বাংলাদেশে ঋণখেলাপিদের দাপট ও তাদের প্রতি রাষ্ট্রের অবারিত করুণা দেখে মনে হয়, দেশটিকে খুব শিগগিরই বিশ্বের প্রথম অফিসিয়াল ঋণখেলাপি অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
এই অভয়ারণ্যে ইচ্ছাকৃত খেলাপি নামক এক বিশেষ প্রজাতির প্রাণী অত্যন্ত সগৌরবে বিচরণ করে, যাদের জীবন রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় চব্বিশ ঘণ্টা অক্সিজেনের মতো পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফ নামক বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ করে থাকে। এখানে নিয়ম অত্যন্ত চমৎকার।
আপনি যত বেশি টাকা ব্যাংকের ভল্ট থেকে সরিয়ে হজম করতে পারবেন, সমাজের উঁচু স্তরে আপনার আসন তত বেশি পাকাপোক্ত হবে এবং আইনের লম্বা হাত আপনার নাগাল পাওয়ার বদলে আপনার সেবায় ব্যস্ত থাকবে।
রাইট-অফ বা অবলোপন নামক জাদুকরী কলমের ছোঁয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের লেজার থেকে এমনভাবে মুছে ফেলা হয়, যেন ওই টাকাগুলো কোনোদিন অস্তিত্বেই ছিল না; আর এই ডিজিটাল ভেলকিবাজির মাধ্যমে খেলাপি ঋণের পাহাড়কে রাতারাতি সমতলে নামিয়ে এনে জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি যে কোনো উচ্চাঙ্গের সার্কাসকেও হার মানায়। এর বিপরীতে, যারা সময়মতো কিস্তি দেওয়ার মতো ‘অসুস্থ’ মানসিকতা লালন করেন, সেইসব সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য খুব দ্রুত নিরাময় কেন্দ্র খোলা দরকার, যাতে তারা বুঝতে পারেন যে, বাংলাদেশে ঋণ পরিশোধ করা মানে হলো নিজের বোকামির প্রমাণ দেওয়া এবং প্রভাবশালী বন্ধুদের আসরে হাসির পাত্র হওয়া।
ব্যাংকিং খাতের এই তথাকথিত ক্রোনিজম বা স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আমানতকারীদের জমানো টাকা আসলে কোনো বিনিয়োগ নয়, বরং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের জন্য এক প্রকার ‘বার্ষিক অনুদান’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাধারণ মানুষ যখন সঞ্চয়ের নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তখন এই অভয়ারণ্যের রাজা-বাদশাহরা নতুন কোনো ব্যাংকের বোর্ড দখল করে কিংবা বিদেশে আলিশান প্রাসাদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন, আর রাষ্ট্র অত্যন্ত পিতৃসুলভ বাৎসল্যে তাদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে নতুন মেয়াদে আরও ছাড়ের ঘোষণা দেয়।


