১.
ডাক্তার সাহেবের চেম্বার! ব্রিটিশ ডাক্তার! আমাদের দেশে তো রোগীরা মাছির মত ভিনভিন করতে থাকে ডাক্তারের চেম্বারে, কিন্তু বাবা এ ব্রিটিশ জাত! ভাবই আলাদা। এই চেম্বারে এক্কেরে আসল মাছি-ই ভিনভিন করছে। ন্যাচারাল স্পেসিজ!
ডাক্তারসাহেব তাঁর বিশাল টেবিলের পিছে বসে আছেন। চটাশ করে বাড়ি দিয়ে আরেকটা মাছি মেরে ফেললেন। সামনে স্পেসিমেন রাখার কৌটোয় জমা করলেন। মুখে বিড়বিড় করে গুনলেন,
: আট!
ডাক্তার ডয়েল মাছি মারছেন আর গুনে গুনে জমাচ্ছেন!
২.
আর্থার কোনান ডয়েল সাহেব যখন পোর্টসমাউথে ডাক্তারি চেম্বার খুললেন, তখন তার অবস্থা ‘ডাক্তারসাহেবের’র চেয়ে ‘ডাক্তার-ধুঁকছেন’ বেশি! চেম্বারের নাম হল ‘ক্লিনিক’, কিন্তু সেখানে মাছি ছাড়া আর কেউ ‘ক্লিক’ করল না!
চেম্বার জাঁকিয়ে বসা মানে কি বলেন তো? চেয়ার-টেবিল পেতে নিজে জাঁকিয়ে বসা, রোগীর বসার কোনো বালাই নেই! ডয়েল সাহেবের চেম্বারে ঘর আছে দুটো। একটা ‘কনসাল্টিং রুম’ মানে যেখানে ডাক্তারবাবু বসে ভাবেন, আর অন্যটা ‘ওয়েটিং রুম’ মানে যেখানে রোগীরা বসে হাঁপায়। ডয়েল সাহেব নিজেই যেন নিজের চোখের জল মুছে ভাবলেন,
: আমি কনসাল্টিং রুমে ওয়েট (অপেক্ষা) করি , আর আমার ওয়েটিং রুমে কেউ কনসাল্ট (পরামর্শ) করতে আসে না! খেলাটা ভালোই।
কিন্তু খেলাটার ঝামেলাও আছেই।
মাছি মারতে মারতে ডয়েল বুঝলেন, এভাবে চললে মাছির বংশ নির্বংশ হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু তাতে তো পেটের কিছু হবে না। মাছির স্যুপ রেঁধে তো আর খাওয়া যায় না! তা ‘অন্ন’ যখন জুটবে না, তখন ‘অন্য’ পথ তো দেখতেই হবে।
কি আর করা? স্টেথোস্কোপ দিয়ে নিজের বুকের ধুকপুকানিটা মেপে নিয়ে তিনি প্রেসক্রিপশনের প্যাডটা টেনে নিলেন। ভাবলেন, রোগ যখন সারাতেই পারছি না, তখন একটা ‘রোগা’ গল্পই ফেঁদে বসি! দেখি কিছু হয় কিনা!
৩.
গল্প নয় লিখে ফেললেন, কিন্তু নায়কটা কে হয়? কি যে এক জ্বালা সবকিছুর! শান্তি নাই। ডয়েল সাহেব চোখ বুজে খুঁজে দেখতে লাগলেন যে কাউকে পাওয়া যায় কিনা যে নায়ক হতে পারবে। ফট করে মনে পড়ে গেল তার কলেজের সেই খটখটে প্রফেসর ডক্টর বেলকে। উনি কিন্তু টাক্কু বেল না, জোসেফ বেল!
বেল সাহেব রোগী দেখতেন না, রোগীকে পড়তেন। একদিন চেম্বারে একটা লোক ঢুকতেই বেল হাঁকলেন,
: কী রে বাপু ! সাউথ ডেল থেকে আসটেক নাকি? তা সেনাবাহিনী ছাড়লে কেন?
সেই ব্যাটাও তব্দা ! ডয়েলও ! বেল সাহেব মুচকি হেসে বললেন,
: আরে ভাই, লোকটার হাঁটার ধরন মিলিটারিদের মতো, অথচ জুতোয় লেগে আছে সাউথ ডেলের লাল মাটি! এই কথা বলার জন্য কি হাত গোনা জানা লাগে?
ডয়েল ভাবলেন, ধুর! আমার চেম্বারে তো আর জ্যান্ত জোসেফ বেল আসার মুরোদ নেই, তার চেয়ে কাগজে-কলমেই একটা বেল পাকানো যাক! বেলের মাথায় একটু কল্পনার তেল দিলেই সে হয়ে উঠবে দুনিয়া কাঁপানো ডিটেক্টিভ!
৪.
নায়ক পাওয়া গেল। এবার আবার তার নাম পাওয়া যাচ্ছে না! কি নাম, কি নাম...
প্রথমে ডয়েল তাঁর মি. গোয়েন্দার নাম রাখলেন-শেরিংফোর্ড হোপ। কিয়েক্টাবস্থা চিন্তা করেন!
'শেরিংফোর্ড’ শুনলেই তো মনে হয় কোনো কফ সিরাপের নাম, আর ‘হোপ’ মানে তো আশা। কফের আবার হোপ!
তা যে ডাক্তারের চেম্বারে রোগী আসার কোনো ‘আশা’ নেই, তার গোয়েন্দার নাম ‘হোপ’ হলে কি পাঠকদের মনে ‘আশা’ জাগবে? লোকে তো নখ বাজিয়ে হেসেই খুন হবে!
ডয়েল খসড়া খাতা কেটে কুটে চিন্তা করলেন,
: উঁহু, নাম চাই এমন খাসা, যাতে চমকে ওঠে চাষা!
এরমধ্যে আবার ক্রিকেট খেলা পড়ল। ক্রিকেটের দারুণ ভক্ত আমাদের ডাক্তার ডয়েল। সেই টাইমে 'শেরউইন' আর শ্যাকলক নামে দুই বিখ্যাত ক্রিকেটার মাঠ কাঁপাচ্ছেন। ডয়েল সাহেব শেরউইনের ‘শের’ শ্যাকলকের ‘লক’ ধার করে, দুটোকে একসঙ্গে ফেভিকল দিয়ে চিপকায়ে বানিয়ে ফেললেন—শার্লক।
এখন আবার পদবি আমদানি করতে হবে? কান্না পেলো যেন ডাক্তার সাহেবের। কই পাওয়া যায়? ডয়েলের প্রিয় কবি ছিলেন অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস। সেখান থেকে ধার করলেন- হোমস।
ব্যস, শেরিংফোর্ড হোপের ‘হোপ-লেস’ সমাধি ঘটিয়ে ওয়াঁ ওয়াঁ করে কেঁদে উঠলেন আমাদের শার্লক হোমস!
৫.
এইবার আরেক কাহিনি। গোয়েন্দা তো হলো, কিন্তু তার বাজনা বাজাবে কে? তারমানে সহকারী একখান লাগবে! ডয়েল এক বাজনদারের কথা চিন্তা করলেন- নাম রাখলেন- অর্মন্ড স্যাকার'। তা দুই-একবার মুখে মুখে বললেন, বলে নিজেই নাক কুঁচকালেন। শুনতে কেমন যেন মনে হচ্ছে কোনো এক পঁচা বস্তা থেকে একদম তাজা বাজে গন্ধ নিয়ে বেরোলো নামটি। মানে 'স্যাক' মানে বস্তা তো, তাই আর কি!
ডয়েল ভাবলেন, গোয়েন্দা তো আমার একেবারে ফাস্টোকেলাস! তবে তার সহকারীকে হতে হবে একটু ভ্যাবলা-কান্ত, যে সব দেখেও কিছুই বুঝবে না! নইলে আমার তুখোড়, মহাজ্ঞানী হিরো শেখাবে-পড়াবে কাকে?ঠিক আমার পোর্টসমাউথের দোস্ত ড. জন ওয়াটসন-এর মতো!
ব্যস, লাগলো তেলেসমাতি! বন্ধুর নামটাই লাইফলং হাইলাইটেড বানিয়ে ফেললেন ড. ওয়াটসন হিসেবে। দোষের মধ্যে এই যে,বেচারা ওয়াটসন গল্পে সারাজীবন শুধু ‘অদ্ভূত! চমৎকার!’ বলেই জীবন পার করে দিলেন!
৬.
এরপর আর কি?
১৮৮৬ সালের এক বিকেলবেলা।যখন বাইরে ঝুম বৃষ্টি আর চেম্বারে রোগীর সংখ্যা যথারীতি ‘বিগ জিরো’, ডয়েল লিখে শেষ করলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস 'আ স্টাডি ইন স্কারলেট' ।
কিন্তু প্রকাশকরা তো আর আম-পাঠক নন, তারা হলেন ‘যম-পাঠক’! ডয়েল তাঁর গোয়েন্দাকে পকেটে ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ান কিন্তু লাভ খুব একটা হয় না। ডাক্তারের হাতের গোয়েন্দা- কে নেবে? তিন-চারটে প্রকাশনী ডয়েলকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল, যদিও তিনি কিন্তু একটুও ঘেউ ঘেউ করেন নি। তারাই বরং ঘেউ ঘেউ করে উঠল যেন,
: ধুর মিয়া! ডাক্তারি লাটে তুলে গল্প লিখছেন? যান, গিয়ে রোগী দেখুন গে!
শেষে 'ওয়ার্ড, লক এন্ড কো 'রাজি হলো। তবে তাদেরও কন্ডিশন আছে- পুরো বইয়ের মালিকানা একেবারে বিক্রি করে দিতে হবে। তাও মাত্র পঁচিশ পাউন্ডে! এও কি হজম হয়?
তবুও ডয়েল ভাবলেন,
: পকেটে কড়ি নেই, চেম্বারে রোগী নেই, পঁচিশ পাউন্ডই সই! অন্তত কয়েকটা দিন ডাল-ভাত তো জুটবে!
১৮৮৭ সালের বড়দিনে একটা হাবিজাবি ম্যাগাজিনের কোনায় ছেড়াবেড়াভাবে ছাপা হলো সেই গল্প। তারপর শুরু হল আসল মজা। ডয়েল স্যার নিজেই বোঝেননি যে এই পঁছিশ পাউন্ডের গল্পই তাঁর চেহারা বদলে দেবে! হয়ে উঠবে কল্পকাহিনির সবচেয়ে বাস্তব চরিত্র 'শার্লক হোমস'।
ডয়েল স্যার এটাও এখনো জানেন না কিছুদিন পর তাঁর এই চরিত্রটিই তাকে ঘোল খাওয়াবে, একে মেরে ফেলেই খুনি উপাধি পাবেন আর বৃটেনের রানী ভিক্টোরিয়ার ও মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে। ফিরিয়ে আনতে হবে আবার হোমসকে।
৬.
তাহলে মোদ্দা কথা কি দাড়ালো- ডয়েল স্যারের চেম্বারে যদি গণ্ডা গণ্ডা রোগী আসত, আর তিনি যদি প্রেসক্রিপশনে প্যারাসিটামল আর পেট কামড়ানির ওষুধ লিখতে ব্যস্ত থাকতেন, তবে আজকে আমরা শার্লক হোমসকে চিরুনি অভিযান চালিয়েও পেতাম না!
ডাক্তার হিসেবে ডয়েলের স্যারের সেই ‘ফেল’ মারাটাই ছিল বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বড় ‘পাস’! প্রয়াণ দিবসে এই ভয়ংকর ‘রোগী-হীন’ ডাক্তার ও ‘ঝকঝকে’ স্রষ্টাকে জানাই শত কোটি সেলাম!



পাঠকের মন্তব্য