এক সিট, এক নারী, অসংখ্য বাধা

৩৯ পঠিত ... ১৫:১৪, মার্চ ০৮, ২০২৬

ঢাকা শহরে বৃষ্টির দিনে বাসে জায়গা পাওয়াটা অনেকটা লটারির টিকিট জেতার মতো। রিমঝিম ঝিরঝির বৃষ্টিতে বাসের প্রতিটি জানালার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আছে। নীলা বাসের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে। একটা বাসের কন্ডাক্টর ওর চোখের দিকে না তাকিয়েই বিরক্ত গলায় বলে দিল, "সিট নাই আপা, ঝুলে যাওয়া যাবে না।" নীলা দেখল, পেছনের দরজা দিয়ে শার্ট-প্যান্ট পরা এক যুবক অনায়াসেই ঝুলে উঠে গেল। কন্ডাক্টর তাকে বাধা তো দিলই না, বরং সে যেন একটু জায়গা পায় সেদিকে খেয়াল রাখল।

বৃষ্টির ঝাপটায় নীলার শাড়ির আঁচলটা ভিজে ভারী হয়ে গেছে। আজ অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল, অথচ এই বাসের অপেক্ষাতেই ওর অর্ধেক সময় শেষ। নীলার মনে হলো, এই শহরটা যেন ওকে প্রতিদিন বুঝিয়ে দিতে চায়—তার জায়গাটা রাস্তার এই ফুটপাতেই, বাসের ভেতরে নয়। একটু দূরেই রিকশা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু পকেটের অবস্থা চিন্তা করলে রিকশা নেওয়া মানেই আজ দুপুরে না খেয়ে থাকা। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার রাস্তার দিকে তাকাল। বাসের ভেতরে পুরুষদের ভিড়, ঘামের গন্ধে একাকার। সেদিন বাসে একটা বিশ্রী স্পর্শ ওর পিঠে অনুভব করল সে। নীলা চমকে পেছনের দিকে তাকাতেই দেখল, এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক নির্বিকার মুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

নীলা কিছু বলবে বলে মুখ খুলল, কিন্তু শব্দ বেরিয়ে এল না। এমন নয় যে সে ভয় পেয়েছে, বরং ওর ভেতর এক অদ্ভুত ক্লান্তি কাজ করছে। সে জানে, প্রতিবাদ করলেই হয়তো বাসের ভেতর শোরগোল শুরু হবে, এবং শেষমেশ দোষটা ওরই হবে—"এত ভিড়ে কেন ওঠেন?" বা "মেয়েদের একটু আধটু তো মানিয়ে নিতেই হবে।" নীলা জানালার কাঁচের নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। কী অদ্ভুত, সে বাসের ভেতরে ঢুকতে পারছে না, অথচ নিজের ভেতরই সে যেন বন্দি হয়ে আছে। চারপাশের মানুষের ভিড়ে সে ভীষণ একা। একটা নীল রঙের বাস ওর সামনে এসে ব্রেক চাপল। কন্ডাক্টর এবার চিৎকার করে বলল, "আসেন, জায়গা আছে!" নীলা দ্বিধা নিয়ে বাসের ধাপের দিকে পা বাড়াল, যেন কোনো এক অজানা বিপদের দিকে সে স্বেচ্ছায় হেঁটে যাচ্ছে।

বাসের ভেতরে গাদাগাদি মানুষের ভিড়ে নীলার মনে হলো, সে একটা লোহার বাক্সের ভেতর বন্দি হয়ে আছে। তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি অদ্ভুত এক কৌশলে বারবার তার হাত সরিয়ে দিচ্ছে, নীলা জায়গা বদল করার চেষ্টা করলে সেও আবার ইঞ্চি ইঞ্চি করে কাছে সরে আসছে। এমন নয় যে লোকটির কোনো গন্তব্য আছে, সে যেন ঠিক নীলার গন্তব্য পর্যন্তই একটা অদৃশ্য সীমানা তৈরি করে রেখেছে।

নীলা জানালার বাইরের জ্যামের দিকে তাকিয়ে রইল। রাস্তার পাশে একটি হোর্ডিংয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘নারীর সম্মান আমাদের দায়িত্ব’। নীলা মৃদু হাসল। এই শহরের মানুষগুলো অদ্ভুত। তারা মাকে দেবী মানে, বোনকে পবিত্র মানে, কিন্তু বাসের সিটে বসা একটা অপরিচিত মেয়েকে মানুষ হিসেবে দেখতে তাদের বড় কষ্ট হয়। নীলার মনে পড়ল, ছোটবেলায় দাদী বলতেন, “মেয়েদের বুদ্ধি নাকি হাঁটুতে।” তখন খুব রাগ হতো, আজ মনে হচ্ছে—বুদ্ধি বোধহয় আমাদের হাঁটুতেই থাকে, কারণ আমরা জানি কখন চুপ থাকতে হয়। আমরা জানি, কখন চোখ সরিয়ে নিতে হয়, কখন বাসের ভাড়াটা কোনোমতে বাড়িয়ে দিয়ে দ্রুত রিকশা ধরতে হয়। এই যে রিকশা ভাড়া মেটানোর জন্য তাকে মাসের শেষে নিজের ছোটখাটো শখগুলো বিসর্জন দিতে হচ্ছে—এটা কি শুধু যাতায়াত খরচ, নাকি নিরাপত্তার নামে ট্যাক্স?

বাসের কন্ডাক্টর হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, "যাত্রাবাড়ী! নামেন।" নামার সময় লোকটা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় নীলার ব্যাগের ওপর একটা হাত রেখে অকারণে এক মুহূর্ত বেশি সময় দাঁড়িয়ে রইল। নীলা কিছু বলল না। সে জানে, এই মুহূর্তে চিৎকার করলে পুরো বাস তার দিকে এমনভাবে তাকাবে যেন অপরাধটা নীলাই করেছে।

অনেক্ক্ষণ বাস একই জায়গায় দাড়িয়ে থাকার পর নীলা বুঝে গেছে এই বাস তাকে মিটিং অব্দি নিয়ে যেতে পারবেনা। সে দ্রুত বাস থেকে নেমে বৃষ্টির মাঝে ভিজে থাকা ফুটপাতে দাঁড়াল।

তার ফোনের স্ক্রিনে একটা মেসেজ এসেছে—অফিস থেকে তাকে আজ দেরি করার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। নীলা রাস্তার মোড়ে এসে একটা সিএনজি দেখল। চালক মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বলল, "তিনশো টাকা লাগবে, আপা।" নীলা জানত ভাড়া দেড়শো টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। সে শান্ত গলায় বলল, "ঠিক আছে, চলেন।" সে জানে, এখন তর্ক করার মানে হলো আরও এক ঘণ্টা বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা। সে সিএনজিতে উঠে বসল। কাঁচের ওপাশে ঢাকা শহরটা এখন অনেকটা দূরে মনে হচ্ছে। এই শহরটা তার, অথচ তার নয়। সে কেবল একটা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়, যার গন্তব্য আছে, কিন্তু চলার পথের কোনো নিরাপত্তা নেই। বৃষ্টি বাড়ছে। নীলা চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, সে আসলে কোনো বাসে বা সিএনজিতে নেই, সে অনন্তকাল ধরে কেবল একটি রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে—যে রাস্তার শেষ নেই, আর যে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কেবলই প্রশ্ন।

৩৯ পঠিত ... ১৫:১৪, মার্চ ০৮, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top