জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ডাক্তারদের কাছে হাতে কেমিক্যাল বার্ন নিয়ে এলেন একজন রোগী। তিনি বললেন, ভাতের মাড় ফেলতে গিয়ে এমন পুড়েছেন। কিন্তু পোড়ার ধরনটা ঠিক ঘরের কাজ করতে গিয়ে পোড়ার মতো নয়। বরং এক জায়গায় গভীর ক্ষত, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ডিপ বার্ন। সাধারণত ঘরের কাজ করতে গিয়ে যে ধরনের ক্ষত হয়, সেগুলো ডিপ বার্ন হয় না। আবার ক্ষত এক জায়গায় সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফোসকাও পড়ে। কিন্তু এই বার্নগুলো তেমন নয়।
প্রথমদিকে ডাক্তারদের তেমন কিছু মনে না হলেও, আস্তে আস্তে তারা খেয়াল করেন, এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেশিরভাগই ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারী। সবারই প্রায় একই ধরনের বার্ন। কারণ জিজ্ঞেস করলেও তারা লুকোছাপা করেন। ডাক্তারদের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক লাগে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনাটি শুধু ঢাকায় নয়; খুলনা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও এমন কেস বাড়ছে। তখন ডাক্তারদের সন্দেহ আরও গভীর হয়।
রোগীদের জিজ্ঞাসা করলে শুরুতে তারা কিছু বলতে চাইতেন না। পরে ডাক্তাররা তাদের আলাদা করে ডেকে কথা বলতে শুরু করেন। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সামনে কথা বলতে চাইতেন না। এমনকি পরিবারের কাউকে জানানো হবে না, এই আশ্বাস দেওয়ার পর ধীরে ধীরে রহস্যের কারণ জানা যায়।
এই মানুষগুলো জীবনের নানা সমস্যায় জর্জরিত। কোনো একটি সমস্যা সমাধানের জন্য তারা নানাভাবে চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন একটি ফোন আসে। মুসলমান হলে কলকারী নিজেকে জিন বশ করা কোনো হুজুর হিসেবে পরিচয় দেয়, আর অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে সে অনুযায়ী সন্ন্যাসী, ফকির বা অন্য কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির পরিচয় দেয়। সমস্যা সমাধানের গ্যারান্টি দিয়ে কিছু কাজ করতে বলা হয়। বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে প্রায়ই আনতে বলা হয় পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট। এটি সাধারণত অ্যান্টিসেপটিক ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাই ফার্মেসিতে সহজেই পাওয়া যায়।
এরপর সেই হুজুর বা সন্ন্যাসী কিছু নিয়ম-কানুন মানতে বলেন। সবশেষে ভিডিও কলে কথা বলেন। এক পর্যায়ে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের সঙ্গে চিনি হাতে রাখতে বলা হয়।
এরপর কী হয়?
পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট একটি জারক এবং চিনি একটি বিজারক। এই দুটি একসঙ্গে হাতে রাখা হলে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয়। তৈরি হয় তীব্র তাপ, আগুন ও ধোঁয়া। হাতে রাখতে না পারলে বড় কোনো ক্ষতি হবে, এমন ভয় দেখিয়ে যতক্ষণ সম্ভব এটি ধরে রাখতে বলা হয়। একসময় চামড়া ও মাংস ভেদ করে এই বিক্রিয়া হাড়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন মানুষ চাইলেও আর ধরে রাখতে পারে না; ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
আপনি নিশ্চয়ই ভাবছেন, এসব ঘটানোর উদ্দেশ্য কী?
এরপরই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। টাকা দিলে কীভাবে ক্ষত সারানো যাবে তা জানানো হবে, অথবা টাকা না দিলে ক্ষত কখনো সারবে না, এমন ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। কোথাও কোথাও ৭০ কেজি বা ১–২ মণ মিষ্টির সমপরিমাণ টাকাও দাবি করা হয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার কী জানেন?
এই হাতগুলো আর কখনো পুরোপুরি ঠিক হয় না। হাত পুড়ে যাওয়ার পর রোগীরা জেলা হাসপাতাল বা সরাসরি ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে আসেন। চিকিৎসকরা প্রথমে ক্ষতস্থানে ড্রেসিং করেন এবং ডিপ বার্নের ক্ষেত্রে রক্তনালি জমাট বাঁধার আশঙ্কায় রোগীকে কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখেন। পরিস্থিতি গুরুতর হলে বা ফোর্থ-ডিগ্রি বার্ন হলে আক্রান্ত অংশ কেটে ফেলতে হয়।
তবে ডিপ বার্নের ক্ষেত্রে অ্যাবডোমিনাল ফ্ল্যাপ নামের একটি প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। এই পদ্ধতিতে পেটের অক্ষত চামড়া ও টিস্যু হাতের ক্ষতস্থানে এনে ২১ দিন যুক্ত করে রাখা হয়। পরে অপারেশনের মাধ্যমে আঙুলগুলো আলাদা করা হয়।
নিয়মিত ড্রেসিং, অপারেশন ও থেরাপিসহ পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। তবে এত কিছুর পরও পুড়ে যাওয়া হাত কখনো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে আসে না; কেবল ব্যবহারযোগ্য পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়।
এই চক্রটি কখনো তান্ত্রিক, কখনো কবিরাজ, আবার কখনো হুজুর সেজে বহু মানুষের সর্বনাশ করে চলেছে। তারা এমন মানুষদের টার্গেট করে, যারা জানেন না পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কী বা এর সঙ্গে চিনি মেশালে কত ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। বিপদে পড়া মানুষগুলো সরল বিশ্বাসে নিজেদের আরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এখনও এই চক্রের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। খুব দ্রুত এই চক্রটিকে শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা না গেলে আরও কত নিরীহ মানুষের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা কেউ বলতে পারে না।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড



পাঠকের মন্তব্য