আমাদের গ্রামে নতুনবাবু বলিয়া এক ভদ্রলোক বাস করিতেন। কেন তাঁহাকে নতুনবাবু বলা হইত, তাহা কেহ জানিত না। আমি যখন হইতে তাঁহাকে দেখিয়াছি, তখন হইতেই তিনি যথেষ্ট পুরাতন। কিন্তু গ্রামের লোকের নামকরণে যুক্তির প্রয়োজন শূন্যপ্রায়। তাহাতে কিছু ছিটগ্রস্ত বলিয়া মনে হয়।
নতুনবাবুর বয়স কত ছিল, তাহাও বলা শক্ত। মাথার চুলে পাক ধরিয়াছিল, কিন্তু ছেলেদের সঙ্গে মাঠে মাঠে ঘুরিয়া বেড়াইতেন এমন উৎসাহে, যেন ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফল এখনও বাহির হয় নাই।
একদিন বিকেলে আমরা মাঠে ফুটবল খেলিতেছিলাম। নতুনবাবু মাঠের ধারে একখানা ভাঙা বেঞ্চের উপর বসিয়া খেলা দেখিতেছিলেন। অনেকক্ষণ দেখিবার পর তাঁহার মুখে এমন এক বিষণ্ণ ভাব দেখা দিল, যেন গ্রামসুদ্ধ লোক তাঁহার কাছ হইতে ধার লইয়া টাকা শোধ করে নাই।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,
— কী হইয়াছে নতুনবাবু?
তিনি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন,
— আহা, বলটার জন্য ভারী কষ্ট হয়।
আমরা অবাক। বলটার আবার কী হইল?
তিনি মাঠের দিকে আঙুল দেখাইয়া বলিলেন,
— দেখ না, বেচারার পিছনে বাইশটা মানুষ লাগিয়া আছে। একজন একটু ছাড়িয়া দিলে আরেকজন ধাওয়া করিতেছে। যেন সে বড় রকমের অপরাধ করিয়া পালাইতেছে। গ্রামের লেঠেল বাহিনীও তো মানুষের পিছে এমন লেগে পড়ে থাকে না!
এই সময় গোপাল বলটাকে এমন এক লাথি মারিল যে, বল উড়িয়া মাঠের বাইরে চলিয়া গেল। নতুনবাবু চোখ বন্ধ করিলেন। ফিসফিসাইলেন,
— গেল!
— কে গেল?
— বলটা। বোধহয় সংসারের মায়া ত্যাগ করিল।
কিন্তু পাঁচ মিনিট পরে বলটি আবার ফিরিয়া আসিল।
নতুনবাবু মাথা নাড়িয়া বলিলেন,
— হায় রে নিয়তি! মানুষ যেমন চাকরি ছাড়িতে পারে না, বলও তেমনি খেলা ছাড়িতে পারে না।
আমরা হাসিতে লাগিলাম।
— এই জন্যই বল হয়ে জন্মানো উচিত নয়।
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কেন?
তিনি বলিলেন,
— মানুষ হলে অন্তত রাগ করে বাড়ি চলে যাওয়া যায়। বলের সে উপায় নেই। যে মারে, তার কাছেই আবার ফিরে ফিরে আসতে হয়।
কথাটা শুনিয়া আমরা হাসিলাম। কিছুক্ষণ পরে নতুনবাবু নিজেই খেলিতে নামিলেন। প্রথমেই বলটি তাঁহার পায়ের কাছে আসিয়া পড়িল। তিনি বিষম উৎসাহে লাথি মারিলেন, কিন্তু বলের কিছুই হইল না, উল্টা নতুনবাবু নিজেই ধপাস করিয়া পড়িয়া গেলেন।
আমরা ছুটিয়া গেলাম।
— লেগেছে?
তিনি উঠিয়া বসিয়া বলিলেন,
— না, না। ইচ্ছা করেই মাটিতে শুইয়া পড়েছিলাম।
— কেন?
— বলটাকে ভয় পাইয়ে দিতে চাই নাই।
আমরা আরও জোরে হাসিলাম। কিন্তু নতুনবাবু হাসিলেন না। তিনি বলটাকে হাতে তুলিয়া অনেকক্ষণ মায়া মায়া চক্ষে চাহিয়া দেখিলেন। তারপর বলিলেন,
— তোমরা শুধু মারো। কখনও জিজ্ঞাসা করেছ, ও কী চায়?
গোপাল বলিল,
— বল আবার কী চাইবে?
— শান্তি চাইবে।
— বল কথা কয় নাকি?
— কয় না বলিয়াই তোমরা বাঁচিয়া আছ, গেছোর দল! কথা কইতে পারিলে এতদিনে মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করিত।
এইবার আমরা হাসিতে প্রায় মাঠে গড়াইয়া পড়িলাম।
খেলা আবার শুরু হইল। বলটি একবার এদিকে, একবার ওদিকে ছুটিতে লাগিল। এমন সময় নিতাই একখানা প্রবল শট মারিল। বলটি উড়িয়া গিয়া মাঠের ধারের বটগাছের ডালে আটকা পড়িল।
সকলেই হতবাক। নতুনবাবু হাততালি দিয়া উঠিলেন।
— বাঃ! অবশেষে আত্মরক্ষার বুদ্ধি হইয়াছে।
অনেক চেষ্টা করিয়াও বল নামানো গেল না। লাঠি, ঢিল, গাছে ওঠা— সকলই ব্যর্থ।
সন্ধ্যা হইয়া গেল। আমরা বাড়ি ফিরিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময় নতুনবাবু গাছের দিকে তাকাইয়া বলিলেন,
— আজ কিন্তু ও নামিবে না।
— কেন?
— জীবনে এই প্রথম একটু শান্তি পাইয়াছে যে।
পরদিন সকালে মাঠে গিয়া দেখি, রাতের ঝড়ে বলটি আবার মাটিতে পড়িয়া গিয়াছে। আর নতুনবাবু? তিনি আরও আগেই উপস্থিত। বলটাকে কোলে করিয়া বসিয়া আছেন। আমাদের দেখিয়া বলিলেন,
— দেখিলে তো? নিয়তির হাত বড় কঠিন। পালাইতে গিয়াও শেষরক্ষা হয় না।
তিনি বলটির গায়ে হাত বুলাইতে লাগিলেন। আমরা হাসিলাম। নতুনবাবুও এবার একটু হাসিলেন। তারপর বলিলেন,
— হাসো বাপু, হাসো। বয়স কম বলিয়াই হাসি আসে। বয়স বাড়িলে বুঝিবে, মানুষের জীবন আর ফুটবলের জীবনের মধ্যে তফাৎ খুব কম।
আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, সে আবার কেমন?
নতুনবাবু বলিলেন,
— দুজনেই সারাজীবন অন্যের পায়ে পায়ে ঘুরিয়া বেড়ায়। তবে ফুটবলের একটা সুবিধা আছে।
— কী?
— ও গোল বলেই ওর এত সমাদর। মানুষের মাথা গোল, কিন্তু পা দুটোও গোল হইলে তাকে পাগলা গারদে পাঠাইয়া দেয়। দেখোনি?
এই বলিয়া তিনি এমন গম্ভীর মুখ করিলেন যে, আমরা আর হাসিব কী করিব বুঝিতে পারিলাম না।



পাঠকের মন্তব্য