নামকরণের স্বার্থকতা

১১ পঠিত ... ৩ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

মফিজ উদ্দিন সাহেব মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই পুরো এলাকার চেহারা বদলাতে শুরু করল। তবে উন্নয়নের চেয়ে বেশি বদলাল নাম। মন্ত্রী মহোদয়ের সাফ কথা, এই এলাকায় যা কিছু আছে, সব এখন থেকে আমার পরিবারের সদস্যদের স্মরণে থাকবে। পরোপকার নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হয়।

একদিন সকালে মন্ত্রী সাহেব তার খাস চামচা কুদ্দুসকে নিয়ে পরিদর্শনে বের হলেন। এলাকার পুরনো বড় বাজারটার সামনে এসে মন্ত্রী গাড়ি থামালেন। চারদিকে গমগম করছে মানুষ। মন্ত্রী বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কুদ্দুস, এই বাজারটার নাম আজ থেকে আর চৌধুরী বাজার থাকবে না। আমার মরহুম আব্বাজানের নামে এই বাজারের নাম হবে আলহাজ্ব সলিমুদ্দিন বাজার।

কুদ্দুস খাতা কলম বের করে চটপট লিখে নিল। কিন্তু গোলমাল বাঁধল যখন মন্ত্রী বাজারের ভেতরের কাঁচাবাজারে ঢুকলেন। এক মাছ বিক্রেতা বড় একটা রুই মাছ উঁচিয়ে বলল, আইসেন মন্ত্রী মহোদয়! একদম তাজা রুই মাছ!

মন্ত্রী চোখ গরম করে বললেন, ধ্যাত! রুই মাছ কী অবাস্তব নাম! আজ থেকে এই মাছের নাম হবে মেজ খালাতো ভাই মন্টু মাছ। দেখো, কেমন গোলগাল আর বোকা বোকা চেহারা, হুবহু আমার মন্টু ভাইয়ের মতো!

মাছ বিক্রেতা হা করে তাকিয়ে রইল। পাশের তরকারি বিক্রেতা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, স্যার, তাহলে লাল শাকের নাম কী হইব?

মন্ত্রী একটু ভেবে বললেন, আমার ছোট বোন রেশমি খুব লাল শাড়ি পরতে ভালোবাসে। আজ থেকে এর নাম রেশমি শাক। আর ঐ যে দূরে ছাগলটা দেখছিস, ওটার নাম আজ থেকে বড় দুলাভাই লিমিটেড। সারাদিন শুধু ব্যা ব্যা করে চিল্লায়!

পরদিন সকাল হতেই পুরো এলাকায় হুলুস্থুল পড়ে গেল। নতুন নিয়ম অমান্য করলে জেল-জরিমানা হতে পারে, এই ভয়ে মানুষ আক্ষরিক অর্থেই পাগল হওয়ার জোগাড়।

দুপুরে মন্টু মিয়া বাজারে গিয়ে ইলিয়াস কসাইয়ের দোকানে দাঁড়াল। মন্টু মিয়া আমতা আমতা করে বলল, ভাই ইলিয়াস, আমার বাসায় আজ কুটুম আইব। ভালো দেইখা এক কেজি বড় দুলাভাই লিমিটেড-এর মাংস দাও তো।

ইলিয়াস কসাই বিরক্ত হয়ে বলল, মিয়া ভাই, সকাল থেকে মাথাটা নষ্ট হইয়া আছে। বড় দুলাভাই লিমিটেড-এর মাংস শেষ। আপনি চাইলে আধ কেজি ছোট শ্যালক বাবলু নিয়ে যেতে পারেন।

মন্টু মিয়া অবাক হয়ে বলল, ছোট শ্যালক বাবলু আবার কী?

কসাই ফিসফিস করে বলল, আরে ভাই, দেশি মুরগি! মন্ত্রী সাহেব কাল রাতে ডিক্রি জারি করছে!

এরই মধ্যে রাস্তা দিয়ে এক লোক চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসছে, বাঁচাও! বাঁচাও! লতিফ মিয়ারবড় দুলাভাই লিমিটেড রশি ছিঁড়ে আমার রেশমি শাক-এর খেত খেয়ে ফেলছে!

ঠিক তখনই মন্ত্রী সাহেবের গাড়ি সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। কাচ নামিয়ে মন্ত্রী সাহেব চিৎকার শুনে খুশি হয়ে কুদ্দুসকে বললেন, দেখেছ কুদ্দুস? নাম পরিবর্তনের ফলে এলাকার মানুষের ভাষা কত উন্নত আর পারিবারিক হয়ে উঠেছে! সবাই এখন আমার আত্মীয়দের নাম জপছে।

কুদ্দুস আমতা আমতা করে বলল, তা তো ঠিকই স্যার। তবে একটা ছোট সমস্যা হইছে।

মন্ত্রী ভ্রু কুঁচকে বললেন, কী সমস্যা?

কুদ্দুস কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, স্যার, আপনার বড় ছেলে টুটুল তো রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গেছে।

মন্ত্রী অবাক হলেন, কেন? তাকে তো আমি এই এলাকার সবচেয়ে বড় বটগাছটার নাম দিয়ে সম্মানিত করলাম, টুটুল বৃক্ষ!

কুদ্দুস মাথা চুলকে বলল, স্যার, সমস্যা তো ওইখানেই। আজ সকালে একটা পাগলা কুকুর এসে ওই টুটুল বৃক্ষ-এর গোড়ায় পা তুলে প্রস্রাব করে দিয়েছে। তাই দেখে এলাকার ছোট ছোট ছেলেরা হাসাহাসি করে বলতেছ, দেখ দেখ, কুকুরে কেমন টুটুল ভাইয়ের গায়ে হিসু করে দিল! এই অপমান সইতে না পেরেই টুটুল ভাই রাগ করে ঢাকা চলে গেছে স্যার!

মন্ত্রী সাহেব গাড়ির সিটে ধপ করে বসে পড়লেন। তিনি নিজের কপালে নিজেই একটা থাপ্পড় মেরে বললেন, কুদ্দুস, জলদি মাইক বের কর! এক্ষুনি ঘোষণা দে, বটগাছের নাম বাতিল! ওটার নাম আজ থেকে আমাদের পাশের বাড়ির খলিল মিয়ার নামে হবে!

কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল। বিকেল গড়াতেই মন্ত্রীর ড্রয়িংরুমে এসে হাজির হলেন তার স্বয়ং ধর্মপত্নী, বেগম রাহেলা বানু। তার হাতে একটা বিশাল বেলারুশ বেলন, চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।

রাহেলা বানু চিৎকার করে বললেন, তোমার সাহস তো কম না মফিজ! তুমি নিজের বাপের নামে বাজার রাখলা, ভাইয়ের নামে মাছ রাখলা, বোনের নামে লাল শাক রাখলা! আর আমার ভাগে পড়ল ওই পচা নর্দমাটা? এলাকার মানুষ ওটাকে এখন রাহেলা ড্রেন বলে ডাকছে!

মন্ত্রী সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, আরে বেগম, তুমি ভুল বুঝছ। ড্রেনটা তো এলাকার সবচেয়ে সচল জিনিস, সারাদিন এক মুহূর্তের জন্যও থমকে থাকে না। তোমার চঞ্চল স্বভাবের সাথে মিলিয়েই তো…

চুপ করো! রাহেলা বানু গর্জে উঠলেন। আজ সন্ধ্যার মধ্যে যদি আমার নামে ভালো কিছুর নাম না রাখো, তবে এই বেলন দিয়ে তোমার পিঠের চামড়া আমি আলহাজ্ব সলিমুদ্দিন বাজারের শুঁটকি মাছের মতো শুকিয়ে ফেলব!

মন্ত্রী মহোদয় প্রমাদ গুনলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ কুদ্দুসকে তলব করলেন। কাঁপতে কাঁপতে বললেন, কুদ্দুস! কুদ্দুস রে! জলদি বড় একটা সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি কর। এলাকার যত বড় বড় আর নামী দামী কাঁঠাল গাছ আছে, সব আজ থেকে, রাহেলা বানু বেগম বৃক্ষ!

কুদ্দুস অবাক হয়ে বলল, হঠাৎ কাঁঠাল গাছ কেন স্যার?

মন্ত্রী ফিসফিস করে বললেন, আরে গাধা, কাঁঠাল যেমন বাইরে থেকে সারাদিন খসখসে আর কাঁটাযুক্ত থাকে, কিন্তু ভেতরে রসালো মিষ্টি, ঠিক তোর ভাবীর মতো! তাছাড়া কাঁঠালের আঠা একবার লাগলে যেমন সহজে ছুটে না, তোর ভাবীর ঘ্যানঘ্যানানিও তেমন!

পরদিন সকালে পুরো এলাকায় নতুন লিফলেট বিলি করা হলো। কিন্তু বিধিবাম! দুপুরে এলাকার দুষ্টু ছেলেদের দল সেই রাহেলা বানু বেগম বৃক্ষ অর্থাৎ কাঁঠাল গাছের নিচে গিয়ে ইঁট ছুড়তে শুরু করল। একটা বড় ইঁট গিয়ে লাগল সরাসরি একটা পাকা কাঁঠালের গায়ে। ধপাস করে কাঁঠালটি মাটিতে পড়ে একেবারে ফেটে চৌচির!

সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এলাকার এক মুরুব্বি। তিনি মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ওরে তোরা একি করলি! ইঁট মেরে তোরা রাহেলা বেগমের মাথাটাই ফাটিয়ে দিলি! দেখ কেমন করে মগজ গলে গলে পড়ছে!

এই খবর যখন মন্ত্রীর বাড়ির সোর্স মারফত রাহেলা বানুর কানে পৌঁছাল, তখন মন্ত্রীর ঘরে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া আর কেউ ঠেকাতে পারল না। মন্ত্রী সাহেব এবার নিজের মাথায় দুই হাত দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কুদ্দুসকে বললেন, কুদ্দুস রে, ক্ষমতা পাইয়া নাম বদলাইতে গিয়া আমি নিজেই এখন নিজের নাম ভুইলা যাওয়ার জোগাড় হইছি! এক কাজ কর, কালকে সকালে মাইকিং কইরা দে, এই এলাকায় এখন থেইকা যে যার বাপের দেওয়া নামে ডাকব। আমার পরিবারের নামে কিছু ডাকলে তার খবর আছে!

কুদ্দুস খাতা বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, স্যার, এইটা আপনের জীবনের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল সিদ্ধান্ত হইছে!

১১ পঠিত ... ৩ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top