মোঃ রাসেলের নামটা শুধু ‘মোঃ রাসেল’ হওয়ার পেছনে একটা ছোট্ট ট্র্যাজেডি আছে, যেটাকে কমেডি বলেও চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। কারণ কমেডি বলা সহজ, আর ট্র্যাজেডি হজম করা কঠিন।
জন্মের সময় বাবা শখ করে ওর নাম রেখেছিলেন—রাসেল আহম্মেদ চৌধুরী। নামটাতে একটা এলিট ব্যাপার ছিল, আর মনে সূক্ষ্ম আশা ছিল, যেন নামের জোরেই ছেলে বড় হয়ে কমপক্ষে উপজেলা চেয়ারম্যান, না হলে অন্তত থানার ওসি হবে।
কিন্তু এসএসসি ফর্ম পূরণের দিন বেজেরডাঙ্গা আবুল কালাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব হাফিজুল ইসলাম ফর্মের ছোট্ট খোপে ‘রাসেল আহম্মেদ চৌধুরী’ গুঁজতে না পেরে বিরক্ত হয়ে কেটে-কুটে বানিয়ে দিলেন—মোঃ রাসেল।
হাফিজ স্যার নিশ্চয়ই সেদিন ভাবেননি যে তিনি একটা মানুষের গোটা ভবিষ্যৎ পরিচয়টাই একটা ফর্মের ঘরের মাপে বানিয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষকরা প্রায়ই এভাবেই আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেন—খাতার মার্জিনে, বিরক্তি নিয়ে, তাড়াহুড়োয়। আর আমরা সারাজীবন সেই মার্জিনের ভেতরেই বাঁচার চেষ্টা করি।
রাসেলের পুরো জীবনটাও ওই ফর্মের মতোই হয়ে গেল—একটা ছোট্ট ঘর, আর তাতে গুঁজে থাকা বিশাল সব স্বপ্ন, যেগুলো কখনোই ঠিকঠাক আঁটে না।
রাসেল সেলসম্যান ছিল। একটা প্লাস্টিকের বালতি ও মগ কোম্পানিতে। ওর কাজ ছিল মফস্বলের বাজারে বাজারে ঘুরে দোকানদারদের গছানো—ভাই, এই মাসে দুই কার্টন বেশি নেন, কোম্পানি স্পেশাল অফার দিতেছে।
দোকানদাররা হাসিমুখে শুনত, তারপর বলত, রাসেল ভাই, চায়না মালের দাম কম। মানুষ তো দামটাই দেখে, গুণ কে দেখে বলেন? এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় দর্শন—দাম কম হলে গুণ নিয়ে প্রশ্ন করা এখানে পাপ।
তিন মাস টার্গেট মিস করার পর ম্যানেজার সাহেব রাসেলকে ডেকে বললেন, রাসেল ভাই, কিছু মনে কইরেন না, আপনেরে দিয়া আর হইতেছে না। আপনি ভালো মানুষ, কিন্তু ভালো মানুষ দিয়া তো সেলস হয় না।
এই একটা লাইনেই বাংলাদেশের কর্পোরেট দর্শনের পুরোটা ধরা পড়ে—এখানে ক্যারেকটার সার্টিফিকেট আর চাকরির নিরাপত্তা কখনো একসঙ্গে থাকে না।
যাই হোক, ওর চাকরিটা গেল। সঙ্গে গেল কোম্পানির আইডি কার্ড, মাসের প্রায় নিয়মিত একটা বেতন, আর প্রতিবেশীদের সেই সালামের মধ্যে লুকানো সম্মানটুকু, যেটা আসলে চাকরিকে দেওয়া হতো, রাসেলকে নয়।
রাসেলের সংসারে তিনজন মানুষ, আর অসংখ্য দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তার সংখ্যা মানুষের সংখ্যার চেয়ে সবসময় বেশি থাকে—এটাই সংসারের নিয়ম।
ওর বউ সালমা প্রতিদিন সকাল ছয়টায় ওঠে, রান্না করে, বাচ্চা সামলায়, আর রাতে ঘুমানোর আগে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে বোঝার চেষ্টা করে, সে কবে থেকে এতটা বুড়িয়ে গেছে।
কেউ তাকে জিজ্ঞেস করে না, সালমা, তুমি কেমন আছ? সবাই জিজ্ঞেস করে, রাসেল ভাই কেমন আছেন? যেন সালমার অস্তিত্বটা রাসেলের একটা সাবহেডিং মাত্র।
তাদের একমাত্র ছেলে সাব্বির, বয়স চার। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, নন-ভার্বাল অটিজমে আক্রান্ত।
(এই জায়গায় লেখক হিসেবে আমার একটু থামা দরকার। কারণ, পাঠক, এখানে মজা করার কোনো জায়গা নেই।)
সাব্বির কথা বলে না। ঘরে গান বাজলে হাত নাড়ায়, চোখ বন্ধ করে দোলে, যেন কোনো এক অন্য জগতের সঙ্গে তার নিজস্ব একটা তার বাঁধা আছে। যেটা রাসেল বা সালমা কেউই ধরতে পারে না। শুধু দূর থেকে দেখে, আর মনে মনে ভাবে—আমাদের ছেলেটা কী ভাবছে এই মুহূর্তে? কোন জগতে সে থাকে?
ডাক্তার বলেছিলেন থেরাপি লাগবে, নিয়মিত। এখনকার হিসাবে মাসে কমপক্ষে আট-দশ হাজার টাকার মামলা।
প্রতিবেশীরা যখন দেখে, তাদের প্রতিক্রিয়া হয় এই রকম—কেউ বলে, দোয়া কইরেন। কেউ বলে, "আজকাল সবার বাচ্চারই তো একটু সমস্যা থাকে। আগে তো এইসব শব্দও শুনি নাই। এখন সবাই ডাক্তার দেখায় খামাখা।
আর একজন তো সরাসরি বলেই ফেলে, রাসেল ভাই, বিয়ের আগে বাপ-মায়ের গুনাহ থাকলে নাকি এই রকম বাচ্চা হয় মানুষের। বিষয়টা নিয়ে ভাইবেন একটু!
মানুষ বিপদে থাকা মানুষকে সাহায্য না করে তার বিপদের কারণ বিশ্লেষণ করতে খুব পছন্দ করে। এটা আমাদের জাতীয় শখগুলোর একটা, যেটার কোনো ট্যাক্স লাগে না বলে সবাই বিনা দ্বিধায় চর্চা করে।
চাকরি হারানোর পর রাসেল দিনভর বাজারে বাজারে কাজ খুঁজে বেড়াতে লাগল। রাতে বসে থাকত মোবাইলের নীল আলোর সামনে—যে আলোটা এখন গরিব মানুষের একমাত্র প্রার্থনার জায়গা। মসজিদের মিনার আর মোবাইলের স্ক্রিন—দুটোই রাতে আলো দেয়, দুটোতেই মানুষ কিছু চায়।
বাসার অবস্থা তথৈবচ। রাসেলের মাথা প্রায় খারাপ হওয়ার জোগাড়।
এই ঘটনার পাঁচ-ছয় বছর আগে, চাকরি থাকতে থাকতেই, রাসেল শখ করে কিছু ভিডিও বানিয়ে ফেসবুক-ইউটিউবে ফেলে রেখেছিল। বিষয়বস্তু ছিল ভীষণ গ্রাম্যসুলভ—সোজা ভাষায়, খ্যাত মার্কা। যেমন মাটির চুলা বানানো, পুকুরে মাছ ধরা, বাবার আমলের সাইকেল সারানো।
শিরোনামগুলো ছিল বাংলাদেশি ইউটিউবের এক মহান ঐতিহ্যের অংশ—দেখুন কিভাবে ৫০ টাকায় বানাবেন রকেট স্টোভ!! আপনি হয়তো জানেন না!!, গ্রামের এই পুকুরে যা পাওয়া গেল দেখলে অবাক হবেন!!, ৩০ বছরের পুরোনো সাইকেল ২০ মিনিটে ঠিক কইরা ফালাইলাম, দেখেন কেমনে।
প্রতিটা শিরোনামে অন্তত দুইটা বিস্ময়সূচক চিহ্ন বাধ্যতামূলক, যেন বিস্ময়সূচক চিহ্ন কম দিলে ভিডিওর মান কমে যাবে।
এসব কনটেন্টে ভিউ আসত না বললেই চলে—দুইশ, তিনশ, ভাগ্য ভালো থাকলে সাতশ। রাসেলের ছোট ভাই একবার হেসে বলেছিল, ভাইজান, আপনের চ্যানেলের নাম রাখা উচিত ছিল ইউটিউব ২০১২। আপনে সময়ের চেয়ে বারো বছর পিছায়ে আছেন।
রাসেল হেসেছিল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানত, কথাটায় সত্যতা আছে। একসময় ভিডিও বানানোই বন্ধ করে দিল। চ্যানেলটা পড়ে রইল পুরোনো আলমারির মতো, যেটা কেউ খোলে না, আবার ফেলেও দেয় না।
চাকরি হারানোর মাসখানেক পর, এক রাতে, চাল-ডালের হিসাব করতে করতে ঘুম আসছিল না। রাসেল এমনি এমনি নিজের পুরোনো চ্যানেলে ঢুকল। আর তখনই তার চোখ কপালে উঠল—চশমা ছাড়াই।
একে তো রাসেলের চশমা লাগে না, কিন্তু এই মুহূর্তে যদি লাগত, তাহলেও সেটা খুলে পড়ে যেত। পাঁচ বছর আগের সাইকেল সারানোর ভিডিওতে ভিউ দাঁড়িয়েছে বিয়াল্লিশ লাখ!
রাসেল প্রথমে ভাবল, ওর অ্যাকাউন্ট নিশ্চয়ই হ্যাক হয়েছে। সে রিফ্রেশ দিল। আবার দিল। সংখ্যা বাড়ছেই, যেন সংখ্যাটার নিজেরও তাড়া আছে কোথাও পৌঁছানোর।
কমেন্টবক্সে সারা পৃথিবী থেকে মানুষ এসে হাজির। কেউ লন্ডন থেকে ইংরেজিতে লিখছে, This man's energy is unmatched. কেউ সিডনি থেকে লিখছে, Bro fixed a bike like he's defusing a bomb .একজন ফিলিপিনো লিখেছে, এই লোকটার মুখের এক্সপ্রেশন আমার সারাদিনের মুড ঠিক করে দিল।
রাসেল বসে বসে ভাবছিল, আমি তো শুধু একটা ঝরঝরে সাইকেলের চেইন ঠিক করেছি, এতে এক্সপ্রেশন কোথায় পেল এরা? কিন্তু ইন্টারনেট কখনো ব্যাখ্যা চায় না, শুধু রায় দেয়।
পরের দুই সপ্তাহে ওর চ্যানেলের পুরোনো সব ভিডিও একে একে ভাইরাল হতে লাগল। মাটির চুলার ভিডিওতে দুই কোটি ভিউ। পুকুরের মাছ ধরার ভিডিওতে সাড়ে তিন কোটি।
ইউটিউব থেকে ইমেইল এল—Congratulations, your channel has been accepted into the YouTube Partner Program. তারপর সিলভার প্লে বাটন, তারপর গোল্ড।
মেটা থেকেও একটা ক্রিয়েটর বোনাস-এর নোটিফিকেশন এল। অঙ্কটা দেখে রাসেল তিনবার চোখ কচলে আবার দেখল। তারপর সালমাকে ডেকে দেখাল। সালমা দেখেও বিশ্বাস করল না। বলল, এইটা নিশ্চয়ই কোনো প্রতারণা। তুমি ব্যাংকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো।
ব্যাংকের অফিসার টাকা দেখে রাসেলের দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেভাবে আগে কখনো তাকাননি। সেই দৃষ্টিটা বাংলাদেশে সম্মান নামে পরিচিত, যেটার মূল উপকরণ ব্যাংকে আপনার কত টাকা আছে, পার্সোনালিটি নয়।
ওর সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা আসতে লাগল—হাজার থেকে লাখ, লাখ থেকে এমন অঙ্কে, যা রাসেল আগে স্বপ্নেও দেখেনি।
যে প্রতিবেশীরা আগে সেলসম্যানের পোলা বলে নাক সিঁটকাত, তারাই এখন এসে বলে, রাসেল ভাই, আমাদের বাড়িতেও একদিন আইসেন, একটু ভিডিও কইরেন। আমাদের আমের বাগানটাও তো সুন্দর।
মানুষের সম্মানবোধের এই দ্রুত রূপান্তরটা দেখে রাসেলের একবার মনে হয়েছিল, এই যে সবাই এখন তাকে সালাম দিচ্ছে, এই সালামগুলো আসলে তাকে নয়, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নোটিফিকেশনকে দেওয়া হচ্ছে।
(এখানে গল্পের মাঝখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। কারণ, পাঠক নিশ্চয়ই এতক্ষণে জিজ্ঞেস করছেন—কেন হঠাৎ এই ভাইরাল হওয়া?)
রাসেল নিজেও সেটা জানত না। সাধারণ, সাদামাটা, কোনো এডিটিং ট্রিক ছাড়া ভিডিওগুলো কীভাবে হঠাৎ অর্ধেক পৃথিবীর ফিডে চলে গেল, তার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারল না।
ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ সেজে একজন ইউটিউবার এই নিয়ে চল্লিশ মিনিটের একটা ভিডিও বানাল—রাসেলের ভাইরাল হওয়ার আসল রহস্য ফাঁস!! ভিডিওর শেষে দেখা গেল, তারও কোনো ধারণা নেই। শুধু চল্লিশ মিনিট ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অথেনটিসিটি শব্দটা বলল, যেন শব্দটা বললেই রহস্যের সমাধান হয়ে যায়।
কেউ বলল, এআই অ্যালগরিদম নাকি এখন 'রিয়েল' জিনিস খুঁজছে। বানোয়াট জিনিসে মানুষ বিরক্ত।" কেউ বলল, "আল্লাহর রহমত। বান্দার কষ্ট দেখে আল্লাহ রহম করছেন।
রাসেলের মা বললেন, তোর নানার রুহ তোর জন্য দোয়া করতেছে, বাবা। আমি স্বপ্নেও দেখছি।
রাসেলের এক দূরসম্পর্কের চাচা বললেন, তাবিজ করাইছিলাম না তোরে? ওইটার কামাল।
প্রত্যেকের কাছে একটা ব্যাখ্যা আছে, আর প্রত্যেকটা ব্যাখ্যাই আসলে নিজের বিশ্বাসের বিজ্ঞাপন।
রাসেল নিজে মনে মনে ভাবত—যেন সোশ্যাল মিডিয়ার নিজেরই একটা মন আছে, একটা রহস্যময় ইচ্ছাশক্তি, যে হঠাৎ ঠিক করে ফেলেছিল এই মানুষটাকে এখন ভাইরাল করাতেই হবে। কাউকে কোনো কারণ না জানিয়ে, জাস্ট একটা সিদ্ধান্ত।
প্রশ্নের উত্তর কেউ পেল না। রাসেল নিজেও না। রহস্যটা রহস্যই থেকে গেল। আর ভালোই হলো, কারণ বাংলাদেশে রহস্য না থাকলে মানুষ নিজেই একটা বানিয়ে নেয়, তারপর সেটা নিয়ে মারামারি করে।
টাকা এলে মানুষ বদলায়—এই কথাটা এত পুরোনো যে মানুষ এখন এটা শুনলে হাই তোলে। কিন্তু পুরোনো কথাগুলো এমনি এমনি পুরোনো হয় না। ওগুলো সত্যি বলেই বারবার প্রমাণিত হতে থাকে, প্রতিটা প্রজন্মে নতুন করে।
রাসেলও বদলে গেল। প্রথম ছয় মাসে সে সাব্বিরের থেরাপি শুরু করাল, সালমাকে একটা টেইলারিং দোকান আর একটা ফোন কিনে দিল, বাড়ির টিনের ছাদের বদলে পাকা ছাদ তুলল।
(এই অংশটুকু পর্যন্ত গল্পটা সুন্দর, এমনকি একটু মধুরও। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হলে সেটা বাস্তব জীবনের গল্প হতো না, হতো কোনো এনজিওর বার্ষিক প্রতিবেদন।)
রাসেলের মাথায় ঢুকে গেল—আমি তো এখন বড় কনটেন্ট ক্রিয়েটর। আরও বড় কিছু, অদ্ভুত কিছু বানাই।
এই একটা বাক্যেই বাংলাদেশের নতুন ধনিক শ্রেণির গোটা দর্শন লুকিয়ে আছে—টাকা এলেই মানুষ ভাবে, সে হঠাৎ প্রতিভাবান হয়ে গেছে। অথচ ভেবে দেখে না, আসলে সে শুধু সময়মতো সঠিক জায়গায় ছিল।
মোঃ রাসেল এরপর প্রাঙ্ক ভিডিও বানানো শুরু করল, যেখানে তেমন প্রাঙ্ক ছিল না, শুধু চিৎকার আর বানোয়াট নাটক।
ট্রেন্ডিং গান বাজিয়ে অর্থহীন নাচের ভিডিও বানাল, যেখানে তার হাত-পা এমনভাবে নড়তে থাকে, যেন সে ইলেকট্রিক শক খাচ্ছে। অথচ ক্যাপশনে লেখা—নতুন ট্রেন্ড!! ট্রাই করেন!!
একটা AI দিয়ে বানানো থাম্বনেইলে নিজের মুখ দশগুণ বড় করে বসাল। চোখ কপালে তোলা, মুখ হাঁ করা—যাকে ইউটিউবের ভাষায় বলে ক্লিকবেইট ফেইস। যে ফেইসটা দেখলে মনে হয়, মানুষটা হয় বড় কোনো লটারি জিতেছে, নয়তো ভূত দেখেছে। যদিও দুটোর কোনোটাই সত্যি নয়।
ভিডিওর টাইটেল দিল, আমার সাথে যা হলো তা দেখলে আপনি কাঁদবেন!! (পার্ট ১) অথচ ভিডিওতে রাসেল শুধু একটা রেস্টুরেন্টে বসে বিরিয়ানি খেয়েছে। কান্নার একমাত্র কারণ ছিল বিরিয়ানিতে ঝাল বেশি হয়ে যাওয়া।
তার আশেপাশে তখন হঠাৎ দুইজন ম্যানেজার জুটে গেল, একজন কনসালট্যান্ট জুটল। তারা সবাই বলত, "ভাই, কনটেন্ট আরও অ্যাগ্রেসিভ করতে হবে। রিচের জন্য এখন এইটাই দরকার।" অথচ তাদের নিজেদের কারোরই কোনো চ্যানেল ছিল না।
বাংলাদেশে সবচেয়ে সহজ কাজ হলো সফল মানুষকে উপদেশ দেওয়া। তার জন্য কোনো যোগ্যতা লাগে না, শুধু মুখ চালু থাকলেই চলে।
কয়েক মাসের মধ্যে ওর ভিডিওতে রিচ কমতে শুরু করল। ভিউ নেমে এল লাখ থেকে হাজারে, হাজার থেকে শয়ে।
কমেন্টে লোকজন লিখতে লাগল, ভাই, আগের রাসেল কই গেল?, এখন তো একদম অন্য মানুষ মনে হয়। প্লিজ, পুরোনো রাসেল ফিরায়া দেন।
ইউটিউব থেকে বোনাসের ইমেইল আসা বন্ধ হয়ে গেল। মেটার সেই অ্যাওয়ার্ডের সার্টিফিকেটটা এখন ঘরের কোণে ধুলো জমছে, যেমন একদিন তার চ্যানেলটাও জমেছিল।
আর প্রতিবেশীরা? তারা যথারীতি বদলে গেল। কারণ, প্রতিবেশীদের বদলটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জিনিস এই পুরো গল্পে।
যারা কয়েক মাস আগে বলছিল, আমাদের বাড়িতে একদিন আইসেন, তারাই এখন চায়ের দোকানে বসে বলছিল, কইছিলাম না, হুট কইরা বড়লোক হইলে মাথা ঠিক থাকে না। রাসেলের কপালে সুখ সইল না।
মানুষ অন্যের পতনে যতটা তৃপ্তি পায়, তার উত্থানে ততটা পায় না। এইটা আমাদের সমাজের একটা লুকানো, কিন্তু ভীষণ নির্ভরযোগ্য পাটিগণিত।
রাসেল বুঝল, ম্যাজিকের থলি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আর ফুরানোর কারণটাও বুঝল—সে নিজের গল্প বলা বন্ধ করে বাজারের চাহিদামতো গল্প বলা শুরু করেছিল।
এই বোঝাটা দেরিতে এসেছে। কিন্তু জীবনের বেশিরভাগ বোঝাপড়াই দেরিতে আসে। আমরা শুধু ভান করি যে সময়মতো এসেছে।
তাই সে আবার আগের মতো ভিডিও বানাতে শুরু করল। গ্রামের মেলা, পুরোনো রাজবাড়ি, নৌকা বাইচ। কিন্তু এবার আশ্চর্যের ব্যাপার—সব ভিডিও আর ভাইরাল হলো না। কিছু চলল, কিছু চলল না।
থলিটা যেন বুঝে গিয়েছিল রাসেল একবার লোভ করেছিল। তাই এখন হাত পুরো খুলে দেয় না, একটু মেপে মেপে দেয়। ঠিক যেভাবে একটা প্রতারিত মানুষ দ্বিতীয়বার বিশ্বাস করে, কিন্তু আগের মতো পুরোপুরি নয়।
এই সময়টায় ওর ছেলে সাব্বির নিয়মিত থেরাপিতে যেতে শুরু করেছে। কথা এখনও বলে না। কিন্তু একদিন রাসেলকে সাইকেল ঠিক করতে দেখে ছেলেটা হঠাৎ হাততালি দিয়ে উঠল—প্যাঁচ কষে চেইন লাগানোর ঠিক মুহূর্তে।
রাসেল কয়েক সেকেন্ড নড়তে পারল না। তার জীবনে যত ভিউ, যত লাখ-কোটি সংখ্যা, যত Impressive কমেন্ট এসেছে, তার কোনোটাই এই একটা হাততালির সমান ছিল না।
এটা কোনো অ্যালগরিদম মাপতে পারবে না। কারণ, এর কোনো মেট্রিক নেই, কোনো ড্যাশবোর্ড নেই। শুধু একজন বাবার বুকের ভেতর একটা জায়গা আছে, যেখানে এই শব্দটা সারাজীবনের জন্য রেকর্ড হয়ে গেল।
সালমা রান্নাঘর থেকে এই দৃশ্য দেখে চুপচাপ ফিরে গেল চুলার কাছে। কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল না, সে কী অনুভব করছে। কেউ কখনো করে না।
যে মানুষটা প্রতিদিন সংসারের ঘানি টানে, তার অনুভূতির কোনো থাম্বনেইল হয় না, তার কোনো ভাইরাল হওয়ার সুযোগ নেই। সে শুধু চুলার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, নীরবে, প্রতিদিন, যত দিন না তার হাড় ক্ষয়ে যায়।
(পাঠক, এতক্ষণে আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন গল্পটা শেষ হয়ে গেছে। আসলে হয়নি। জীবনের গল্প কখনো ঠিকঠাক শেষ হয় না। শুধু লেখক কলম রেখে দেন, কারণ পাতা ফুরিয়ে যায়।)
ছোটবেলায় আমরা যে যাদুর থলির গল্প শুনতাম, তাতে একজন গরিব মানুষ একটা থলি পেত। হাত ঢোকালেই টাকা বেরোত, যত খরচ করুক, থলি খালি হতো না।
তারপর লোকটা লোভী হয়ে যেত, থলিটা হারিয়ে যেত, আর সে ফিরে যেত আগের গরিবিতে। তবে এবার একটা বাড়তি জিনিস সঙ্গে নিয়ে—পাড়ার লোকের কটাক্ষ শোনার অভিজ্ঞতা।
গল্পটা পুরোনো, কিন্তু থলিটা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে। মানুষ ভাবে, থলিটা তার নিজের কামাই। আসলে থলিটা কারোর একার না, ভাই।
ও একটা মেজাজি জিনিস—আজ দেয়, কাল কাড়ে। কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না। ঠিক যেমন এই দেশের সিস্টেম কাউকে জবাবদিহি করে না।
রাসেল শিখেছে একটা জিনিস—সাফল্য যখন আসে, বুঝবেন না যে আপনি হঠাৎ করেই জিনিয়াস হয়ে গেছেন। ওইটা আপনার কাছে একটা অতিথি। যেকোনো সময় চলে যেতে পারে।
আর যখন চলে যায়, ভেবে নেবেন না যে আপনি একেবারে ফেলনা হয়ে গেছেন। প্রতিবেশীর কথায় কান দেবেন না। তারা তখনও চা খেতে খেতে আপনাকে নিয়ে কথা বলবে, যখন আপনি থাকবেন না, তারাও থাকবে না। কিন্তু গল্পটা ঠিকই চলতে থাকবে, অন্য কারোর নাম দিয়ে।
আপনার আসল উপার্জন হলো, ঘরে ফিরে যে হাততালিটা পান, সেইটা। ওইটা কোনো অ্যালগরিদম কেড়ে নিতে পারে না, কোনো ব্যাংক জব্দ করতে পারে না, কোনো প্রতিবেশী চুরি করতে পারে না।
জীবনের প্রতিটা বাঁকে বাঁকে মানুষ খাবি খায়—চাকরি চলে যায়, বন্ধু বদলায়, ভাগ্য দোলে, আত্মীয়-প্রতিবেশীর মুখ বদলায় সকাল-বিকাল।
কিন্তু যে মানুষ আগেই সব হারানোর অভ্যাস করে ফেলেছে, তার নতুন করে হারানোর তেমন কিছুই থাকে না। আর সেইটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি, যেটা কোনো ভাইরাল ভিডিও দিয়ে বোঝানো যায় না।
আর হ্যাঁ, নিজের নামটা যেমনই বদলে দিক অন্যে, জীবনের গল্পটা নিজের মতো করেই বলা উচিত। শর্টকাটে হয়তো নাম কাটা যায়, ফর্মের ছোট্ট খোপে গুঁজে দেওয়া যায়—কিন্তু গল্প কাটা যায় না। কারণ, গল্পের কোনো নির্দিষ্ট খোপ নেই।



পাঠকের মন্তব্য