অভিভাবকহীন ৭০ লাখ শিশু রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার মিলে যাদের শৈশব কেড়ে নিয়েছে!

পঠিত ... ২ ঘন্টা ২৬ মিনিট আগে

বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজারের বেশি কওমি মাদরাসা রয়েছে, যেখানে পড়াশোনা করছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ শিশু-কিশোর। (জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্য ও কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর, যেমন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী।)

সংখ্যার দিক থেকে এটি দেশের মোট শিশু জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ। অথচ চরম নির্মম বাস্তবতা হলো, এই বিপুল সংখ্যক শিশুর জীবন কাটছে রাষ্ট্রীয় কোনো নজরদারি, সুরক্ষা আইন কিংবা সুনির্দিষ্ট শিক্ষা কাঠামোর বাইরে। তারা যেন এই স্বাধীন ভূখণ্ডের বুকেই সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন, অরক্ষিত এক ভিন্ন জগতের অধিবাসী।

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই আমাদের সামনে আসে একের পর এক বিভৎস দৃশ্য। কোথাও এক পিচ্চি শিশুকে খাটের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হচ্ছে, কোথাও বেতের বেপরোয়া আঘাতে শিশুর কোমল চামড়া কেটে রক্ত জমে কালচে-লাল দাগ হয়ে গেছে। কখনো খবরে আসে, শিক্ষকের নির্যাতনে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে মারা গেছে আট বছরের একটি শিশু। আবার কখনো অতি নীরবে চাপা পড়ে যায় শিক্ষকের হাত দিয়েই একের পর এক শিশুর যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার খবর।

আমরা প্রতিদিন এসব ছবি দেখি, ভিডিও দেখি, খবর পড়ি। দেখতে দেখতে এসব বিভৎসতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটা রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এক মুহূর্তের জন্য শিউরে উঠি, হয়তো ফেসবুকে দুটো সমবেদনামূলক বা ক্ষুব্ধ স্ট্যাটাস দিই, আর পরদিনই সব ভুলে যাই।

আমরা কি খেয়াল করেছি, একটা সমাজ কতটা অনুভূতিহীন হয়ে গেলে শিশু নির্যাতনের খবরগুলো স্ক্রল করে এড়িয়ে যাওয়া যায়? আমরা কি অবচেতনভাবেই ধরে নিয়েছি যে, এই শিশুদের কপালে অমানবিক মারধর, মানসিক নির্যাতন আর অবহেলাই লেখা আছে? আমাদের এই নীরবতা কি আসলে অপরাধের নীরব অংশীদারত্ব নয়?

এই দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আছে, রয়েছে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বরাদ্দ হয় শিশুদের বিকাশ ও সুরক্ষার নামে। শত শত দেশি-বিদেশি এনজিও কাজ করছে শিশু অধিকার নিয়ে। কিন্তু এই ৭০ লাখ কওমি শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে কারও কোনো দৃশ্যমান মাথাব্যথা নেই।

২০১১ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দেশের যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেওয়াকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করেন। এছাড়া ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৭০ ধারা অনুযায়ী, যেকোনো শিশুর প্রতি শারীরিক নির্যাতন, প্রহার বা নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন একটি সরাসরি জামিন-অযোগ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ কোথায়? রাষ্ট্র কেন কওমি প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রেণিকক্ষে বা বোর্ডিংয়ে শিশুদের ওপর চলা এই চরম অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মনিটরিং সেল গঠন করে না? কেন সেখানে আইনের শাসন পৌঁছায় না? একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে কীভাবে লাখ লাখ শিশু আইনি সুরক্ষাবলয়ের বাইরে থেকে যায়—এটা কি রাষ্ট্রযন্ত্রের এক চরম ও মার্জনাহীন ব্যর্থতা নয়?

রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি দায়ী আমাদের সমাজ এবং পরিবার। অনেক বাবা-মা জেনে-বুঝেই নিজ সন্তানকে এমন পরিবেশে ঠেলে দেন। সন্তানের শরীরে প্রহারের দাগ দেখেও, কিংবা শিশুটি কান্নাকাটি করে আর ফিরতে না চাইলেও, পরিবার তা চেপে যায়।

এর পেছনে কাজ করে শতাব্দীপ্রাচীন সেই দাসত্বমূলক ও অন্ধ ধারণা—মাংস আপনার, হাড্ডি আমার। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একজন অভিভাবক কীভাবে নিজের সন্তানের শরীর ও আত্মার ওপর অন্য একজনের এমন অমানবিক অধিকার মেনে নিতে পারেন?

অনেক অভিভাবক অবচেতনভাবেই সন্তানের শৈশব, শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তাকে তথাকথিত ধর্মীয় সম্মান বা পুণ্যের লোভে জুয়ার চাল হিসেবে ব্যবহার করেন। সন্তানের কান্না বা তার ওপর হওয়া অন্যায়কে তারা দ্বীনি শিক্ষার কঠিন পথ বলে পাশ কাটিয়ে যান। নিজের সন্তানকে ভালোবাসার নামে বলি দেওয়ার এই নির্মম মানসিকতার চেয়ে বড় অন্ধত্ব আর কী হতে পারে?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাগুলোর তথ্যমতে, শৈশবে ধারাবাহিক শারীরিক সহিংসতা, আতঙ্ক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরা তীব্র মানসিক ট্রমা এবং আচরণগত জটিলতায় ভোগে।

সহিংসতার মধ্যে বড় হওয়া এই শিশুরা যখন বড় হয়, তাদের স্বাভাবিক সহানুভূতি ও আবেগের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, বড় হয়ে তাদের অনেকেই আবার নতুন কোনো শিশুর ওপর একই ধরনের হিংস্রতা ও নির্যাতন চাপিয়ে দেয়।

এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখের সামনে গড়ে উঠছে একটি বিষাক্ত চক্র (Cycle of Violence)। আমরা এই শিশুদের শৈশবকে পিটিয়ে হত্যা করছি, আর তাদের পরিণত করছি একেকজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষে।

এই শিশুরা আজ কোথায় যাবে? সমাজ এদের কান্না শোনে না, রাষ্ট্র এদের নাগরিক অধিকারের তোয়াক্কা করে না, এমনকি তাদের নিজেদের বাবা-মাও আজ অন্ধ ও বধির।

আমরা কি এই অমানবিক চক্রেই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আটকে রাখব? নাকি সমাজ ও রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে এখনই কঠোর নজরদারি, আইনি পদক্ষেপ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেব? যদি আজ আমরা এই নিপীড়িত শিশুদের পাশে না দাঁড়াতে পারি, তবে ইতিহাস আমাদের কাউকেই মাফ করবে না।

প্রতিদিন নানা নেতিবাচক খবরে মনে হতেই পারে, কওমি মাদরাসার সব শিক্ষকই অত্যাচারী। কিন্তু ব্যাপারটা এমন নয়। এখানে আছেন মমতাময়ী ও স্নেহশীল শিক্ষকও। যারা সত্যিকার অর্থেই শিক্ষার্থীদের ভালোবাসেন। তাদের সুন্দর শৈশব উপহার দেওয়ার এবং সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সঠিক মনিটরিং না থাকলে আমরা সেই শিক্ষকদের চিনব কীভাবে? তাদের প্রাপ্য সম্মানই-বা দেব কীভাবে?

 

পঠিত ... ২ ঘন্টা ২৬ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top