গাছবাবা

৭৭ পঠিত ... ১৫:০০, জুন ০৭, ২০২৬

 

মোড়ল বাড়ির পেছনে একটা শতবর্ষী বটগাছ গত সপ্তাহের কালবৈশাখীতে ধপাস করে আছাড় খেয়েছিল। গাছটা পড়ার পর গ্রামের অন্য সবার চেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন মোড়ল মিয়া। এত বড় গাছের কাঠ বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা পকেটে ভরবেন, সেই স্বপ্নে তাঁর রাতে ঘুম হচ্ছিল না। পরদিনই তিনি কাঠুরে ডেকে ডালপালা সব কাটিয়ে সাবাড় করে ফেললেন।

কিন্তু আসল খেলা শুরু হলো বিকেলে। কাঠুরেরা যখন গাছের ভারী গুঁড়িটা কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠল। ডালপালা কেটে ফেলায় গাছের ওপরের অংশের ওজন কমে গিয়েছিল, অথচ মাটির নিচে থাকা বিশাল মূল বা শিকড়গুলো তখনো স্প্রিংয়ের মতো টানটান হয়ে ছিল। ওজনের ভারসাম্য বদল হতেই পুরো গাছের গুঁড়িটা ক্যাঁক-ক্যাঁক শব্দ করে একদম রকেটের গতিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল!

ব্যস, আর যায় কোথায়! ঘটনা দেখে কাঠুরেরা কুড়াল ফেলে ‘ভূত! ভূত!’ বলে দিল দৌড়। কিন্তু গ্রামের স্বঘোষিত বিজ্ঞানী, ধর্মবেত্তা ও বিশেষজ্ঞরা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে গেলেন।

গ্রামের মুরুব্বি কাসেম আলী গাছের গোড়ায় লাল কাপড় জড়াতে জড়াতে বললেন,
আরে মিয়া, এটা কোনো সাধারণ ঘটনা না! এটা অলৌকিক মোজেজা! গাছ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে বলছে।

পাশ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া কলেজের ছাত্র সন্টু চশমাটা ঠিক করে বলল,
চাচা, এটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে রুট সিস্টেমের ইলাস্টিক রিকভারি বা ভারসাম্য পরিবর্তন...

সন্টুর কথা শেষ হওয়ার আগেই কাসেম আলী ধমক দিলেন,
রাখ তোর বিজ্ঞান! বেশি পড়াশোনা করে মাথাটা গেছে। গাছ কি তোর ফিজিক্সের বই পড়ে খাড়া হইছে?

কাঠ বিক্রি করতে না পেরে মোড়ল মিয়া প্রথমে একটু মনক্ষুণ্ন হয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে তাঁর ব্যবসায়ী বুদ্ধি চাঙ্গা হয়ে উঠল। তিনি দ্রুত গাছটার চারপাশে বাঁশের বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

পরদিন সকাল হতেই মোড়ল মিয়া গাছের সামনে একটা বড় টিনের বাক্স বসিয়ে দিলেন। বাক্সের গায়ে চুন দিয়ে লেখা হলো: অলৌকিক সোজা হওয়া গাছের উন্নয়ন তহবিল। মুক্তহস্তে দান করুন।

মোড়ল মিয়া লাউডস্পিকারে ঘোষণা করতে লাগলেন,
ভাইসব! এই পবিত্র গাছের অলৌকিক ক্ষমতা অপরিসীম। যার মনে যা আশা আছে, গাছের গোড়ায় মানত করে দানবাক্সে একশ টাকা ফেলুন। আশা পূরণ না হলে ডাবল ফেরত!

দেখতে দেখতে তিন দিনের মধ্যে মোড়ল মিয়ার বাড়ির চারপাশ জমজমাট মেলায় পরিণত হলো। গাছের অলৌকিকত্ব নিয়ে নানা রকম গুঞ্জন ছড়াতে লাগল। কেউ বলল, এই গাছের পাতা চিবিয়ে খেলে নাকি বাতের ব্যথা ভালো হয়। আবার কেউ বলল, গাছের দিকে তাকিয়ে তিনবার হাঁচি দিলে নাকি লটারি জেতা যায়। এক কবিরাজ তো গাছের ছাল চূর্ণ করে ‘অলৌকিক এনার্জি ড্রিংক’ বানিয়ে ২০ টাকা গ্লাস বিক্রি করা শুরু করে দিল।

মোড়ল মিয়ার দানবাক্স প্রতিদিন বিকেলে টাকায় উপচে পড়তে লাগল। তিনি মনে মনে ভাবলেন,
গাছটা কেটে ফেললে বড়জোর হাজার বিশেক টাকা পেতাম। আর এখন তো গাছ নিজেই প্রতিদিন হাজার টাকা আয় করে দিচ্ছে! বিজ্ঞানের ইলাস্টিক নাকি প্লাস্টিক—যাই হোক না কেন, জিনিসটা আমার ভাগ্য খুলে দিয়েছে।

এভাবেই দিন কাটছে। সন্টু একদিন দূর থেকে দেখল, মোড়ল মিয়া গভীর রাতে গাছের গোড়ায় গোপনে পানি ঢালছেন আর বলছেন,
বাবা বটগাছ, আর যাই করো, দয়া করে আবার শুয়ে পড়ো না! তুমি সোজা আছ বলেই আমার সংসারটা সোজা হয়ে চলছে।

৭৭ পঠিত ... ১৫:০০, জুন ০৭, ২০২৬

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top