ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উন্মাদনায় যখন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল দ্বৈরথের উত্তাপে বাংলাদেশের জনজীবন প্রায় স্থবির, ঠিক তখনই মাঠের কোণায় চুপিসারে ইতিহাস লিখে ফেলেছে কেপ ভার্দে। জনসংখ্যায় মাত্র ৫-৬ লাখের এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি যখন স্পেনের মতো জায়ান্টকে রুখে দিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখল, তখন গ্যালারির এক কোণায় থাকা ফুটবলের নিরপেক্ষ দর্শকরা যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস পেল।
রাউন্ড অফ ৩২-এ যখন আর্জেন্টিনার মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে কেপ ভার্দে, তখন বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে এক অদ্ভুত মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ছোট দলগুলোর এই উত্থানকে আমরা কি স্রেফ পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করব? নাকি তাদের এই লড়াকু মানসিকতাকে কুর্নিশ জানিয়ে ফুটবলকে আরও বড় করার সুযোগ করে দেব?
ঢাকার টিএসসি এলাকায় আজ বিকেলে দেখা গেল এক চিত্র। একপাশে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের সমর্থকদের তপ্ত বিতর্ক, অন্যপাশে টি-শার্ট পরা এক দর্শক একা বসে খেলছেন কেপ ভার্দের জয়ের স্বপ্ন। তার মতে, ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা সবসময়ই ফেভারিট, তারা জিতলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু কেপ ভার্দের মতো দেশ, যাদের কোনো বড় ফুটবল ঐতিহ্য নেই, তারা যখন বড় বড় দলকে আটকে দেয়, তখন ফুটবলের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। আমরা যদি এই ছোট দলগুলোকে সমর্থন না করি, তবে ওরা বড় হবে কীভাবে? ফুটবল তো শুধু বড় দলের কুচকাওয়াজ নয়।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, কেপ ভার্দের এই উত্থান কেবল একটি ড্র বা জয় নয়, এটি একটি বার্তা। গোলকিপার ভোজিনিয়ার গ্লাভস আর দলের ইস্পাত-কঠিন রক্ষণভাগ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, মাঠে নামার আগে কোনো দলই ছোট নয়। তিন ম্যাচে তিন ড্র করে গ্রুপ থেকে উঠে আসার এই গল্পটি আগামী কয়েক দশক ধরে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
এদিকে, মায়ামির স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দে লড়াইয়ের দামামা বাজবে, তখন বাংলাদেশে ব্রাজিল সমর্থকদের বড় একটি অংশ যে কেপ ভার্দের পতাকাতলে জড়ো হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর্জেন্টিনাকে হারানোর নেশায় হোক বা ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায়—ব্রাজিল সমর্থক সোহেল আহমেদ বলেন, শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু। আর তা ছাড়া, ছোট দেশের জয় দেখার যে আনন্দ, তা অন্য কোথাও নেই।
তবে বাস্তবতা হলো, মাঠের লড়াইয়ে ফেভারিট হিসেবেই নামছে আর্জেন্টিনা। মেসির জাদুকরী পা আর অভিজ্ঞতার পাহাড়ের সামনে কেপ ভার্দের লড়াই হবে ডেভিড বনাম গোলিয়াথ গল্পের আধুনিক সংস্করণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি কেপ ভার্দে বাজিমাৎ করে ফেলে, তবে সেটি হবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকথা।
শেষ পর্যন্ত জয় যারই হোক, ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই ম্যাচটি এক অনন্য উৎসব। বড় দলগুলোর অজেয় অহংকারে ছোট দলগুলো যখন চিড় ধরিয়ে দেয়, তখনই তো ফুটবল সার্থক। আর তাই, ফুটবলের বৃহত্তর স্বার্থে কেপ ভার্দের মতো দলের হাত শক্ত করা যে আজ সময়ের দাবি, তা বলাই বাহুল্য।


