'যাহা কিছু নড়িতেছে, তাহাই বিরোধী দলের চক্রান্ত!’— গন্ডারীয় ডকট্রিন

পঠিত ... ৫৩ মিনিট আগে

2 (28)

১.

এক শিকারী আর তাহার চরম ভিতু বন্ধু জঙ্গল দিয়া হাঁটিতেছিল। হঠাৎ এক বিশাল গণ্ডার তাহাদের দেখিয়া খেপিয়া গিয়া বিকট হুঙ্কার দিয়া চার্জ করিল!

শিকারী অভিজ্ঞ লোক, সে টপাক করিয়া গাছে উঠিয়া পড়িল। কিন্তু ভিতু বন্ধুটি গাছে উঠিতে না পারিয়া প্রাণের ভয়ে দে দৌড়!

গণ্ডারও তাহার পেছন পেছন! বন্ধুটি দৌড়াইতে দৌড়াইতে দেখিল সামনে একখানা বড় গর্ত। সে আর উপায় না পাইয়া সোজা গর্তের ভিতরে লাফ মারিয়া দিল।

গণ্ডারটা গর্তের মাথার ওপর আসিয়া ঘোঁত ঘোঁত করিতে লাগিল।

কিছুক্ষণ পরে গণ্ডারটা খানিক সরিয়া গেল। বন্ধুটি সেই ফাঁকে গর্ত হইতে বাহির হইয়া আসিল। কিন্তু গণ্ডারটা আবার ঘুরিয়া দৌড় লাগাইতেই লোকটা আবার লাফাইয়া গর্তে গিয়া পড়িল!

গাছ হইতে শিকারী বন্ধু চিল্লাইয়া বলিল,

আরে বলদ, গর্তেই তো শান্তিতে ছিলি! বের হতে গেলি কেন?

গর্ত হইতে হাঁপাইতে হাঁপাইতে বন্ধু বলিল,

ধুর ব্যাটা! তুই কি ভাবছিস আমি গর্তে একা ছিলাম? গর্তের ভেতরে একটা ভাল্লুক বসে আছে!

আজ বিশ্ব গণ্ডার দিবস! তাহাতেই বলিলাম আর কী!

২.

পশুরাজ্যে কিছু প্রাণী তৈরি হইয়াছে যাহাদের কাজ ভাবে-ভঙ্গিতে লোকের মন ভোলাইয়া চলা! যেমন, বিড়াল, হরিণ বা পান্ডা! দেখিতেই ভালো লাগে! কিউট বলিয়া মনে হয়!

আর কিছু প্রাণী তৈরি হইয়াছে স্রেফ কোনো যোগ্যতা ছাড়াই ক্ষমতার গদি জবরদখল করিয়া রাখিবার জন্য। গণ্ডার হইলো সেই চিরস্থায়ী গদি-আঁকড়াইয়া-থাকা টিমের আজীবন সভাপতি!

মনুষ্য সমাজে কিন্তু আবার নিয়মখানা তেমন নয়! এইখানে ফার্স্টে একবার মিষ্ট কথা বলিয়া গদি দখল করিয়া লওয়া হয়, তাহারপর আবারও মিষ্ট কথায় জনগণের মাথায় হাত বুলাইয়া নিজেদের আখের গুছাইয়া লওয়া হয়!

যাহা হউক, বলিতেছিলাম গণ্ডারের কথা!

আপনি যদি কোনো গণ্ডারকে সামনাসামনি দেখিয়া থাকেন, আমি সিওর, আপনার মনে হইবে একখানা মেয়াদোত্তীর্ণ বুলেটপ্রুফ গাড়িকে কোটি টাকার বাজেট পাস করাইয়া ঢোলা চামড়ার ওভারকোট পরাইয়া ট্রাফিক জ্যামে নামাইয়া দেওয়া হইয়াছে!

ওদিকে আবার সেই চামড়ার ওভারকোটের সাইজ ট্রিপল এক্সএল! দরজিবাবু যেন মেজারমেন্ট না লইয়াই উহা বানাইয়া দিয়াছে, কারণ বাজেট পুরোটাই তো হাপিস হইয়া গিয়াছে! রিটার্ন দেওয়ার যেহেতু কোনো অপশন নাই, তাই বাধ্য হইয়া চামড়া ঝুলাইয়াই সে ‘উন্নয়নের জোয়ার’ দেখাইয়া বেড়াইতেছে!

এইবার আসি উহার মূল আকর্ষণে! ইহা তো আর বলিয়া দেবার কিছু নাই যে গণ্ডারের মূল আকর্ষণ হইতেছে তাহার নাকের ওপর হঠাৎ গজাইয়া ওঠা শিংখানা! অন্য প্রাণীদের কী আছে না আছে কহিতে পারি না, গণ্ডারের আছে নাকের ওপর খাড়া করা একখানা ট্রাফিক কোন! এইখানা মাঁগিয়া লইতে পারিয়াছে বলিয়াই উহা পশুসমাজে ‘ইশপেশাল’ ট্যাগটি হাতাইয়া লইয়াছে!

কিন্তু ব্রো, ঐ শিংটিও ‘পিওর ক্যাপ’ বলিয়াই প্রমাণিত! ইহা কোনো হাড় বা হাতির দাঁতের মতো লিটারেল জেম নয়! ইহা পিওর কেরাটিন দিয়া তৈরি- মানুষের নখ আর চুল যাহা দিয়া বানানো। মানে সোজা বাংলায়, গণ্ডার নিজের মাথার জমানো অপচ্ছায়াকে একটা রামদা বানাইয়া নাকের ওপর কাস্টমাইজ করিয়া লাগাইয়া ঘুরিতেছে- ঠিক যেমন পলিটিশিয়ানগণ সাজানো ইতিহাস, ফেইক ডিগ্রি, ব্লা ব্লা নাকের ওপর ঝুলাইয়া ঘুরিয়া বেড়ান!

কিন্তু বেচারা চিপা খাইয়া গিয়াছে চোখের জ্যোতিতে। একচোখা হইবার কোনো উপায়ই তাহার নাই, জ্যোতি তাহার এতই কম!

গণ্ডার হইতেছে শাসনব্যবস্থার সেই প্রতিনিধি, যে চশমা পরিয়াও নিজের এলাকার রাস্তাঘাট বা ফ্লাইওভারের গর্তগুলো পর্যন্ত দেখতে পায় না! গ্যাস-বিদ্যুৎ নাই, তাহাও তাহার চোখের অন্তরালে থাকিয়া যায়! তাহার ভিশন এতটাই মাইনাস যে, চোখের সামনে অনাহারে শুকাইয়া যাওয়া আমজনতাকেও সে ‘সুখী ও উন্নত নাগরিক’ ভাবিয়া আপ্লুত হয়।

এই চরম অন্ধত্ব আর চরম পাওয়ারের মিল-মিশেই তৈরি হইয়াছে গণ্ডারের মূল নীতি- ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’। গণ্ডারের ম্যানিফেস্টো একটাই। একদফাতেই সে চলে। কী তাহা?

“যাহা কিছু নড়িতেছে, তাহাই বিরোধী দলের চক্রান্ত! আগে উহাকে রাম-গুঁতান গুঁতাইয়া দমন করিয়া লই, বিরোধী দল না হইলে পরে শোকবার্তা পাঠানো যাইবে!”

ফলাফল? বাতাস আসিয়া যদি বনের একখানা শুকনা ঝরা পাতাকেও নাড়াইয়া দেয়, তাহা হইলেও গণ্ডার মনে করে,

গেল রে! আমার গদি উল্টাইয়া দেবার জন্য চক্রান্ত শুরু হইয়া গিয়াছে!

ব্যস! ‘গুঁতা মারো’ ফ্লেক্স চালু! আমি গুঁতা মারিতে পারি!

এইখানে নতুন ক্লাইম্যাক্স! তিন গজ দৌড়ানোর পর উহা মেমোরি লস খাইয়া ভুলিয়া বসে যে সে কেন দৌড়াইতেছিল! কারণ- সে আসলে পশুকুলের গজিনী! তারপর আপনি-ই একখানা বিশাল সংবাদ সম্মেলন ডাকিয়া নিজের জয় ঘোষণা করিয়া কাদা-পানিতে হুতাইয়া পড়ে!

গণ্ডারের এই অকারণ মেজাজ, চরম ইগো আর পুরু চামড়াই তাহাকে ‘পশুকুলের পলিটিশিয়ান’ রূপে মর্যাদা দিয়াছে! দেখিতেছেন না? দেশজুড়িয়া দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ বা গণদাবি যা-ই উঠুক না কেন- তাহাদের কান বা বিবেকের ভেতর কিচ্ছুই ঢুকিতে পায় না! জনগণ যতই চিল্লাচিল্লি করিয়া মরুক, অনায়াসে এসি রুমে বসিয়া ইস্পেশাল কফি আর বিরিয়ানি গলাধঃকরণ করিয়া শান্তির বাণী প্রদান করা যায়! কার্ডের গপ্পো ফাঁদা যায়!

সুতরাং, রাস্তা দিয়া যাইবার সময় যদি কখনো কোনো গণ্ডার মার্কা নেতার, উপস, সরি বলিতেছি- নেতা মার্কা গণ্ডারের চক্রান্তের মুখোমুখি পড়িয়া যান, একদমই দৌড়াদৌড়ি করিবেন না। দৌড়াইলেই ভাবিয়া বসিবে আপনি কোনো ডেডিকেটেড ক্যাডার! স্ট্যাচু হইয়া দাঁড়াইয়া থাকুন!

গণ্ডার আপনাকে অন্ধের মতো কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করিবে, নাকের রামদাটা একটু উঁচাইয়া গম্ভীর গলায় বলিবে,

উফ! দেশের প্রবৃদ্ধি এত বেড়েছে যে আজকাল মাঝরাস্তায় নান্দনিক সব ভাস্কর্য গজিয়ে উঠছে! স্লে করছে সবকিছু!

তারপর শান্ত মনে নিজের কাদার পুলে ফিরা গিয়া আরামের ঘুম ঘুমাইবে!

পঠিত ... ৫৩ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

গল্প

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি


Top