১২৭ বছরের 'পাপা' হেমিংওয়ে

৩১ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বলেছিলেন, লেখার কিছু নেই। যা করতে হয় তা হলো, টাইপরাইটারের কাছে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে রক্ত ঝরানো। তিনি অবশ্য রক্ত ঝরাতেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ, বিশ শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ওভারসাইজ জুতায় দাঁড়িয়ে বুক সমান উঁচুতে একটি বোর্ডে লেখালেখি করতেন। তবে লেখার কৌশল নিয়ে কথা বলতে তার বরাবরই ছিলো অনীহা। তিনি মনে করতেন, লেখালেখির একটি অংশ দৃঢ়, এ নিয়ে কথা বলায় তেমন ক্ষতি না হলেও আরেকটি অংশ ভীষণ ভঙ্গুর, কোমল। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এ নিয়ে কথা বলতে গেলে লেখার পুরো স্ট্রাকচারটাই ভেঙে পড়ে। শেষমেষ আর কিছুই থাকে না। এ কারণে হেমিংওয়ের মতো এক অসাধারণ গল্পবাজ, সূক্ষ হিউমারসম্পন্ন এবং বিস্ময়কর জ্ঞানী মানুষের লেখালেখির জগত নিয়ে অনেক ভাবনাই অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, বিভিন্ন সাক্ষাৎকার দেবার সময়ও প্রশ্ন আগেই শুনে উত্তর ভেবে রাখতে পছন্দ করতেন। প্রশ্ন আউটের মতো ব্যাপার খানিকটা। ভাগ্যিস হেমিংওয়ে এ সময়ে জন্ম নেননি। তাহলে তাকে বেস্টসেলার হবার জন্য নিয়মিত বইমেলায় গিয়ে ভক্ত-পাঠককূলের সাথে রীতিমত ভ্লগ করতে হতো!

 

 

কিউবার কোহিমার গ্রামের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জেলে সান্তিয়াগোর নাম মোটামুটি সবাই জানে। যিনি ৮৪ দিন চেষ্টার পর যিনি পেয়েছিলেন বিশাল বড় এক মার্লিন মাছ! এবং নিজেই বিড়বিড় করে বলেছিলেন, ম্যান ক্যান বি ডেস্ট্রয়েড বাট ক্যান নট বি ডিফিটেড।

কালজয়ী সেই লাইন; সেই ছোট্ট উপন্যাস পৌঁছে যায় পৃথিবীর আনাচে কানাচে। কিউবার কোহিমার গ্রাম কিংবা সান্তিয়াগো হয়ে ওঠে পৃথিবীর পাঠকের পরিচিত মুখ-জায়গা, আর হেমিংওয়ের হাতে আসে পুলিৎজার পুরস্কার। অবশ্য পরের বছরই (১৯৫৪) সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হেমিংওয়ে তার পুরস্কারের টাকা দিয়ে দেন জেলেগ্রাম কোহিনারের দরিদ্র জেলে পরিবারকে। কারণ একটাই। তাদের এই দরিদ্র জীবনের মানোন্নয়ন। তিনি হয়ে যান কোহিমার গ্রামের 'পাপা' হেমিংওয়ে!

 

বিশ শতাব্দীর এখনও সবচেয়ে পপুলার লেখক হেমিংওয়ে। ছোট, নির্মেদ বাক্যও যে অসাধারণ সাহিত্য হতে পারে তা হেমিংওয়ের আগে কেউ দেখাননি। কী লিখতে হবে তার চেয়ে বেশি তিনি জানতেন কী বাদ দিতে হবে।হেমিংওয়ে একে বলেন 'আইসবার্গ থিওরি'।

তার মতে, যদি গদ্যলেখক স্পষ্টভাবে জানেন যে তিনি কী লিখতে চান, তবে তিনি অনেক কিছু লেখা বাদ দিয়েও যেতে পারেন। যদি তার লেখা সত্যিই যদি ঠিকঠাক হয়, তাহলে পাঠক সেই অলিখিত বিষয়গুলোকেও এমনভাবে অনুভব করবেন; যেন লেখক সেগুলো স্পষ্ট করেই লিখেছেন।

হেমিংওয়ের লেখা অনুপ্রাণিত করেছে রেমন্ড কার্ভার, নরম্যান মেইলার, কর্ম্যাক ম্যাকার্থিসহ বহু লেখক সাংবাদিককে। জোয়ান ডিডিয়নের সংযমী গদ্যও অনেকটা হ্যাংওভারে থাকা হেমিংওয়ের লেখার মতোই মনে হয়। এক হেমিংওয়ে থেকে জন্ম নিয়েছেন আরও শ'খানেক লেখক-সাহিত্যিক।

 

একবার হেমিংওয়েকে জিজ্ঞেস করা হলো, সাহস কী? তিনি বললেন, প্রতিকূল পরিবেশেও মানুষ যখন তার মর্যাদা বজায় রাখতে চায়; সেটাই সাহস।

ফেয়ারওয়েল টু আর্মসে যুদ্ধরত সৈনিক ফ্রেডরিক হেনরি, বুড়ো সান্টিয়াগো কিংবা 'দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অফ ফ্রান্সিস ম্যাকম্বার'-এর অপমানিত স্বামী, যিনি শেষমেষ পরিণত হন এক নির্ভীক শিকারীতে-এরা সবাই হেমিংওয়ের গ্রেস বহন করেছেন।

সাহসের সংজ্ঞা, অর্থাৎ এই 'গ্রেস আন্ডার প্রেশার' জন এফ কেনেডির এত পছন্দ হয়েছিল যে ১৯৫৫ সালে কেনেডির বই 'Profiles in Courage' এ ব্যবহারের জন্য হেমিংওয়ের অনুমতিও নিয়েছিলেন।

তবে হেমিংওয়ের নায়কেরা গ্রেস দেখাতে পারলেও পাপা হেমিংওয়ে নিজের জীবনকে কতটুকু গ্রেস দেখিয়েছিলেন, সে প্রশ্ন আজীবনই থেকে যাবে। এই দুঃসাহসী নির্ভীক শিকারী, পৌরুষময় ব্যক্তিত্বের আড়ালে সর্বদাই লুকিয়ে ছিলো এক ভঙ্গুর মানুষ। পরিবারে মোট সাতজন আত্মহত্যাকারীদের একজন হয়ে নাম লেখালেন বিশ্বসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে।

 

হেমিংওয়ের মৃত্যুতে অন্ধকার নেমে আসে ক্যারিবিয়ান সাগরের কোলে ছোট্টো দ্বীপ কিউবার উত্তর কূলে অবস্থিত কোহিমারে। হেমিংওয়ের কল্যাণে যাকে চিনেছিল সারা বিশ্ব। কোহিমারে তিনি কাটিয়েছিলেন জীবনের অনেকটা সময়। অনেক মিটিং সমাবেশ শেষে ঠিক হলো জেলেরা তাদের নৌকার প্রপেলার সহ বিভিন্ন মেটাল অংশ একত্র করে গলিয়ে তৈরি করবে হেমিংওয়ের আবক্ষ ভাস্কর্য।

হেমিংওয়ে যেমন তাদের গ্রামকে পাঠকের মনে অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন, তেমনি গ্রামবাসীর পক্ষ থেকেও 'পাপা' হেমিংওয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা আর জেলে সত্ত্বার এক সংমিলিত প্রয়াস এই ব্রোঞ্জের অনিখুঁত ভাস্কর্য জ্বলজ্বল করছে ছোট্টো কোহিমারে।

৩১ পঠিত ... ৪ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top