জ্যৈষ্ঠ মাস বাঙ্গালির জীবনে জ্যেষ্ঠ না হলেও মাসটি আসলেই বাঙালির ঘরে ঘরে আম-জাম-লিচুর ধুম পড়ে যায়। যাকে বলে একেবারে ধুমাদ্ধুম ধুন্ধুমার!
আমি অবশ্য ওসবের মধ্যে নেই। আম জিনিসটা বড্ড আমুদে, আর লিচু হলো উচুঁ দরের ফাজিল- একটু চাপ দিলেই ফসকে যায়, তাতে আবার কেঁদেও ফেলে। কিন্তু এই সবের ভিড়ে যে ফলটি গম্ভীর হয়ে ঘরের কোণে বসে থাকে, সে বাপু কাঁঠাল।
নামটা একটু খেয়াল করুন- কাঁঠাল। সন্ধিবিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায়- কাঠ + আল। অর্থাৎ যে ফলের ভেতরে কাঠের মতো শক্ত আঁটি আর বাইরে আল-পিন ফোটার মতো কাঁটা। লোকে বলে এটি নাকি আমাদের জাতীয় ফল। তা হবে না-ই বা কেন? জাতে আমরা বাঙালি, আর আমাদের জাতীয় ফল হবে আদ্যোপান্ত 'জাঁদরেল', এটাই তো স্বাভাবিক। প্রতি পদে পদে থাকবে 'কাঁঠাল'।
প্রেমিকার বাবা সেদিন আমায় ইন্টারভিউতে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
: তা হে ছোকরা, তোমার ফিউচার প্ল্যান কী? নিজেকে ফ্যামিলি লাইফে কতটা মানিয়ে নিতে পারবে বলে মনে করো?
আমি এক গাল হেসে বললাম,
: আজ্ঞে, আমি নিজেকে ঠিক একটা আস্ত কাঁঠালের মতো তৈরি করতে চাই।
ভদ্রলোক চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন,
: কাঁঠাল! মানে? তুমি কি বলতে চাও তুমি বাইরে থেকে বড্ড খসখসে আর ভেতরে কেবলই ভুতুড়ে ভুতুম?
আমি বললাম,
: আরে না মেসোমশাই! কাঁঠাল হলো পৃথিবীর একমাত্র 'ফ্যামিলি-প্ল্যানিং' ফল। একটা আম কিনলে বাড়ির একজনই খেতে পারে- বাকিরা আঁটি আর খোসা চোষে। কিন্তু একটা কাঁঠাল কেনা মানে পুরো যৌথ পরিবারকে এক আঠায় বেঁধে ফেলা! আমি আপনার মেয়েকে এমন ভালোবাসবো, যা হবে খাঁটি কাঁঠালের আঠার মতো। একবার লাগিলে আর ছড়িবে না। ডিভোর্স ল'ইয়াররা শত চেষ্টা করলেও আমাদের আলাদা করতে পারবে না, কারণ আমাদের প্রেম কোর্টের সিলমোহরে নয়, কাঁঠালের কষে সিলড্ থাকবে!
ভদ্রলোক আমার এই 'কাঁঠাল-তত্ত্ব' শুনে এমন চটলেন যে, চা-টা না খাইয়েই আমায় বিদায় করলেন। আমি মুখ চুন করে ফিরে এলুম।
হবু-শ্বশুরমশাই গুরুত্ব দিলেন না বটে তবে কাঁঠাল জিনিসটা কিন্তু সায়েন্টিফিকালিও মারাত্মক। নিউটন সাহেব যদি আপেল গাছের নিচে না বসে জ্যৈষ্ঠ মাসে বাংলার কোনো কাঁঠাল গাছের নিচে বসতেন, তবে পৃথিবীর ইতিহাস অন্যরকম হতো। তিন মণ ওজনের একটা কাঁঠাল যদি ডাঁশ করে নিউটনের মাথায় খসত, তবে তিনি শুধু 'মাধ্যাকর্ষণ' আবিষ্কার করে ক্ষান্ত হতেন না নিশ্চয়ই, সরাসরি 'ঊর্ধ্বগমন' করে স্বর্গে চলে যেতেন! আর গ্র্যাভিটির থিওরি ছাড়াই আমরা মর্ত্যে ঘুরেফিরে জীবন পার করে দিতুম।
সেদিন এক মেদবহুল ভদ্রলোক আমায় এসে জিজ্ঞেস করলেন,
: তা বাবু, ওজন কমানোর কোনো সহজ উপায় বলতে পারেন? ডায়েট করতে করতে জীবনটা তিতো হয়ে গেল।
আমি বললাম,
: খুব সোজা। রোজ সকালে বাজার থেকে চারটে বড় সাইজের খাজা কাঁঠাল কিনবেন।
ভদ্রলোক চোখ বড় বড় করে বললেন,
: বলেন কী! কাঁঠাল খেলে তো ওজন আরও বাড়বে!
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
: আহা, খাবেন কেন? আমি কি খেতে বলেছি? আপনি কাঁঠাল চারটে বগলদাবা করে চারতলা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করবেন। কাঁঠাল ভাঙার দরকার নেই, শুধু ওটাকে নিয়ে কসরত করুন। দেখবেন, কাঁঠালের ওজনে আপনার চর্বি জল হয়ে গেছে! আর যদি ভুল করে ভেঙে ফেলেন, তবে তার আঠা ছাড়াতে শরীর থেকে যে পরিমাণ ঘাম ঝরবে, তাতে এক সপ্তাহে আপনার চার কেজি ওজন কমতে বাধ্য!
জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমি নিজে কাঁঠাল খাই কি না?
আজ্ঞে না। আমি কাঁঠাল দূর থেকেই দর্শন করি। কারণ যে ফল ভাঙতে গেলে 'দা-বঁটি'র মতো মারাত্মক অস্ত্র লাগে, আর উদ্ধার পেতে সরষের তেল মাখতে হয়- তাকে ফল বলা ভুল। ওটা আসলে একটা সুস্বাদু ক্রাইম সিন। খাওয়ার চেয়ে ওটার দিকে চেয়ে থাকা অনেক ভালো, অন্তত শান্তিতে 'কোয়া'-টার ফাইনাল পর্যন্ত ম্যাচটা উপভোগ করা যায়!



পাঠকের মন্তব্য