আমি উত্তম, অতি উত্তম

১০৬ পঠিত ... ১১:৩৬, জুলাই ২৪, ২০২৬

 

বৃষ্টিটা তখন বেশ জমিয়ে নেমেছে। কলকাতার আহিরিটোলা স্ট্রিটের মাতুলালয়ের টিনের চালে ঝুমঝুম শব্দ। তারিখটা ৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬। বাইরের ওই অঝোর ধারার মধ্যেই আমার পৃথিবীর আলো দেখা।

মাতামহ কোলে নিয়ে মুখে এক গাল হাসি ফুটিয়ে বলেছিলেন, এ তো আমাদের উত্তম!

কিন্তু মা, চপলা দেবী, একদম খাঁটি বাঙালি মায়ের মতোই বেঁকে বসলেন। অত ভারিক্কি নাম নাকি কোলের পুতুলটার সঙ্গে মানাচ্ছে না! তিনি নাম রাখলেন 'অরুণ'। অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু ভাগ্যের কী অদ্ভুত টান! আমাদের পরিবারের এক গুরুদেব—শ্রীপূর্ণ সন্ন্যাসী—একদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত কথা বলে বসলেন। মা-কে ডেকে বললেন, বউমা, ওর নানার দেওয়া নামটাই কিন্তু ইতিহাস হয়ে থাকবে। এই ছেলে 'উত্তম' নামেই দেশজুড়ে আলো ছড়াবে।

মা তখন শুধু মৃদু হেসেছিলেন। সেই মধ্যবিত্ত গৃহস্থের সংসারে এক সাধুর মুখের কথাই যে জীবনের সবচেয়ে বড় চিত্রনাট্য হয়ে উঠবে, তা কে জানত?

আমাদের পরিবারটা ছিল ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের এক যৌথ পরিবার। বাবা সত্কারী চট্টোপাধ্যায় কাজের সূত্রে সিনেমাজগতের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন—মেট্রো সিনেমার প্রজেকশনিস্ট। তবে ঘরের ভেতরেই ছিল নাটকের আসল কারখানা। বাবা আর কাকারা মিলে গড়ে তুলেছিলেন 'সুহৃদ সমাজ' নামের এক নাট্যগোষ্ঠী।

আমার পড়ালেখার শুরুটা চক্রবেরিয়া হাইস্কুলে, আর তারপর সাউথ সাবার্বান স্কুলে। ১৯৪২ সালে সেখান থেকেই সেকেন্ড ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করলাম। তারপর ভর্তি হলাম গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে (আজকের গোয়েঙ্কা কলেজ)। হিসাব-নিকাশের খাতা খুললেই মনটা চলে যেত মঞ্চের আলোর নিচে। পোর্ট ট্রাস্টে যখন মাসিক ২৭৫ টাকার ক্লার্কের চাকরিটা পেলাম, সবাই বলল, অরুণ এবার সেটেল করে গেল।

কিন্তু সেই বয়সে আমার ভেতরে অন্য এক আলোড়ন। নিদানবন্ধু ব্যানার্জির কাছে সকালে গানের রেওয়াজ চলত। ফুটবলে, ভলিবলে, ক্রিকেটে গা ঘামাতাম; এমনকি তিন-তিনবার সাঁতারে চ্যাম্পিয়নও হয়েছিলাম। কুস্তি আর লাঠিখেলাও বাদ দিইনি। কিন্তু পোর্ট ট্রাস্টের ফাইলের আড়ালে আসলে বাস করত এক জেদী অভিনেতা।

১৯৪৭ সাল। ভারত স্বাধীন হচ্ছে, আর আমি স্টুডিওর আলো-ছায়ার খেলায় এক আনকোরা নাম। প্রথম সুযোগ এলো হিন্দি ছবি মায়াদোর-এ, একটা সামান্য এক্সট্রা হিসেবে। ছবিটা আলোই দেখল না! পরের বছর, ১৯৪৮-এ দৃষ্টিদান-এ অরুণ কুমার নামে একটু বড় চরিত্র পেলাম। ফল? সিনেমা হলে মাছি তাড়ানোর মতো অবস্থা!

পরের বছর কামনা ছবিতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ নায়ক হলাম। নাম নিলাম উত্তম চ্যাটার্জি। ফল আবারও শূন্য। এরপর মর্যাদা-তে নাম বদলে হলাম অরূপ কুমার। কিন্তু ভাগ্যের চাকা যেন উল্টো দিকেই ঘুরছিল। একটা, দুটো নয়... একের পর এক ছবি ফ্লপ করতে লাগল। টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় ট্রাম যাওয়ার শব্দেও যেন আমার নামটা ঠাট্টা হয়ে বাজত। মানুষ আড়ালে-আবডালে, এমনকি সরাসরিই আমাকে ডেকে বসাল, ফ্লপ মাস্টার জেনারেল।

মাঝে গৌরীকে বিয়ে করেছি (১৯৪৮), ১৯৫০-এ কোলে এসেছে ছোট্ট ছেলে গৌতম। চাকরি ছেড়ে অভিনয়ে পুরোপুরি নামব কি না, তখন তো ডাল-ভাতের জোগাড় করতেই নাভিশ্বাস উঠছে! রোজ রাতে ভবানীপুরের ঘরে ফিরে ভাবতাম—তবে কি এই পর্যন্তই? এই তিন অক্ষরের উত্তম নামটাই কি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে থাকবে?

নাকি অন্য কোনো এক ঝোড়ো রাতের মতো অন্য কোনো এক গল্প আমার জন্য অপেক্ষা করছিল?

সব ছেড়েছুড়ে আবার পোর্ট ট্রাস্টের ক্লার্কের টেবিলেই পাকাপাকি ফিরে যাব কি না, যখন এই দোলাচলে দিন কাটছিল, ঠিক তখনই আলোটা এসে পড়ল। সালটা ১৯৫২। পরিচালক নির্মল দে আমাকে ডেকে পাঠালেন বাসু পরিবার ছবির জন্য। ছবির মূল গল্পে এক সাধারণ পরিবারের টানাপোড়েন, আর সেখানেই আমি। ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে আসতেই একটা অলৌকিক কাণ্ড ঘটে গেল—যে মানুষটাকে এতদিন হলের টিকিট কাউন্টার বয়কট করছিল, তাঁর ছবি দেখতেই ভিড় উপচে পড়ল! এই ছবিতেই প্রথমবার আমার বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিল এক চটপটে তরুণী, নাম সুপ্রিয়া।

বাসু পরিবার-এর পর আর কোনো দ্বিধা রইল না। টেবিলের ফাইলপত্র গুটিয়ে পোর্ট ট্রাস্টের চাকরিটাকে চিরদিনের মতো বিদায় জানালাম।

তার কিছুদিন আগে অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল মহাশয় আমার দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বলেছিলেন, অরুণ বা অরূপ নয়, তোমার আসল নামেই ফিরে যাও। ১৯৫১ সালের সহযাত্রী ছবি থেকে তাই আমি পুরোপুরি উত্তম কুমার।

কিন্তু আসল ঝড়টা ওঠার বাকি ছিল তখনও। ১৯৫৩ সাল। আবারও নির্মল দে-র নির্দেশনায় এক নতুন ছবির সেট তৈরি হলো—সাড়ে চুয়াত্তর। আমার বিপরীতে নায়িকাটি তখন ইন্ডাস্ট্রিতে একদম নতুন, একটু লজ্জা-লজ্জা ভাব, কিন্তু চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা। নাম—সুচিত্রা সেন।

ক্যামেরার সামনে প্রথম যখন ও এসে দাঁড়াল, একটা অদৃশ্য রসায়ন যেন আমাদের দুজনকে ঘিরে ধরল। ছবিটা মুক্তি পাওয়ার পর যা হলো, তা রূপকথাকেও হার মানায়! টানা ৬৩ সপ্তাহের বেশি প্রেক্ষাগৃহে চলল শারে চুয়াত্তর। সিনেমা হলের অন্ধকার ঘরগুলো এক নতুন প্রেমের সাক্ষী হতে শুরু করল।

এরপর ১৯৫৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর—আমার জন্মদিনেই মুক্তি পেল অগ্নিপরীক্ষা। দর্শকেরা হলে ঢুকে যেন নিজেদের সমস্ত বাস্তবতা ভুলে যেতে লাগল। পর্দায় যখন আলো-ছায়ার খেলায় একটু নরম আলো এসে পড়ত, আর পেছনে সুরের মূর্ছনায় প্রেমটা ধীরে ধীরে দানা বাঁধত, বাঙালি তখন নিজের ভালোবাসার মুখ খুঁজে পেত আমাদের মধ্যে।

'উত্তম-সুচিত্রা' শব্দজোড়া আর শুধুই দুটি নাম রইল না; তা হয়ে উঠল বাঙালির আবেগের এক চিরন্তন প্রতীক।

পর্দার সামনে যখন একের পর এক ছবি সুপারহিট—চম্পাডাঙার বউ, শাপমোচন, সবার উপরে, সাগরিকা, হারানো সুর, পথে হলো দেরি, সপ্তপদী—তখন আমার ব্যক্তিগত জীবনেও এক অদ্ভুত দোলাচল তৈরি হচ্ছিল। সুপ্রিয়া দেবী ততদিনে আর কেবল এক সহ-অভিনেত্রী নন, আমার একলা জীবনের এক গভীর আশ্রয় হয়ে উঠেছেন। ১৯৬৩ সালে ভবানীপুরের পুরোনো অভ্যস্ত সংসার থেকে বেরিয়ে ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে তাঁর সঙ্গে এক নতুন জীবন শুরু করলাম। সমাজের চোখে হাজারো সমালোচনা, পত্রিকার পাতায় রসাল মুখরোচক আলোচনা—কিন্তু পর্দার বাইরের সব ঝড়ের মধ্যেও ক্যামেরার সামনে নিজের ভেতরের আলোটা নেভাতে দিইনি।

আর তারপর এলো সেই ফোনালাপটি। রিসিভারের ওপাশ থেকে এক গম্ভীর কিন্তু মার্জিত স্বর ভেসে এলো—

উত্তম, একটা নতুন চিত্রনাট্য লিখেছি। ট্রেনের ভেতরের গল্প। নাম 'নায়ক'। তুমি ছাড়া এ চরিত্র আর কেউ করতে পারবে না।

ফোনটা রেখেছিলেন সত্যজিৎ রায়।

সত্যজিৎ রায়ের সেই ফোনটা যেন জীবনের গতিপথটাই অন্য এক স্টেশনে পৌঁছে দিল। ১৯৬৬ সাল। তৈরি হলো নায়ক। ছবির মূল চরিত্র অরিন্দম মুখার্জি—পর্দায় সে এক ঝলমলে ম্যাটিনি আইডল, কিন্তু এক ট্রেনের ২৪ ঘণ্টার যাত্রায় তার মুখোশগুলো একটু একটু করে খসে পড়তে থাকে। ক্যামেরা যখন আমার মুখের কাছাকাছি আসত, আমার মনে হতো—এ তো শুধুই অরিন্দম নয়, এ তো আমার নিজেরই ভেতরের একলা মানুষটা! সাফল্যের একদম চূড়ায় পৌঁছে যাওয়ার পর যে তীব্র নির্জনতা মানুষকে ঘিরে ধরে, সেই আলো-ছায়ার খেলাটা রায় মশাই আমার ভেতর থেকে নিপুণভাবে টেনে বের করে এনেছিলেন।

বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া প্রশংসা আর জাতীয় পুরস্কারের আনন্দ ছাপিয়েও আমার মনে হয়েছিল—নায়ক যেন আমার জীবনেরই এক আয়না।

এরপর এলো চিড়িয়াখানা, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি (যা আমাকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার এনে দিল), চৌরঙ্গী, আর মুম্বাইয়ের বুকে আমানুষ-এর সেই অভাবনীয় সাফল্য। কাজের চাপ দিন দিন কেবল বাড়ছিলই। পর্দায় আমাকে দেখে মানুষ যখন হাততালি দিত, তখন আমার ভেতরের মানুষটা কিন্তু ক্লান্তিতে বুঁদ হয়ে আসছিল। ১৯৬৭ সালে হিন্দি ছবি ছোটিসি মুলাকাত প্রযোজনা করে এক বিরাট আর্থিক ধাক্কা খেয়েছিলাম। শরীরটাও প্রথমবার জানান দিয়েছিল, উত্তম, এবার একটু থামো।  কিন্তু আমার তো থামার জো ছিল না! আমার কাঁধে যে তখন টালিগঞ্জের শত শত মানুষের রুটি-রুজির ভার।

১৯৮০ সালের ২৩ জুলাই। সকাল থেকেই শরীরটা বেশ ভারী লাগছিল। ওগো বধূ সুন্দরী-র শুটিং সেট। বুকে একটা অস্পষ্ট ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠছিল, কিন্তু সহকর্মীদের কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দিলাম না। হাসিমুখে শট শেষ করলাম। রাতে বন্ধুদের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর আর চেপে রাখতে পারলাম না। বুকটা যেন চেপে আসছিল।

ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি থেকে নিজেই গাড়ি চালিয়ে বেলভিউ ক্লিনিকে গিয়ে ভর্তি হলাম। দিনটা তখন ২৪ জুলাইয়ে গড়িয়েছে।

হাসপাতালের সাদা চাদরে শুয়ে যখন ডাক্তারদের ছোটাছুটি দেখছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল জীবনের রিলটা যেন বড্ড দ্রুত ঘুরছে। ১৬ ঘণ্টার এক ক্লান্তিকর লড়াই। সুপ্রিয়া পাশে বসেছিলেন, চোখ দুটো জলে ভরা। ডাক্তারদের আপ্রাণ চেষ্টা, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি—কিছুই আর সেই মোহের চাকাটাকে ধরে রাখতে পারল না। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে সব শব্দ, সব আলো হঠাৎ করেই নিভে গেল।

পরদিন ২৫ জুলাই, কলকাতার আকাশটা যেন এক বিরাট শোকের চাদরে ঢেকে গিয়েছিল। ভবানীপুর থেকে কেওড়াতলা শ্মশানঘাট—রাস্তায় শুধু মাথা আর মাথা। লক্ষ লক্ষ মানুষের চোখ থেকে জল ঝরছে, ট্রাফিক থমকে গেছে, শহরের চাকা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানাতে। সত্যজিৎ রায় শ্মশানের এক পাশে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ গলায় বলেছিলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল আলোর মৃত্যু হলো... তাঁর মতো নায়ক আর আসবে না।

আমি হয়তো সেদিন কেওড়াতলার চিতার আগুনে ছাই হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমার অহংকার, আমার হাসি, আর পর্দার সেই মায়াবী আলোটুকু থেকে গেছে আপনাদের ড্রয়িংরুমে, ভালোবাসার স্মৃতিতে।

আমি অরুণ, আমিই অরিন্দম... আর দিনশেষে, আপনাদের ভালোবাসায়—উত্তম, অতি উত্তম।

 

১০৬ পঠিত ... ১১:৩৬, জুলাই ২৪, ২০২৬

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top