আমার লেখারা সবুজ ঘাসের মতো বিলি কাটে

২৭ পঠিত ... ১৩ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে

 

প্রিয় আন্তন,

একজন মৃত মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয় সেদিনটি কত উজ্জ্বল আর আলোকিত ছিল। চারদিকে গরম হাওয়া, মস্কোর বাদামী মাটির ধুলো বেয়ে বেয়ে তোমাকে নেওয়া হচ্ছিল নোভো-দেভিচিতে। সেখানে শখানেক মানুষ, যাদের অনেকেই সেদিন উজ্জ্বল পোশাক আর রঙিন টাই পরে এসেছিলেন কেবল তোমাকে বিদায় জানাতে। সূক্ষ্ম যে অনুভূতিগুলো তোমাকে সজাগ রাখত, সাদা ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দেও আজ তুমি কোনো সাড়া দিতে পারছ না। কেন আন্তন! আজ আমি তোমাকে শত প্রশ্ন করতে দ্বিধা করব না। যে ওয়াগনে তুমি ফিরে আসছিলে নিজ দেশে, সেটা ছিল একটা চলন্ত ঝিনুকের হিমাগার। এই তাচ্ছিল্য তো তোমার প্রাপ্য ছিল। যে সাদা ঘোড়া তোমার শবের সামনে ধুলো উড়িয়ে ছুটে যাচ্ছিল, তার পিঠে ছিল এক স্থূল পুলিশ অফিসার। আমি আরও বলতে পারি, ওই একশ মানুষের অনেকেই জানে তুমি কেবল একজন রসিক লোক। তুমি আসলে কী, ওরা কত সহজেই জেনে গেল; অথচ আমি আজও জানতে পারলাম না! পাভ্লোভিচ, দেখো, সশব্দে মিলিটারি ব্যান্ড বাজানো হচ্ছে। আজ নাকি বিদায়ের দিন! আমি চাইলে আরও অনেক কিছুই বলতে পারি, কিন্তু বলব না শুধু এই কারণে যে আমি তোমাকে মোটেও ভালোবাসি না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি ‘দি বেট’ গল্পের সেই আইনজীবী, যে মদের আসরে বাজি ধরেছিল পনেরোটি বছর স্বেচ্ছায় নিঃসঙ্গ গৃহবন্দী জীবন কাটাবে দুই মিলিয়ন রুবেলের বিনিময়ে, কেবল মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে যাবজ্জীবন শ্রেয়—এই কথাটি বলার জন্য। যারা জীবন নিয়ে বাজি ধরে, তাদের কী করে ভালোবাসি বলো!

ধুলোওড়া গরমের ভেতরেও আজ আমার মাথা অনেক ঠান্ডা। আর আমি সবকিছুই মনে করতে পারছি। স্যানাটোরিয়ামের কথা, আলো-বাতাস খেলানো উঁচু উঁচু ছাদের সিলিং, লাইব্রেরি, সঙ্গীতের অনবদ্য বাদ্যযন্ত্র আর বাগানের কথা। যেদিন তোমার অনেক টাকা হবে… সব করা হবে। সেদিন আমাদের ভেঙে পড়া দুস্থ স্কুলশিক্ষকেরা খিটমিট করতে করতে হাহুতাশ করবে না। মাত্র ২০ রুবেল থেকে তিন সন্তান, অসুস্থ স্ত্রী আর নিজে বাতরোগে জড়িয়ে, শতচ্ছিন্ন পোশাক গায়ে হিমশীতল ঠান্ডার ভেতরে ক্লাসে আর কাঁপতে থাকবে না। তোমার সোনালি শৈশব না হয় ফুরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ওদের কথা ভেবে আয়োজনের অভাব তো রাখোনি।

হঠাৎ মিলিটারি ব্যান্ড থেমে গেল কেন বুঝতে পারছি না। অনেকের বিদ্রুপ হাসির আওয়াজ আসছে চারদিক থেকে। পাশ থেকে বুড়ো লোকটি জানাল, রুশ জেনারেল কেলারকে মিলিটারি অনার দিতে আসা সামরিক বাহিনী আর উপস্থিত লোকেরা জানতে পেরেছে, তোমাকে ভুলবশত গার্ড অব অনার দেওয়া হচ্ছিল। যে ভণ্ডামি আর ইতরতাকে ভয় পেয়েছিলে জীবনভর, সেই তোমার শেষ বেলার সঙ্গী। কিন্তু আজ মস্কোবাসীর প্রিয় লেখককে জানাতে চাই, পুত্রশোকে নতজানু হয়ে তোমারই গল্পে বসে থাকা ডক্টর আবোগিন, কিরিলভের ভেতরে কেবল তোমাকেই দেখি। সেই পাড় মাতাল আর হতচ্ছাড়া পেত্রভ যখন অসুস্থ প্রিয়তমা মাত্রিয়ানাকে নিয়ে হাসপাতালের পথে ছুটতে থাকে, তখন আমার কেবল তোমাকেই মনে পড়ে। মনে হয় ‘ছয় নম্বর ওয়ার্ড’-এর মানসিক বিকারগ্রস্ত ইভানের ভেতরে তুমিই বাস করো, যে ভুল করে পৃথিবীর নির্মম সত্যগুলোকে বলে দেয়। অথচ তোমার জীবন কাটে আন্দ্রেই ইয়েফিমিচের মতো। আমি সমস্ত গল্পে কেবল তোমাকেই খুঁজতে থাকি। ডক্টর দীমভের মতো নিবেদিত প্রাণ একজন মানুষের ভেতরে দেখি তুমিই ঘোরাফেরা করো। মনে হয় তুমি পনেরো বছর গৃহবন্দী আইনজীবীর মতো শেষবেলায় একটি শব্দও না লিখে, সবকিছুকে অস্বীকার করে চিৎকার দিয়ে এখনই বলে ওঠো, ‘তোমাদের স্বাধীনতা, জীবন, সমস্ত জ্ঞান যা তোমরা অর্জন করেছ, আমি মনে প্রাণে তার সবকিছু ঘৃণা করি।’

অথচ তোমার সাহিত্যে নিজেকে সারা গালচিনোর ভেতরের পথে পথে অক্টোবরের গা-হিম শীতের রাতে ঘোড়া চালিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটেছি, নিজের সন্তানের মৃত্যু, বিচ্ছেদের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধবোধে নিজেকে কুড়ে কুড়ে শেষ করে দিয়েছি। আর মদের আসরে আলাপ করেছি আমাদের বেঁচে থাকা, জীবন আর মৃত্যু নিয়ে, মানসিক রোগীদের মতো নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছি কতদিন! আর স্বপ্ন দেখেছি, যা দুশো বছর পরে হয়, তা আগামীকাল হওয়াও সম্ভব।

মস্কোর বিখ্যাত নোভো-দেভিচি কবরস্থানে আমরা পৌঁছে গেছি। তোমার কী মনে পড়ে, আন্তোশা! শুকনো কাশির দমক একটু থেমে গেলে তুমি বলতে, মরতে হবে জেনে জীবনযাপন কতটা কঠিন। সংখ্যার হিসেবে আজ শেষবারের মতো তোমার বয়স যাই হোক, আমি শুধু জানি শরৎশেষের বিষাদগ্রস্ত দিনগুলোর মতো অসুখে তুমি কাতর ছিলে না। রোগের সঙ্গে অন্যায় করলেও সকল জীবনের প্রতি করুণা করতেও তো দ্বিধা করনি। অর্ধেক বসন্ত কাশির দমক থামাতে থামাতে যা যা লিখেছ, তা তোমার মৃত্যুর থেকে কোনো অংশে কম ছিল কি না জানি না। এই শবযাত্রায় উপস্থিত লোকেদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে—আপনারা আজ বলুন, চেখভকে নিয়ে।

ধূপের গন্ধে চারপাশ এখন মৌ মৌ করছে আর রুশ অর্থোডক্স প্রথা মেনে যাজকের মন্ত্রপাঠের বিষণ্ন ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। বুঝতে পারছি তোমার সময় ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু এও কি সম্ভব, তোমার প্রিয় ঘর ‘মেলিখোভো’ ছেড়ে তুমি চিরদিনের জন্য চলে যাচ্ছ? প্রিয়তমা স্ত্রী ওলগাকে ছেড়ে? ভালোবাসার বাগান ছেড়ে? তোমার চশমার ঝাপসা লেন্স ঘষে নাও, চোখের দিকে না তাকিয়ে আমার কথা বলতে অসুবিধা হয়, সে তুমি ভালো করেই জানো। কিন্তু আমি জানি, আজ তোমার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে গেছে, এই সামান্য অনুরোধটুকুও তুমি আর রাখতে পারবে না। আর ওই সমস্ত রোগীদের কথা আর নাই বললাম, যারা তোমার অপেক্ষায় থাকবে।

প্রার্থনা সভা শেষ। বিদায় জানাতে আসা ভিড়ের ভেতরে আমি দেখতে পাচ্ছি মুদি দোকানি তোমার দেউলিয়া পিতা পাভেল চেখভের কবর। তার পাশেই তোমাকে শায়িত করা হবে, প্রিয় পাভ্লোভিচ। কিন্তু দেখো, আজ কোনো বিউগলের সুর বেজে উঠবে না সমবেত জনতার মাঝে। তাতে কী! চেখভের অব্যবহৃত বন্দুক দিয়ে তুমি যে নাট্যশাস্ত্রের সমাদৃত নিয়ম জারি করেছিলে, তা ৪৪টি বছর অপেক্ষায় ছিল। আজ সে বন্দুকের গুলি ফুটে সেলুট জানাবে ‘বাজি’ গল্পের আইনজীবীর মতো। প্রমাণ হবে, তুমি যা করতে চেয়েছ, তা বৃথা যায়নি।

বিখ্যাত সাহিত্যিক আলেকজান্ডার কুপ্রিনকে দেখা যাচ্ছে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন। সম্ভবত তিনি আজ শেষবারের মতো তোমাকে নিয়ে কিছু বলছেন। শোকসভার সকলে তাঁর দিকে মলিন বদনে তাকিয়ে জীবনের হিসেব মিলিয়ে নিচ্ছেন শেষবারের মতো। কিন্তু হায়! আমি শুধুই শুনতে পাচ্ছি দুটি কথা…

ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহে যাও…

যে সবুজ ওয়াগনে তোমার শবদেহ আজ মস্কোর নিকোলায়েভস্কি রেলওয়ে স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার গায়ে বড় বড় হরফে লেখা ছিল—‘তাজা ঝিনুক পরিবহনের জন্য’। ঝিনুকের মুক্তোর মতো জীবন ছিল তোমার!

বেলা ফুরিয়ে আসছে আর তোমার শবদেহ কবরে নামিয়ে নেওয়া হয়েছে, কবি। বেশি কিছু লিখতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। আমি তোমার একজন নিবেদিত প্রাণ পাঠক নই, তোমার থেকে যোজন যোজন দূরে, তোমার চোখের দিকে তাকিয়েই এই চিঠি পাঠাচ্ছি। অথচ তোমার কোনো ঠিকানা আমার কাছে নেই। কিন্তু আমি জানি, এই চিঠি ঠিকই তোমার কাছে পৌঁছাবে।

আর কিছুর উত্তর আমি চাই না, কেবল একটি ব্যাপারে আমাকে জানাবে কী, প্রিয় আন্তন... জার্মানির ব্যাডেনভাইলারের সেই মৃদু আলোর ঘরটিতে নিশ্চিত মৃত্যু হচ্ছে জেনে যে শ্যাম্পেইনের গ্লাসটি তুলে নিয়েছিলে শান্ত দৃষ্টিতে, তা কি তোমার কাছে বিষপানের সমান ছিল না? অসময়ের মৃত্যুকে তো গ্রহণ করতে চাওনি। তবে কেন হাসতে হাসতে শেষবারের মতো বলেছিলে—

"I'm dying... I haven't had champagne for a long time."

ইতি,

২৭ পঠিত ... ১৩ ঘন্টা ৩০ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top