আমি এমন অনেক কিছু পাই ওর কাছ থেকে।
কাছে গিয়ে বসলাম। সে খুশি খুশি চেহারা নিয়ে তাকাল। বলল, তোমার জন্য সেজেছি, দেখো তো কেমন লাগছে।
তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা, মম শূন্যগগনবিহারি।
সবসময় শুধু যত্তসব বাজে কথা।
আমি আর কিছু বললাম না। এটা ওর অভ্যাস। আমার কাছে প্রশংসা চাইবে, আবার করলে লজ্জা পেয়ে হাবিজাবি বকবে।
সে যাক। হাতে কী। আমার জন্য কিছু। আমি কিন্তু কিছু আনি নি তোমার জন্য, মনে নেই।
কবে আবার তোমার মনে থাকে।
পীরিতের আলাপ ভালোই চলছিল, ভালো লাগছিলও। কিন্তু গড়বড় করছে আমার কিচেন এরিয়া। সারাদিনের ঠাসাঠাসিতে সে খাঁচায় পোরা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো গজরাচ্ছিল আগে থেকেই। এখন একটু নির্লজ্জ চাপ দিচ্ছে মনে হচ্ছে। সেটাকে আমলে না নিয়েই বললাম, যা এনেছ দিয়ে দাও না, আমি তো তোমারই দানের কাঙাল।
ঢং। দেখ আজ আমি কী করেছি। আমি আজ জীবনে প্রথম চটপটি রেঁধেছি। আমি তোমার জন্য...
আমার মাথার ভেতর সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল। তিতিরের কোনো কথাই আর কানে ঢুকছে না। চোখের সামনে ভাসছে হলুদ রঙের কিছু পদার্থ, যা খাবার বলে মনেই হচ্ছে না। ভয়ংকর কিছু মনে হচ্ছে। শরীর গুলিয়ে আসছে আমার।
পেটের ভেতরের সারাদিনের অত্যাচারেরা দ্বিমুখী ওয়াকআউটের ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে। আমি ওয়াক থু বলে শরীরের ওয়াকআউটের ঘোষণার সদম্ভ প্রকাশ করে ফেললাম। ফেলেই আর দাঁড়ালাম না। উভয়মুখী চাপ আমাকে পাগল করে ফেলল। স্থান কাল পাত্র ভুলে, তিতিরকে ভুলে আমি বর্জ্য নিষ্কাশন কক্ষের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।
বাসায় ফিরে চুপ করে শুয়ে আছি। মা এসে বললেন, বাবা রাতের খাবার খাবি না। খেয়ে শুয়ে পড়।
আমার ইচ্ছে হল বলি, মা এক চামচ বিষ এনে দাও, খেয়ে একেবারেই শুয়ে পড়ি।
বললাম না কিছুই। চুপ করেই পড়ে থাকলাম। ভাবছি তিতিরকে কী ব্যাখ্যা দেব আজকের আচরণের। কী বললে সে বিশ্বাস করবে যে তার রান্না দেখে অমন করি নি আমি। আমার...
হে পরওয়ারদিগার, শক্তি দাও, সাহস দাও, দাও হিম্মত...



পাঠকের মন্তব্য