শহরের কোলাহল আর ইতিহাস যেখানে এসে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অন্ধকার কোণে এক অদ্ভুত প্রপঞ্চের জন্ম হচ্ছিল। প্রপঞ্চটি দেখতে কোনো অলৌকিক ঘটনার মতো নয়, বরং অতীব সাধারণ ও মলিন—একজন ভবঘুরে, হাতকাটা ময়লা গেঞ্জি, আর উস্কোখুস্কো চুল।
মানুষটির নাম রাজিব শাহ। ঢাকা শহরের পিচঢালা রাস্তায় যাদের কোনো ঠিকানা থাকে না, সে সেই দলেরই একজন ছিল। কিন্তু গৃহহীনদেরও যে একধরনের অপ্রকাশিত ক্ষুধা থাকে—ক্ষমতার ক্ষুধা, আস্তানার ক্ষুধা, এবং সর্বপরি মানুষের ভয় ও ভক্তিকে নিজের অনুকূলে আনার ক্ষুধা—তা প্রথম প্রকাশ পেল যখন সে উদ্যানের মুক্ত মঞ্চ আর থিয়েটার হলের মধ্যবর্তী নীরব ঘাস কেটে এক খণ্ড জমিতে নিজের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করল। শুরুটা হয়েছিল অত্যন্ত বিনম্রভাবে। কারণ, চতুর প্রতারণা সব সময়ই অত্যন্ত বিনম্র বেশে আত্মপ্রকাশ করে।
রাজিব শাহ প্রথমে সেখানে চাল ও ডালের দান ছিটিয়ে ধান চাষের চেষ্টা করল। যেন সে কোনো সুফি সাধক, প্রকৃতির বুকে জীবন ফোটানোই তার সাধনা। পথিকেরা হেঁটে যাওয়ার সময় দেখল এক উদাসীন বাউল রূপী মানুষকে। সে মাটির গায়ে ফুলগাছ লাগাল, সুন্দর করে ছোট এক চিলতে বাঁশের বেড়া দিল। শহরের যান্ত্রিক মানুষ ভাবল—আহা, এক নিঃস্ব মানুষের প্রকৃতি প্রেম! কিন্তু প্রকৃতি প্রেম ছিল কেবল প্রথম পর্দা।
একদিন দেখা গেল, বাঁশের কাঠামোর ওপর টাঙানো হয়েছে একটি নীল রঙের নোংরা ত্রিপল। ত্রিপলের নিচে রাখা হলো একটি প্লাস্টিকের বদনা, কয়েক হাত জায়নামাজ, আর একটি জরাজীর্ণ কোরআন শরীফ।
যে জমিতে কাল পর্যন্ত কেবল ঝরা পাতা আর গাঁজাসেবীদের পদচিহ্ন ছিল, সেই জমি এক রাতের ব্যবধানে পরিণত হলো "আল্লাহর ঘর"-এ। রাজিব শাহ আর কেবল রাজিব শাহ রইল না, সে রাতারাতি বনে গেল সেই পবিত্র ঘরের একমাত্র হেফাজতকারী।
সে মাটিতে ইটের গাঁথুনি দিতে দিতে বলে উঠল, এই জমি কোনো সরকারের নয়, এই জমি আল্লাহর। আর আল্লাহর ঘরে সালাত আদায় করতে আবার কিসের অনুমতি? শব্দগুলো বাতাসের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। এই যুক্তি এতটাই প্রাচীন এবং নির্মম যে, একে খণ্ডন করার দুঃসাহস কোনো সাধারণ বিশ্বাসী মানুষের থাকে না। ঠিক যেভাবে একসময় প্রত্যন্ত এক অজপাড়াগাঁয়ে পরিত্যক্ত একটি পীরের কবরকে লাল শালুতে ঢেকে মজিদ ঘোষণা করেছিল—তোমরা অজ্ঞ, তোমরা বেখবর!
রাজিব শাহ মজিদের মতো প্রাচীন কোনো পীরের খাস মুরিদ হওয়ার ভান করেনি; সে আধুনিক যুগের কৌশল বুঝেছিল। সে বুঝেছিল শহরের মানুষের ধর্মভীরুতা, আর বুঝেছিল ক্যামেরা বা স্মার্টফোনের ক্ষমতার কথা। বাঁশের খুঁটিটি যখন মাটিতে পোঁতা হচ্ছিল, তখন কেবল একটি অস্থায়ী কাঠামোর ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল না, বরং সেখানে পোঁতা হচ্ছিল ধর্মের নামে ভূমি দখলের এক অতি পরিচিত, সুপ্রাচীন লালশালুর বীজ।
২
বিশ্বাস আর অন্ধতার মাঝে ব্যবধান খুব সামান্য। সেই সামান্য ব্যবধানটুকুতেই গড়ে ওঠে প্রতারকের সিংহাসন।
যে খেলা আগে চলত কেবল গ্রামীণ অন্ধকারের আড়ালে, রাজিব শাহ তাকে টেনে নিয়ে এল একুশ শতকের ডিজিটাল আলোর নিচে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মজিদের হাতে ছিল শুধুই একটি লাল শালু কাপড় আর অভিশাপ দেওয়ার হুমকি। কিন্তু আধুনিক মজিদের হাতে ছিল এক ধারালো অস্ত্র—সোশ্যাল মিডিয়ার ক্যামেরা এবং মানুষের সস্তা আবেগ।
উদ্যানের কোণে ইটের গাঁথুনি যখন একটু একটু করে উঁচু হচ্ছিল, রাজিব শাহ তখন তৈরি করছিল তার ভাবমূর্তি।
সে বোতল কুড়াত। দিনে বোতল কুড়িয়ে সামান্য টাকা উপার্জন আর রাতে সেই টাকার ইট কিনে মসজিদ বানানোর রূপকথা সে চমৎকারভাবে বিক্রি করতে শুরু করল। পকেটে স্মার্টফোন নিয়ে ঘুরে বেড়ানো কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আর টিকটকারেরা খুঁজে পেল এক অমূল্য রত্ন। তারা ক্যামেরার লেন্স তার মুখের সামনে ধরে প্রশ্ন করল। রাজিব শাহ খুব বিজ্ঞের মতো, কিছুটা ভাবুক চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে উচ্চারণ করল তার মোক্ষম বাণী—সবকিছুর মালিক আল্লাহ, সরকারি জমি বইলা কিছু নাই।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল মহাকাশের তরঙ্গে তরঙ্গে। লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের বন্যায় ভেসে গেল তার সমস্ত অতীত। ক্যামেরার সামনে সে হয়ে উঠল এক পরম ধার্মিক, নিঃস্ব অথচ নিঃশ্বাসের মতো পবিত্র এক সাধক। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলল। তারা ভাবল, শহরের বুকে এমন এক প্রেমিক মানুষ বুঝি আর নেই! মানুষ তার বাক্সে টাকা ফেলতে শুরু করল, তাকে নির্মাণসামগ্রী এনে দিল, আর অনেকে এসে তার পেছনে সালাত আদায়ে দাঁড়িয়ে গেল। কেউ খেয়াল করল না, এই ভক্তির নিচে কতটা সচেতন ব্যবসা লুকিয়ে আছে।
ঠিক যেভাবে গ্রামের অসহায় মানুষগুলোকে একসময় পীরের গজবের ভয় দেখিয়ে মজিদ নিজের অন্ন ও ক্ষমতার সংস্থান করেছিল, রাজিব শাহ ঠিক একইভাবে আধুনিক মানুষের সওয়াব অর্জন এবং দ্বীনের সেবা করার আবেগকে পুঁজি করল। সে কেবল বোতল কুড়ানোর টাকা দিয়ে ইট কেনেনি; ধর্মের নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন আদায় করছিল মোটা অঙ্কের চাঁদা।
কিন্তু পর্দার পেছনে দৃশ্যটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দিনের আলোর ক্যামেরা যখন বন্ধ হতো, যখন রাতের অন্ধকার নেমে আসত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘন গাছপালার ওপর, তখন মসজিদের নীল ত্রিপলের আড়ালে জ্বলত অন্য আলো। সুরার বাষ্প আর গাঁজার ধোঁয়া উড়ত সেখানে। যে স্থানটিকে সে আল্লাহর ঘর বলে দাবি করছিল, ধীরে ধীরে তা পরিণত হচ্ছিল তার নিজস্ব আখড়ায়—যেখানে ধর্মের পবিত্রতার ছদ্মবেশে চলত নেশার আড্ডা আর সন্দেহভাজন লেনদেন।প্রতারণা তখন পূর্ণতা পেয়েছিল। মজিদ যেমন লাল শালুর চাদর দিয়ে নিজের সমস্ত অপরাধ ঢেকে রাখত, রাজিব শাহও তেমনি একটি অস্থায়ী মসজিদের নাম ব্যবহার করে নিজের কুৎসিত অপরাধ সাম্রাজ্যকে ঢেকে ফেলেছিল পরম নিশ্চিন্তে। সে ভেবেছিল, ধর্মীয় চাদরটি এতই ভারী যে একে সরানোর সাহস কারও হবে না।
৩
সত্য যখন প্রকাশ পায়, তখন মিথ্যার বানানো চাদরগুলো কত অসহায়ভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
মিথ্যা দিয়ে গড়ে তোলা সাম্রাজ্য দেখতে যতই মজবুত মনে হোক না কেন, তার ভিত্তি থাকে ক্ষণভঙ্গুর বালুর ওপর। রাজিব শাহ ভেবেছিল, পবিত্রতার এই ছদ্মবেশ তাকে চিরতরে অধরা এবং অস্পর্শনীয় করে রাখবে। কিন্তু প্রতারক যখন তার ক্ষমতার চূড়ায় পৌঁছায়, তখন সে অন্ধ হয়ে যায় নিজেরই ভুল পদক্ষেপে। সোশ্যাল মিডিয়ার যে লেন্স তাকে রাতারাতি বীর বানিয়েছিল, সেই লেন্সই একদিন ঘুর গেল তার আসল রূপের দিকে।রাতের অন্ধকারে নীল ত্রিপলের আড়ালে কী ঘটে, তার কিছু ভিডিওচিত্র অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ল নেটদুনিয়ায়। যে হাতে কাল পর্যন্ত জপমালা আর জায়নামাজ শোভা পাচ্ছিল, সেই হাতে দেখা গেল গাঁজার কলকি আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী। দিনদুপুরে আল্লাহর ঘর-এর নামে তোলা চাঁদার টাকা রাতে কীভাবে রূপ নিত নেশার সামগ্রীতে, তা প্রকাশ পেতে সময় লাগল না।
শহরের সচেতন মানুষ আর স্থানীয়রা আঙুল তুলে বলতে শুরু করল—এ কোনো সাধক নয়, এ হলো এক ধূর্ত ভণ্ড, ধর্মের আড়ালে গড়ে তোলা এক মাদক কারবারি।
ঠিক তখনই উঠে এল আরেক বাস্তব চিত্র। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে মাত্র তিন থেকে সাত মিনিটের হাঁটা দূরত্বেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী হাজী শাহবাজ মসজিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, শাহবাগ থানা মসজিদসহ অন্তত পাঁচ-সাতটি সুবিশাল ও সুপ্রতিষ্ঠিত উপাসনালয়। সুতরাং, উদ্যানে ঘুরে বেড়ানো মানুষের সালাতের কোনো অভাব ছিল না।
প্রয়োজনটা কোনোদিনই মসজিদের ছিল না; প্রয়োজন ছিল রাজিব শাহের নিজস্ব এক রাজত্ব বা নবাবপাড়া গড়ে তোলার, যেখানে ধর্মের নামে সরকারি জমি দখল করে অবাধে চালানো যাবে সব অপকর্ম।
শরীয়তের আলেম ও ইসলামি পন্ডিতেরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন—অন্যের বা সরকারের জমিতে অনুমতি ছাড়া জোরপূর্বক মসজিদ বানানো শরীয়তসম্মত নয়, তা কেবল একধরনের অপরাধ। যে ধর্ম অন্যের অধিকার হরণ করতে নিষেধ করে, সেই ধর্মের নাম ভাঙিয়ে জমি দখল ছিল এক প্রকাশ্য প্রতারণা।
লালশালুর মজিদের ভণ্ডামি যেমন একসময় মহব্বত নগর গ্রামের মানুষের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, রাজিব শাহের বুদ্বুদও তেমনি একে একে ফাটতে শুরু করল। ভক্তির চাদর খসে গিয়ে বেরিয়ে এল এক গৃহহীন, সুযোগসন্ধানী মাদকসেবীর আসল চেহারা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, অন্যায় যত গভীরই হোক, রাষ্ট্রের আইন ও ইতিহাসের সত্য একদিন তার মুখোমুখি দাঁড়ায়ই।
৪
মহাকালের বিচারে কোনো মিথ্যাই চিরস্থায়ী আশ্রয় পায় না; বালুর বাঁধ একদিন ভেঙে পড়বেই।
ঢাকার আকাশে তখনো বর্ষার মেঘ জমেছিল, কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাতাসে বইছিল এক অন্যরকম পরিবর্তনের হাওয়া। সকালের সূর্য ওঠার পরপরই উদ্যানের নীরবতা ভেঙে গর্জে উঠল ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং শাহবাগ থানার সমন্বয়ে গঠিত ভ্রাম্যমাণ আদালত হাজির হলো রাজিব শাহের সেই কথিত নবাবপাড়ায়। যে নীল ত্রিপল, ইটের গাঁথুনি আর বাঁশের বেড়াকে রাজিব শাহ ধর্মের দোহাই দিয়ে স্পর্শাতীত করে রাখতে চেয়েছিল, আইনের বুটের শব্দে তার ভীতিহীন অহংকার মুহূর্তের মধ্যে চুরমার হয়ে গেল।
বুলডোজারের এক আঘাতেই মাটির সাথে মিশে গেল সেই অবৈধ আস্তানা। উচ্ছেদ হলো ত্রিপল, ভেঙে পড়ল ইট আর বাঁশের কাঠামো। কোনো অলৌকিক শক্তি এসে সেই ভণ্ডামির সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে পারল না। কারণ ইতিহাস যেখানে দাঁড়িয়ে আছে—যে মাটিতে মিশে আছে ১৯৭১ সালের রক্তস্নাত স্মৃতি ও সার্বভৌমত্বের চেতনা—সেখানে ধর্মের ভণ্ডামি দিয়ে তৈরি অবৈধ দখলের ঠাঁই হতে পারে না।
উচ্ছেদের পর উদ্যানের সেই কোণটিতে আবার ফিরে এল প্রকৃতির নীরবতা।
রাজিব শাহের এই আখ্যান আধুনিক সমাজের জন্য এক নির্মম দর্পণ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালশালু’ উপন্যাস যেখানে শেষ হয়েছিল, রাজিব শাহের পরিণতি ঠিক সেখান থেকেই শুরু। মজিদ একসময় গ্রামীণ মানুষের অজ্ঞতাকে পুঁজি করে এক মাজারের আড়ালে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। আর রাজিব শাহ শহুরে মানুষের আবেগ ও আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে এক ভুয়া মসজিদের আড়ালে গড়ে তুলতে চেয়েছিল নিজের ক্ষমতার আখড়া। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে মিথ্যার স্থায়িত্ব বড্ড ক্ষণস্থায়ী।
লাল শালুর কাপড় কিংবা নীল রঙের ত্রিপল—কোনো চাদরই চিরকাল ভণ্ডামি আর অপরাধকে ঢেকে রাখতে পারে না। সত্য যখন তার নিজস্ব দীপ্তি নিয়ে সামনে দাঁড়ায়, তখন ধর্মের নামে গড়ে তোলা সমস্ত অবৈধ তাসের ঘর ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আবার মুক্ত হলো, আর পেছনে রেখে গেল এক অমোঘ শিক্ষা—ভক্তির চেয়ে বিবেক বড়, আর ধর্মের সুরক্ষার চেয়ে ধর্মকে পুঁজি করা প্রতারকদের চেনা বহু গুণ বেশি জরুরি।



পাঠকের মন্তব্য