পৃথিবীর দুর্গম পথ পাড়ি দিতে যাদের ক্লান্তি নেই, যাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে, সেই বিশ্বভ্রমণকারীদের তালিকায় শীর্ষ নাম ইবনে বতুতা। তবে আধুনিক ফুটবলের উন্মাদনায় ঢাকা পড়ে গেছে সেই মধ্যযুগীয় পর্যটকের সব অর্জন।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উত্তাপের মাঝে ইবনে বতুতা নিজেই এক অভাবনীয় ইচ্ছা প্রকাশ করে জানিয়েছেন—আগামী জন্মে তিনি একজন ‘ব্রাজিল সমর্থক’ হিসেবেই পৃথিবীর বুকে ফিরতে চান।
ঘটনার সূত্রপাত ব্রাজিলের অকাল বিদায়ে। সেলেসাওরা নকআউট পর্বে ছিটকে যাওয়ার পরপরই তাদের সমর্থককূল যেভাবে দেশান্তরী হয়েছে, তা দেখে স্তম্ভিত স্বয়ং ইবনে বতুতা। তিনি লক্ষ্য করেছেন, প্রিয় দল বাদ পড়ার পর ব্রাজিল ভক্তরা থেমে নেই। তারা এখন পর্তুগাল থেকে শুরু করে সুইজারল্যান্ড, ইজিপ্ট, ইংল্যান্ড এবং স্পেনের প্রতিটি গ্যালারিতে হাজির হচ্ছেন—শুধুমাত্র আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গলার জোর খাটানোর জন্য।
নিজের দীর্ঘ ভ্রমণ জীবনে এমন অদ্ভুত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিব্রাজক দল আগে কখনো দেখেননি বলে মন্তব্য করেন মরক্কোর এই কিংবদন্তি পর্যটক।
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইবনে বতুতা বলেন, আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি জ্ঞান অর্জন ও পৃথিবীর বৈচিত্র্য দেখার জন্য। কিন্তু ব্রাজিল সমর্থকদের এই বিশ্বভ্রমণ আমার ধারণার অতীত। তারা বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ছুটছে, কিন্তু তাদের লক্ষ্য কোনো নতুন সংস্কৃতি জানা নয়; বরং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার হার নিশ্চিত করা। আমার লেখা ‘রিহলা’য় এত বৈচিত্র্যময় পাগলামি আমি স্থান দিতে পারিনি।
ইবনে বতুতা আরও যোগ করেন, একজন ভ্রমণবিলাসী হিসেবে আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, ব্রাজিলের সমর্থকরা যেভাবে স্টেডিয়াম থেকে স্টেডিয়ামে নিজেদের পতাকাকে পর্তুগাল কিংবা স্পেনের জার্সির আড়ালে লুকিয়ে আর্জেন্টিনার পরাজয় কামনায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তা আমার সব ভ্রমণকে তুচ্ছ করে দেয়। এমন অদম্য আবেগ এবং এত মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার ক্ষমতা কেবল একজন ব্রাজিল সমর্থকেরই থাকতে পারে।
ফুটবল পণ্ডিতরা মনে করছেন, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এই চিরস্থায়ী বৈরিতা কেবল মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন একপ্রকার ‘ট্রাভেল অ্যাডভেঞ্চার’-এ পরিণত হয়েছে। আর সেই অ্যাডভেঞ্চারের শীর্ষ নায়ক হিসেবেই ইবনে বতুতা এখন নিজেকে ব্রাজিল ভক্তের কাতারে দেখার স্বপ্ন দেখছেন।
পর্যটকের ভাষায়, নিজের জীবনের ৩০ বছর পথে কাটিয়েছি, কিন্তু ব্রাজিলের ভক্তদের মতো এত বড় গন্তব্যহীন লক্ষ্য নিয়ে কেউ ভ্রমণ করতে পারে—এটা আমার কাছে পরম বিস্ময়। তাই পরবর্তী জন্মে নতুন কোনো দেশ দেখার চেয়ে, ব্রাজিল সমর্থকদের এই আবেগী মিছিলে শামিল হওয়াই হবে আমার শ্রেষ্ঠ অর্জন।
বিশ্বকাপের বর্তমান আবহে ইবনে বতুতার এই ‘ভ্রমণ-স্বীকৃতি’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যটকের জ্ঞান আর ভক্তদের আবেগ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ফুটবল যে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছে, তা হয়তো ইতিহাসেও লেখা থাকবে!


