ভয় পাবেন না। মাঝরাতে ভয় পাওয়া ঠিক না। তাছাড়া ভুত বলে কিছু নেই। তবে জ্বিন আছে। মানুষের সঙ্গে যে জ্বিন থাকে তার নাম ক্বারিন জ্বিন। এই জ্বিন মন্দ কিসিমের হয়। আমাদের মহামানব ছাড়া, জগতের সব মনুষ্যের সঙ্গে থাকা জ্বিন দুষ্ট প্রকৃতির। ভয় দেখায় নানান রুপ নিয়ে।
হয়তো ওয়াশরুমে গেলেন, ফিরে এসে দেখলেন আপনার মতোন কেউ একজন শুয়ে আছে বিছানায়। ভয় পাবেন না দেখে। আপনার ভয় পাওয়ার জন্য বলছি না, কিন্তু সতর্ক থাকবেন রাতে আয়না দেখার সময়। বিশেষ করে, ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় আয়না পুরোপুরি চক্ষের বাহিরে রাখবেন। ভুলেও যেন চোখ না যায়। অশরীরি সাধারণত আয়নায় দেখা যায়। হতে পারে হুট করে চোখ পড়ল, আর দেখলেন, ঝাঁকড়া চুলে কেউ দাঁড়িয়ে আছে ওখানে, মাথা একদিকে কাত হয়ে ভেঙে আছে প্রায়। কিংবা চোখ বড়ো করে এক বৃদ্ধ সরাসরি তাকিয়ে আপনার দিকে। কথা বলার চেষ্টা করছে। ঠোঁটের কোন বেয়ে গড়াচ্ছে ক'ফোঁটা রক্ত।
ভয় পাবেন না। দেখবেন আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি না। তবে হ্যালুসিনেশন হতে পারে। আর হ্যালুসিনেশনে সব সম্ভব। মন দুর্বল থাকলে এই জিনিস বিশাল প্যারা দেয়। হয়তো পরিচিত এমন কোনো মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যেতে পারে, যিনি ছয় বছর ধরে মৃত। অথচ সোফায় বসে আছেন অন্ধকারে তখন, মেঝেতে শুয়ে আছেন উপুড় হয়ে কিংবা শুনলেন বারান্দা থেকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ। কৌতুহল বশত লাইট জ্বালাবেন। দেখবেন, কিচ্ছু নেই।
আমি সাবধান করছি, এইরকম অদ্ভুত পরিস্থিতিতে চট করে লাইট জ্বালাবেন না। চোখের কিংবা কানের ভুল মনে করে লাইট জ্বালিয়ে ভাবলেন কিছুই দেখবেন না, আলো মানেই সাহস, এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। লাইট জ্বালাতে গিয়ে সাবধানে সুইচ হাতাবেন। নাহলে টের পাবেন সুইচের জায়গায় একটা হাত আগে থেকেই রাখা। আপনি অন্ধকারে ঐ হাত হাতড়াতে গিয়ে এও টের পেয়ে যাবেন, আঙুলে তার লম্বা লম্বা নখ। হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে লাইট জ্বালাবেন, দেখবেন কেউ একজন দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাঁটুগেড়ে বসে আছে। মাথা দুই হাঁটুর ভেতর গুঁজা তার। আপনি শব্দ করলেন ভয়ে আর তখুনি ভুলটা করলেন। হাঁটুগেড়ে বসে থাকা কেউ একজন মাথা তুলে দেখলো আপনাকে। ঐ মুখের দিকে তাকিয়ে আপনার হার্টবিট হুট করেই বন্ধ হয়ে গেল।
হবে বলছি না, হতে পারে এমন। বিছানায় একা থাকলে আরও বড়ো ঝামেলা। কখনো সখনো ডানপাশ হয়ে শুলে কাঁধে শ্বাস প্রশ্বাস ছুঁয়ে দেয় কারোর। ঝট করে এপাশ ফিরে তাকালেই সব ফাঁকা। পা সোজা করে শুলে মনে হয় পায়ের তালুতে কেউ হাত দিচ্ছে, সুড়সুড়ি দিচ্ছে। এইগুলো স্বাভাবিক। উঠে দেখতে যাবেন না। ভয় পাবেন। ভয় পেলে ক্ষতি। কারণ ভয়ের থেকে আপনি নিজেই নিজেকে বিপদে ফেলে দেবেন। মস্তিষ্ক তখুনি একটা কিছু তৈরী করে আপনাকে দেখিয়ে ছাড়বে।
ধরেন ডান পাশ ফিরে শোয়ার পর কাঁধে কারোর উষ্ণ শ্বাস প্রশ্বাস ছুঁয়ে যেতেই ঝট করে এপাশ ফিরে দেখলেন এক বৃদ্ধা শুয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে আপনার দিকে। থুরথুরে ঝুলানো চামড়া গালে, দাঁত নেই, জিহ্বা বের করে ঠোঁটের একপাশ চেটে আপনাকে ভাঙ্গা স্বরে বলল, 'এট্টু পানি দে দেখি... তিয়াস লাগছে!'
এগুলো মনের ভয়। ডান পাশ ফিরে শুয়ে পড়বেন আবার। বলুক বৃদ্ধা তিয়াস লাগছে। পানি আনতে যাবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, দরজা ধাক্কা দিতে পারে অনেকসময়। অশরীরি এটা করে। পরিচিত স্বরে ডাক দেয়। আপনার নাম কুসুম হলে খুব মায়া নিয়ে ডাকবে, 'কুসুম... ও কুসুম। একটু খোল দরজাটা।' খুলবেন তো ঝুলবেন।
আমার এক চাচাকে একবার গভীর রাতে পরিচিত স্বরে ডাক দিয়ে কবরস্থানের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বেঁচে ফিরেছেন অনেক কষ্টে। উনি সাহসী, তাই ফিরেছেন। ভয় পেলে বেঁচে ফিরতে পারবেন না। দরজায় নক দিলে জবাব দেবেন না প্রথম তিনবার৷ অশরীরি মাত্র তিনবার ডাকে। চতুর্থবার জবাব দেবেন। ওরা কান্না করতে পারে অনেকসময়। ফুসলাতে পারে বাইরে যাওয়ার জন্য। দরজা খুলে একবার চোখে চোখ রাখলেই সর্বনাশ।
আর, ছাদে কারোর খসখস শব্দ করে টেনে টেনে হাঁটার আওয়াজ শুনে সাহস দেখিয়ে ছাদে উঠে যাবেন না। কে রে- বলে শাসানোর চেষ্টাও করবেন না একদম। আওয়াজ করলে ওদের হাঁটার আওয়াজ বড়ো হবে। একসময় মনে হবে পুরো বিল্ডিং থরথর করে কাঁপছে। জ্ঞান হারাবেন তখন।
খুব প্রয়োজন না হলে কখনই ঘুমোনোর আগে বিছানার তলা পরীক্ষা করবেন না। মাঝরাতে ফিসফাস কিংবা কোনোকিছু নাড়াচাড়ার আওয়াজ শুনে কৌতুহলী হতে যাবেন তো পস্তাবেন। খবরদার! হয়তো খাটের তলায় উঁকি দেবেন আর দেখবেন নয়-দশ বৎসরের একটা বাচ্চা হামাগুড়ি দিয়ে মেঝে চাটছে। আপনার দিকে তাকিয়ে খিলখিল হেসে বলছে, 'আমারে কোলে নেন, এইহানে গরম!'
ভয়ে গলা শুকিয়ে আসবে আপনার। পানি খেতে মন চাইবে। তাই, পানি দিয়ে শেষ করি। আমাদের রাত্তিরে পানি খাওয়ার বাতিক আছে। খেতে হয়। রাতে উঠে পানি খাওয়ার সময় ভয় পাবেন না। জানালায় অনেকসময় চোখ চলে যায়। হুট করে হয়তো একটা হাত দেখে বসবেন, ওরা কিছু চেয়ে বসলেই ঝামেলা। পানি চায় অধিকাংশ সময়। এমনিতে দুয়েকবার হাত পেতে খুঁজে চলে যায়, কিন্তু ভয় পেলে জানালা গলিয়ে ভেতরে আসে। ভেজা শরীর। চোখের জায়গায় দু'টো গর্ত। এক কলস পানিতেও ওদের তৃষ্ণা মেটে না। তাই জানালায় তাকাবেন না।
সবচেয়ে বড় কথা, ভয় পাবেন না।



পাঠকের মন্তব্য