গিয়াসউদ্দিন শামসু ঘুম থেকে উঠে দেখে সে তেলাপোকা হয়ে গিয়েছে

পঠিত ... ৫ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

১.

সকাল ৮:৪৫। গিয়াসউদ্দিন শামসু আবিষ্কার করল সে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে চিত হয়ে পড়ে আছে। তার পেটটা বাদামী রঙের একটা বড় খোলস, আর বাতাসে ছটা চিকন পা অনবরত নড়ছে। সে একটা তেলাপোকা হয়ে গেছে! তাও মার্কিন সাইজের!

যেকোনো সাধারণ মানুষ হলে এই অলৌকিক ঘটনায় আল্লাহর নাম জপত। কিন্তু প্রাইভেট ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার গিয়াসউদ্দিনের মাথায় তখন অন্য হিসাব চলছে-

: আজকে ইয়ারলি পারফরম্যান্স রিভিউ। এই অবস্থায় যদি সিক লিভ চাই, এইচআর ডিরেক্টরের সিআরএম সিস্টেমে আমার রেটিং 'সি'গ্রেডে নেমে যাবে সিওর। পোকা হইছি ভালো কথা, কিন্তু তাই বলে প্রমোশনটা হাতছাড়া করব?

সে মুখ দিয়ে হিসহিস শব্দ করে তার বিছানার পাশে রাখা আইফোনটা অন করার চেষ্টা করল। কিন্তু ফেস-আইডি কাজ করছে না। আইফোন লক স্ক্রিনে দেখাচ্ছে

Face Not Recognized. Looks like a Blattodea.

 

২.

সকাল ৯:১৫। টিম মিটিং শুরু হয়েছে। গিয়াসউদ্দিন ল্যাপটপের সামনে উপুড় হয়ে বসল। তার সামনের দিকের লম্বা দুটা শূঁড়  কিবোর্ডের স্পেসবারের ওপর আছাড় খাচ্ছে। সে জুম মিটিংয়ে জয়েন করেই ক্যামেরা অফ করে দিল।

ম্যানেজার কুদ্দুস সাহেব স্ক্রিনে এসেই চেঁচিয়ে উঠলেন, শামসু! ক্যামেরা অন করেন। আপনার ফেস এক্সপ্রেশন না দেখলে বুঝব কী করে আপনি কিউ-থ্রি এর টার্গেট নিয়ে কতটা সিরিয়াস?

গিয়াসউদ্দিন প্যানিক মোডে চলে গেল। সে দ্রুত জুমে গিয়ে একটা 'ক্যাট ফিল্টার' অন করল। স্ক্রিনে একটা কিউট বিড়ালের মুখ ভেসে উঠল, যার পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে এক বিশাল কুৎসিত তেলাপোকা।

স্যার, আসলে বাসায় একটু ওয়াই-ফাই  নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে, তাই এআই ফিল্টার অন করে রেখেছি।

গিয়াসউদ্দিন  কিড়মিড় শব্দ করে বলল।

কুদ্দুস সাহেব বললেন,

: ঠিকাছে ঠিকাছে। তা গত সপ্তাহের লোন রিকভারির ফাইলটা কোথায়? ঐটার কি ডেডলাইন পার হয়ে গেছে?

গিয়াসউদ্দিন মিথ্যা বলবে বলেই মুখ খুলেছে অমনি তার মুখের লালাগ্রন্থি থেকে এক ফোঁটা চটচটে তরল কিবোর্ডের ‘এন্টার’ বাটনে গিয়ে পড়ল। সাথে সাথে ক্লায়েন্টের পুরো লোন অ্যাকাউন্ট ক্লোজ হয়ে ‘সেটেলড’ দেখাল। গিয়াসউদ্দিনের নিজের কর্মকাণ্ডে নিজেই তব্দা লেগে গেল।

কুদ্দুস সাহেব স্ক্রিনে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, ওয়াও শামসু! আপনি তো মুখে কিছু বলার আগেই কাজ শেষ করে ফেললেন! একেই বলে প্রো-অ্যাক্টিভ এমপ্লয়ি! আপনার এই ডেডিকেশনের জন্য একটা হাততালি হওয়া উচিত।

গিয়াসউদ্দিন নিজের ছটা ঠ্যাং একসাথে বাড়ি দিয়ে নিজেই নিজেকে একটা নিঃশব্দ তালি দিল। তার মনে হলো- মানুষ থাকার চেয়ে তেলাপোকা হওয়া তো ক্যারিয়ারের জন্য বেশ ভালো!

 

৩.

দুপুর ১২টা। গিয়াসউদ্দিনের বোন ঘরের দরজা খুলে ঢুকল।  বোন জেন-জি প্রোডাক্ট! সে ভাইয়ের পিঠের শক্ত খোলস আর ছটা পা দেখে মোটেও অবাক হলো না। সে উল্টো ফোন বের করে টিকটক ভিডিও বানাতে বানাতে বলল,

: ভাইয়া, তুমি নাকি মেটামরফোসিস হয়ে গেছ? কুল তো! আব্বু, শুনে যাও, ভাইয়া এখন থেকে আর আমাদের বাথরুমের কমোড শেয়ার করবে না। ও নাকি এখন দেয়াল বেয়ে ছাদে চলে যেতে পারে। আমাদের ফ্যামিলির পার-ক্যাপিটা স্পেস বেঁচে গেল!

তার রিটায়ার্ড বাবা ড্রয়িংরুম থেকে চশমা ঠিক করতে করতে বললেন, পোকা হয়েছিস ভালো কথা, কিন্তু মাসের শেষে তেরো হাজার টাকা যে ডিপিএস কাটত, ওটা কিন্তু বন্ধ করা যাবে না। আর শোন, এখন থেকে তোর পিছনে সাবান আর শ্যাম্পুর খরচ বাঁচল, ওই টাকাটা তোর বোনের আইফোন ফান্ডে ট্রান্সফার করে দিস।

গিয়াসউদ্দিন সোফার নিচে গিয়ে মাথা গুঁজে বসে রইল। সে বুঝতে পারল, মধ্যবিত্ত পরিবারে আমি মানুষ নাকি পোকা- সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো, সংসারে আমি কত টাকা জেনারেট করতে পারছি।

 

৪.

বিকেল ৫টা। লিংকডইন থেকে একটা নোটিফিকেশন আসল। ব্যাংকের এইচআর ম্যানেজার গিয়াসউদ্দিনের জুম মিটিংয়ের পারফরম্যান্স দেখে তাকে একটা ‘সার্টিফিকেট অফ অ্যাপ্রিসিয়েশন’ পাঠিয়েছে। সার্টিফিকেটে লেখা, 'শামসু সাহেব হলেন আমাদের ব্যাংকের আদর্শ কর্মী। তিনি ডেস্কে বসে চা খাওয়ার ব্রেক নেন না, ওভারটাইম করার সময় এসির বাতাস খোঁজেন না, এবং ঘরের কোনায় পচা বিস্কুট খেয়েই একটানা ১০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। ওনার মতো ‘লো-মেইনটেইন্যান্স’ কর্মীই আমাদের দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।

গিয়াসউদ্দিন দেয়াল বেয়ে সিলিং ফ্যানের ওপরে গিয়ে বসল। ওপর থেকে পুরো ঢাকা শহরটাকে একটা বিশাল ডাস্টবিন মনে হচ্ছে। সে তার দুই শূঁড় দিয়ে আকাশকে স্যালুট জানাল।

মানুষ থাকতে সে প্রমোশনের জন্য বসের তেল মারত। আর আজ তেলাপোকা হওয়ার পর, সে নিজেই একটা আস্ত তৈলাক্ত প্রাণী!

কাফকার মেটামরফোসিস মরে গিয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের গিয়াসউদ্দিন শামসুরা মরে না; সে পরের কোয়ার্টারের টার্গেট পূরণ করার জন্য ডানা মেলে সোজা ম্যানেজারের কেবিনের দিকে উড়ে চলল!

পঠিত ... ৫ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top