The Benazir File

৭৪ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতি নদী। ১৯৬৩ সালের অক্টোবরের এক তারিখে সেই নদীর হাওয়া গায়ে মেখে যে ছেলেটা পৃথিবীতে এসেছিল, কে জানত সে একদিন খবরের কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে থাকবে? সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার, বনেদি চালচলন। ছেলে বড় হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের বারান্দায় হাঁটল। শেক্সপিয়র-ওয়ার্ডসওয়ার্থের রোমান্টিকতা গিলল। কিন্তু জীবন তো আর কবিতা নয়, জীবন হলো খাকি উর্দির কঠিন বাস্তবতা।

১৯৮৮ সাল। বিসিএস দিয়ে পুলিশে ঢুকলেন বেনজীর আহমেদ। কাঁধে উঠল তারকা, চওড়া হলো বুক।

তারপর? তারপর ক্ষমতার অলিন্দে শুধু ওপরে ওঠার গল্প। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার হলেন, র‍্যাবের ডিরেক্টর জেনারেল হলেন, শেষমেশ পুলিশের সর্বোচ্চ গদি, আইজিপি পদটাও ধরা দিল। তখন রাজপথে তাঁর বুটের আওয়াজে মাটি কাঁপত। যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়, গোপালগঞ্জের বেনজীর মানেই তখন প্রবল প্রতাপ, একচ্ছত্র আধিপত্য।

ক্ষমতা তো একটা বুদবুদ, ভাই। যখন ওপরে ওঠে, তখন রঙিন দেখায়। কিন্তু বাতাস একটু জোরে বইলেই ঠাস করে ফেটে যায়।

২০১৩ সালের মে মাস। মতিঝিলের শাপলা চত্বর। হেফাজতে ইসলামের হাজার হাজার কর্মী বসে আছে। চারদিকে টানটান উত্তেজনা। বেনজীর আহমেদ তখন ডিএমপি কমিশনার। লাঠি চলল, টিয়ারশেল উড়ল, আলো নিভে গেল। বাতাসে ভেসে বেড়াল বারুদের গন্ধ।

আজ এত বছর পর, সেই শাপলা চত্বরের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর পিছু নিয়েছে। প্রসিকিউশনের খাতা বলছে, ওই দুদিনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা মিলিয়ে অন্তত ৫৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের নামের পাশে এখন আসামি হিসেবে জ্বলজ্বল করছে বেনজীর আহমেদের নামও।

শুধু কি শাপলা চত্বর? র‍্যাবের আয়নাঘর আর টিএফআই সেলের গুমের কাহিনি নিয়েও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে। ১৭ জন আসামির ভিড়ে তিনিও একজন।

ডিগ্রি জিনিসটা বড় অদ্ভুত। মানুষের নামের আগে ডক্টর (ড.) বসলে কেমন যেন একটা বনেদি ভাব আসে। বেনজীর সাহেবেরও শখ হলো। ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিবিএ) ডিগ্রি বাগিয়ে নিলেন। নামের আগে যুক্ত হলো ‘ডক্টর’।

কিন্তু বিধি বাম! ক্ষমতার তাসের ঘর ভাঙতেই জানা গেল, যেই কোর্সে ভর্তি হতে সব পরীক্ষায় অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর লাগে, সেই যোগ্যতাই নাকি তাঁর ছিল না! নিয়ম ভেঙে, শর্ত শিথিল করে তাঁকে ভর্তি করানো হয়েছিল। শেষমেশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁর সেই সাধের ডিগ্রি স্থগিত করে দিল।

পাসপোর্ট বানাতে গিয়েও একই কাণ্ড। ২০১৬ সালে যখন র‍্যাবের মহাপরিচালক, তখন সরকারি পরিচয় লুকিয়ে সাধারণ বেসরকারি চাকরিজীবী সেজে পাসপোর্ট করালেন। পাসপোর্ট অফিস আপত্তি তুলতেই র‍্যাব সদর দপ্তর থেকে গেল চিঠি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বাসায় গিয়ে ছবি আর আঙুলের ছাপ নিয়ে পাসপোর্ট দিয়ে আসা হলো তাঁকে।

আইন সবার জন্য সমান, তবে কারও কারও জন্য একটু বেশি সমান, তাই না?

২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভ তখনও কমেনি। ২০২২ সালে জাতিসংঘের সম্মেলনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক গেলেন ঠিকই, কিন্তু মার্কিন মুলুকের অন্য কোথাও পা রাখার অনুমতি পেলেন না।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যখন খাতা-কলম নিয়ে বসল, তখন তাদের চোখ চড়কগাছ। বেনজীর, তাঁর স্ত্রী জীশান মীর্জা আর দুই মেয়ে—ফারহীন আর তাহসীন। পুরো পরিবার যেন একটা আলাদিনের জাদুর প্রদীপ পেয়ে বসেছিল। চার চারটি মামলা ঠুকে দিল দুদক। হিসাব বেরোল—৭৪ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ!

নিজের নামে ৯ কোটি, স্ত্রীর নামে ৩১ কোটি, মেয়েদের নামে আরও কোটি কোটি। গুলশানে ৪টি আলিশান ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ১৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার। ব্যাংকে টাকা যেন উপচে পড়ছে, আর সাধারণ মানুষ তখন বাজারের থলি হাতে দামের চোটে কাঁপছে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আনন্দ হাউজিং সোসাইটি। সেখানে এক গরিব মানুষের ৫৫ শতাংশের একটি জলাশয় ছিল। জোর করে বালু ভরাট করে তা দখল করা হলো, তারপর ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় কিনে নেওয়া হলো। ২৪ কাঠা জায়গার ওপর খাড়া হয়ে গেল ডুপ্লেক্স প্রাসাদ। কার বাড়ি? বেনজীর সাহেবের কন্যার বাড়ি!

গোপালগঞ্জের বৈরাগীটোল গ্রাম। মাদারীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা। সেখানে যুগ যুগ ধরে বাস করে আসছিল কিছু সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার। বেনজীর সাহেবের নজর পড়ল সেইসব জমির দিকে। তারপর শুরু হলো ‘ভয় দেখানোর’ এক নীরব খেলা।

জমির মালিকরা বলছেন, জমি বিক্রি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো রাস্তা ছিল না, ভাই। ভয়, জোর আর নানা কৌশলে আমাদের ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

সেখানে গড়ে উঠল ৬০০ বিঘার এক রাজকীয় সাম্রাজ্য, সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক। সাধারণ মানুষের কান্না দিয়ে তৈরি হলো বিলাসী বিনোদনকেন্দ্র। কিন্তু প্রকৃতির একটা নিজস্ব বিচার আছে না? ২০২৪ সালের জুনে আদালত আদেশ দিল, সব ক্রোক করো। গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন গিয়ে সেই পার্কের নিয়ন্ত্রণ নিল। সাইনবোর্ড বদলে গেল, কিন্তু মাটির ভেতরের কান্না কি এত সহজে মুছে?

২০২৪ সালের মে মাস। চারদিকে তখন ফিসফাস, দুদকের ফাইল নড়াচড়া করছে। বেনজীর সাহেব বুঝলেন, বাতাস গরম। ব্যাংকের ১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার ঋণ তোলা হলো, কিন্তু কোথায় বিনিয়োগ হলো তার কোনো হদিস নেই। ৪ মে, সবার চোখ এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে সপরিবারে দেশ ছাড়লেন তিনি।

তার ঠিক তিন মাস পর, ৫ আগস্ট। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সেই প্রবল প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতার ছাতাটা মাথা থেকে সরে যেতেই বেনজীর সাহেব হয়ে গেলেন ফেরারি আসামি। আদালত থেকে এলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। জারি হলো ইন্টারপোলের রেড নোটিশ।

অন্তর্বর্তী সরকার গেল, তারপর এলো বিএনপি সরকার। চার মাসের মাথায়, আজ রবিবার সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বোমাটা ফাটালেন।

১২ জুন। দুবাইয়ের ঝলমলে আলো, বুর্জ খালিফার ছায়া। কিন্তু আইন এবার আর চব্বিশ ঘণ্টায় পাসপোর্ট দেওয়ার মতো নরম হলো না। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ ঠিকই খুঁজে নিল সাবেক এই আইজিপিকে। খটাস করে পড়ল হাতকড়া।

যে মানুষটার ইশারায় একসময় একটা দেশের পুলিশ বাহিনী চলত, সেই মানুষটার জন্যই এখন অপেক্ষা করছে একটা প্রিজন ভ্যান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

দেশে ফিরলে তাঁর জন্য লাল গালিচা থাকবে না, থাকবে মামলার পাহাড়। মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি, জমি দখল, অর্থ পাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতি। অভিযোগের তালিকাটা এত লম্বা যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সাবেক পুলিশ প্রধানের বিরুদ্ধে এমন নজির আর নেই।

মধুমতির জল এখনো বয়ে যায়, কিন্তু ক্ষমতার অহংকার আর সাভানা রিসোর্টের জৌলুস আজ খাঁ খাঁ করছে। ক্ষমতা চিরদিন থাকে না, ভাই; কিন্তু পাপের খতিয়ানটা ঠিকই থেকে যায়।

 

৭৪ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top