খুব সম্ভবত এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি আমি।
প্রশ্ন হাতে পেয়ে বুঝতে পারলাম, এটা ফিজিক্স পরীক্ষার প্রশ্ন। ফার্স্ট পেপার না সেকেন্ড পেপার, সেটা বুঝতে পারছি না।
বুঝব কী করে?
আমি তো পড়ে এসেছি ইতিহাস!
ইতিহাসের ছাত্রের হাতে ফিজিক্সের প্রশ্ন কেন? এসব কী হচ্ছে আমার সঙ্গে?
মাথা নষ্ট!
গলাটা শুকিয়ে গেছে। একটু পানি খাওয়া দরকার।
হাত উঁচু করে ম্যাডামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।
এই ছেলে, কী চাই?— কর্কশ কণ্ঠে ধমক দিয়ে বলে উঠলেন স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি।
উনাকে দেখে আমি আরও নার্ভাস। এই ভদ্রমহিলা এখানে কী করছেন? তার তো এখন নির্বাচন চলছে।
বললাম, ম্যাডাম, একটু পানি চাই।
শুনেই চমকে উঠলেন মমতা দি।
ধমকে বললেন, পানি?! নো, নো, নো। পানি দেওয়া যাবে না — আমি তো সেই কবেই বলে দিয়েছি, তিস্তার পানি দিয়ে আমাদেরই চলে না। তোমাদেরকে কীভাবে দেবো?
রিডিং গ্লাসের উপর দিয়ে চোখ রাঙাচ্ছেন তিনি।
বুঝলাম, পানির আশায় গুড়ে বালি।
হাতে ফিজিক্সের প্রশ্ন — আমি ইতিহাসের ছাত্র।
আমার মাথা নষ্ট।
সাহায্যের আশায় প্রতিবেশী পরীক্ষার্থীর দিকে তাকালাম।
দেখি, সেখানে বসে দুই আঙুল মুখে ঢুকিয়ে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংসের টুকরা বের করায় ব্যস্ত — নবাব সিরাজউদ্দৌলা।
হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দেশলাই হবে?
বলে কী ব্যাটা! পরীক্ষার হলে ধূমপান?!!
কে জানে? হয়তো রাজা-বাদশাহদের জন্য মিলন সাহেবের শিক্ষা বোর্ড কোনো বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।
আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, দেশলাই নাই, হুজুর। তবে লাইটার আছে। চলবে?
তিনি ধমকে উঠলেন, হারামজাদা, লাইটার দিয়ে কি দাঁত খোঁচানো যায়?
নবাবের মেজাজ তো দেখি অত্যন্ত খারাপ।
তবুও ফিসফিস করে বললাম, জাহাঁপনা, কী অবস্থা? প্রশ্ন কমন পড়েছে কিছু? পারছেন কিছু?
বললেন, না রে।
কেন, হুজুর? পড়াশোনা করেন নাই?
তিনি গেয়ে উঠলেন, গতকাল রাতে আলেয়া আমার, দরজার কড়া নেড়ে করল জিজ্ঞেস, আমায় ছাড়া...
বললাম, থাক, থাক, থাক। আর বলতে হবে না।
আলেয়ার সঙ্গে আপনার কেচ্ছা-কাহিনি এই বাংলায় কারও অজানা নয়। সেদিন যদি এইসব আলেয়াবাজি রেখে একটু আয়নাবাজি করতেন, ক্লাইভের কাছে এইভাবে টুৎ টুৎ মারা খেতে হতো না।
খামোশ! বলে চেঁচিয়ে উঠলেন নবাব।
চিৎকার শুনে মমতা ব্যানার্জি এসে ধরলেন আমার কান।
সম্ভবত সিরাজউদ্দৌলার কান ধরার সাহস তিনি পেলেন না। হাজার হলেও তিনি নিজেও তো এখন এক বাংলার ‘নবাব’—না হলেও নবাবের মতোই।
একজন নবাব হয়ে আরেকজন নবাবের কান তিনি কী করে ধরেন?
বুঝলাম নবাবদের দ্বন্দ্বে বরাবরের মতো শাস্তি পেতে হবে এই আমজনতাকেই
কান ধরেই মমতা ঘোষণা দিলেন, এই ছেলে, পরীক্ষার হলে কথা বলার অপরাধে তোমাকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে গ্রেপ্তার করা হলো।
বলে কী! এক্সাম হলেও ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট!
আমার মাথা পুরোই নষ্ট।
আমাকে চোখ বেঁধে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
নিয়ে যাচ্ছেন স্বয়ং জেনারেল ইয়াহিয়া খান।
নিতে নিতে তিনি গেয়ে উঠলেন, অপারেশন সার্চলাইট খেলব রে শ্যাম।
আমার মাথা আবারও নষ্ট।
ইয়াহিয়ার হাতে বন্দুক।
বললেন, ম্যায়নে এক সে তিন তক গিনেগা, ইস সময়ে যিতনা পারো ভাগো... এক... দো...
আমি দৌড়... দৌড়... এবং তারপর হঠাৎ পিছন থেকে ঠুস্...
খুব সম্ভবত ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে স্বপ্নের মধ্যে ক্রসফায়ার হলাম আমি।
মোরাল অফ দ্য স্টোরি: হাই প্রেসারের অজুহাতে কড়া ঘুমের ওষুধ বেশি খাবেন না।



পাঠকের মন্তব্য