শুনো হে পুরুষ ভাই সবার উপরে নেটওয়ার্ক সত্য তাহার উপরে নাই

১৫ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে

 

জেলে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আমরা টের পেলাম যে আমাদের সবার Erectile Dysfunction (ED) বা উত্থানজনিত সমস্যা শুরু হয়েছে। আমি তখনও টিনেজার, তাই প্রথমদিকে ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারিনি। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক পর, একদিন কাশিমপুর কারাগার-২ এর যমুনা ভবনের সামনের মাঠে আড্ডা দেওয়ার সময় একজন ডাক্তার বড় ভাই সরাসরি এই প্রসঙ্গ তুললে সেখানে থাকা প্রায় ২০-২৫ জনের প্রত্যেকেই স্বীকার করলো যে সবাই একই সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু আমাদের অধিকাংশেরই জীবনে প্রথমবার জেলে যাওয়া, তাই রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার পাশাপাশি এই ব্যাপারটাও সবাইকে আরও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলছিল।

সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে কথিত আছে—জেলখানার খাবারের সঙ্গে নাকি এমন কিছু ওষুধ মেশানো হয়, যা হাজতি ও কয়েদিদের যৌনশক্তি কমিয়ে দেয়, যেন তারা যৌন চাহিদার কারণে সমকামিতায় জড়িয়ে না পড়ে।

প্রতিদিন ভোরে দিনের প্রথম গণনা শেষে কারারক্ষী যখন ওয়ার্ডের গেট খুলে দিত, তখন বাইরে বের হয়েই টিনেজার থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ সবাই আকার-ইঙ্গিতে একে অপরকে জিজ্ঞেস করত—তার মেশিন মহাকাশে সিগন্যাল পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল কি না। বিষয়টা নিয়ে প্রকাশ্যে, বিশেষ করে সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের সামনে কথা বলা বিব্রতকর ছিল। তাই আমি নেটওয়ার্ক নামে একটা নতুন টার্ম চালু করলাম, যাতে সবাই অকপটে পরস্পরের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয়েছিল যে, জেলের ভেতর দেখা হলেই সবাই একে অপরকে জিজ্ঞেস করত, ভাই, নেটওয়ার্ক পাইছেন? অধিকাংশ সময়ই উত্তর আসত—না। কখনো যদি কারও নেটওয়ার্কের হদিস পাওয়া যেত, সেটা পুরো জেলের সব বিল্ডিং আর ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের টক অব দ্য ডে হয়ে যেত। যেমন—অমুক ইউনিটের তমুক ভাই আজকে নেটওয়ার্ক পাইছে। তখন সবাই সমস্বরে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠত এবং আশায় বুক বাঁধত—এই বুঝি তারও নেটওয়ার্ক ফিরে এলো।

এরই মধ্যে, মাস দেড়েক বা দুয়েক পর, ২০১৩ সালের এপ্রিলের কোনো এক দুপুরে আমাদের হতাশ চোখে একরাশ আশার আলো হয়ে কারাগারে এলেন বৃদ্ধ ময়েজউদ্দীন। আগা-পাছা মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা মানুষটির বয়স প্রায় ১০০ ছুঁইছুঁই, কিন্তু শারীরিক গঠন দেখে তা বোঝার উপায় নেই। তাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, কাজী নজরুল ইসলাম বুঝি এমন কাউকেই দেখে যৌবনের গান লিখেছিলেন।

বৃদ্ধ হলেও ভাবগাম্ভীর্যে ময়েজউদ্দীন ছিলেন একেবারে বাদশাহী ঘরানার মানুষ। কাউকে পরোয়া করার সময় নেই। সমগ্র শরীরে কাপড় বলতে একখানা ছেঁড়া-ফাটা পুরোনো লুঙ্গি, তাও কাছা মারা। গায়ে আর কোনো সুতোর বস্ত্রও নেই। সারাদিন যমুনা ভবনের গেটের বাঁ পাশের বিশ্রামাগারের পেছনে ঘাসের ওপর বসে থাকতেন, আর বিড়বিড় করে রাগত স্বরে কী যেন জপতেন।

জেলখানার সবার কৌতূহল—এত বয়স্ক একজন মানুষ কী কারণে জেলে এলেন? খুব বেশি সময় লাগেনি রহস্য ভাঙতে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই জানা গেল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করা এই ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ ঢাকার ব্যস্ত এলাকাগুলোতে রাস্তার পাশে যৌনরোগের ওষুধ আর যৌনশক্তিবর্ধক টোটকা বিক্রি করতেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ৫৮ বছর বয়স দেখিয়ে তিন মাসের জেল এবং দুই হাজার টাকা জরিমানা করে। সেই শোকে তিনি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা চূড়ান্ত অশ্লীল ভাষায় ম্যাজিস্ট্রেটকে তার পণ্যের অথেনটিসিটি ও গুণগত মান সম্পর্কে অবহিত করার চেষ্টা করতেন।

এদিকে, ময়েজউদ্দীন যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধ বিক্রি করতেন শুনে জেলে থাকা আমাদের মতো প্রথমবারের রাজনৈতিক মামলার আসামিদের কাছে তার কদর বেড়ে গেল। সবাই নানা বাহানায় অর্ধনগ্ন ময়েজউদ্দীনের কাছে ধর্ণা দিতে শুরু করল—হাতে ফল, খাবারদাবার নিয়ে।

কিসের ঢাবি, কিসের বুয়েট, কিসের জাবি! স্বয়ং ঢাকা মেডিকেল থেকে পাশ করা আমাদের সেই ডাক্তার বড় ভাই পর্যন্ত নানা অজুহাতে ময়েজউদ্দীনের সঙ্গে একান্তে দেখা করতে লাগলেন। চৈত্রের ফুটিফাটা গরমে, দুপুরে যোহরের নামাজের পর সবাই ভাতঘুম দিলে আমিও যে দুই-তিনবার ময়েজউদ্দীন পীরের দরগায় হাজিরা দিয়েছি—সেই কথা আজও কাউকে জানতে দিইনি।

বৃদ্ধ ময়েজউদ্দীনকে ঘিরে প্রায়ই বিভিন্ন বয়সের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মজমা বসত। সেখানে তিনি গল্প করতেন—কীভাবে ৯৫ বছর বয়সেও অষ্টাদশী তরুণীদের স্বর্গের সপ্তমে ঘুরিয়ে আনেন। ডজন ডজন অবিশ্বাসী কিন্তু কামাতুর বাঙালি পুরুষ তার গল্প হাঁ করে শুনত। লোকজন যে গল্পগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করত তা নয়; বরং নিজেদের নেটওয়ার্কবিহীন জেলজীবনে, ময়েজউদ্দীনের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে সাময়িক প্রশান্তি খুঁজে নিত।

কাশিমপুর কারাগার-২ এর ৫ নম্বর যমুনা ভবনের সামনেই ছিল বিশাল এক মহুয়া ফুলের গাছ। প্রতিদিন সকালে বের হলেই দেখতাম, গাছের নিচে ফুল ঝরে পড়ে আছে। মহুয়া ফুল থেকে চিনিগুঁড়া চালের পোলাওয়ের মতো মিষ্টি সুঘ্রাণ বের হতো।

একদিন হুট করেই ময়েজউদ্দীন ঘোষণা দিলেন—মহুয়া ফুলের মধু পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যৌনশক্তিবর্ধক। সঙ্গে আরও যোগ করলেন, এইডা এমন জিনিস, একটা খাইলেই ড্রোন খাড়ায়া যাইবো। ঘোষণা শেষ হওয়ার আগেই দেখা গেল, গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুল তো দূরের কথা, ঘাস-মাটি পর্যন্ত কুড়িয়ে নেওয়া নিয়ে মারামারি লেগে গেছে।

ফজরের নামাজের পর গেট খোলামাত্র সবাই দৌড়ে বেরিয়ে যেত। কার আগে কে মহুয়া ফুলের মধু খাবে—তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। এত কিছুর পরও একটা ফুল জোটানো মানে লটারি জেতার মতো ব্যাপার। আমি ছোটখাটো আর জীর্ণশীর্ণ হওয়ায় বরাবরই পিছিয়ে থাকতাম। একদিন অনেক কায়দা করে দুইটা ফুল জোগাড় করলাম। মনে হচ্ছিল, আজ থেকে আর আমার জীবনে No Network Coverage বলে কিছু থাকবে না। কিন্তু বিধি বাম—ফুলের মধু খাওয়ার পর নেটওয়ার্ক দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নিজের দাঁড়িয়ে থাকাই অসম্ভব হয়ে গেল। চোখ-মুখ অন্ধকার হয়ে এলো, মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। প্রায় তিন ঘণ্টা পর উঠে পৃথিবীর সব গালি হাসিনা আর বুড়ো ময়েজউদ্দীনের ওপর উগরে দিলাম।

মহুয়া ফুলের দখলদারিত্ব নিয়ে যখন জেলের যুবসমাজে চরম অস্থিরতা, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন ৬৬ বছর বয়সী মকবুল আঙ্কেল। তিনি ঢাকার একটি থানার জামায়াতের আমির। অত্যন্ত রসিক কিন্তু আন্তরিক মানুষ। সেদিন তিনি গম্ভীর মুখে সবাইকে বললেন, তোমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থী। একজন বাটপার ময়েজউদ্দীনের কথায় মহুয়া ফুল নিয়ে এমন কাণ্ড করা কি মানায়?

আমরা অনেকেই মাথা নত করলেও পেছন থেকে কেউ চাপা গলায় বলে উঠল, মেশিনই যদি না খাড়ায়, মান-ইজ্জত দিয়া কি করমু? আপনের তো মেয়াদ শেষ, আপনে কি বুঝবেন তরুণদের কষ্ট!

তবে আঙ্কেলের কথায় কিছুটা কাজ হয়েছিল। অন্তত প্রকাশ্যে ফুল নিয়ে মারামারি কমে এলো।

কিন্তু পরে আমরা আবিষ্কার করলাম—যিনি সবাইকে মহুয়া ফুল থেকে দূরে থাকতে বলেছিলেন, তিনিই ভোরে কারারক্ষীকে ঘুষ দিয়ে সবার আগে গিয়ে ফুল কুড়িয়ে আনতেন। একদিন নিজের চোখে দেখলাম, তিনি চারপাশ দেখে দুটো ফুল একসঙ্গে মুখে পুরে গিলে ফেললেন। তখন আমাদের মধ্যে গবেষণা শুরু হয়ে গেল—৬৬ বছর বয়সে এই নেটওয়ার্ক দিয়ে তিনি কী করবেন!

এক কান, দুই কান হয়ে খবরটা পুরো জেলে ছড়িয়ে পড়ল। শিবিরের ছেলেদের মধ্যে নতুন উদ্যম দেখা দিল। তারা পালা করে মহুয়া ফুল খাওয়ার গোপন রুটিন পর্যন্ত বানিয়ে ফেলল। কয়েকদিন পর দেখা গেল, শুধু ফুল নয়—গাছের পাতা, ছাল-বাকল পর্যন্ত খেয়ে সাফ করে ফেলছে। কেউ কেউ মহুয়া গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াকও শুরু করল।

শেষমেশ কারা কর্তৃপক্ষ গাছ পাহারার জন্য আলাদা কারারক্ষী নিয়োগ করল। নিয়ম হলো—গাছের কাছে গেলেই মার। কিন্তু তাতেও লাভ হলো না। নিয়মিত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতেই লাগল।

একসময় মনে হলো—দেশ রক্ষার আন্দোলনের সমস্ত ফোকাস যেন মহুয়া গাছ রক্ষার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

অবশেষে, মে মাসের কোনো এক গভীর রাতে, পুরো কাশিমপুর কারাগার ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কারা কর্তৃপক্ষ মহুয়া গাছটি কেটে ফেলে। শুধু কাটেইনি—গোড়া পর্যন্ত উপড়ে নিয়ে গেছে, যেন ভবিষ্যতে আর কখনো সেখানে মহুয়া গাছ জন্মাতে না পারে।

পুরো ঘটনাটা আমার ভেতরে এক অদ্ভুত জীবনবোধের জন্ম দিয়েছিল। আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম—একদল বিপ্লবী মানুষ, যারা দেশের জন্য অকথ্য জেল-জুলুম সহ্য করেও ভেঙে পড়েনি, তারাই একটি মহুয়া গাছ হারিয়ে শোকে মুহ্যমান হয়ে গেছে।

এজন্যই হয়তো কোনো এক মহামনীষী বলেছিলেন—

শোন হে মানুষ ভাই,
সবার উপরে নেটওয়ার্ক সত্য,
তাহার উপরে নাই।

 

১৫ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top