দুনিয়াটা সত্যিকার অর্থেই দুই ভাগে বিভক্ত- চা-খোর আর কফি-খোর! চায়ের লোকজনের কাজ হল শান্ত হয়ে বসে চেয়ে চেয়ে চা খাওয়া, আর কফি-খোরদের কাজ হলো কফি না পেয়ে লোকের সাথে চ্যাঁচামেচি করা!
কাকতালীয় মনে হতে পারে। কিন্তু সত্যই আজ সকালে আমাকে আমার এক বন্ধু আমাকে এক কাপ কফি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে বসল। আমন্ত্রণ বললে অবশ্য ভুল হবে, ওটা ছিল স্পষ্টত আক্রমণ!
পড়েছি বন্ধুর হাতে, কফি খেতে হবে সাথে!
তাকে বিনয়ের সঙ্গে বললুম, দ্যাখ ভাই, আমি স্বভাবজাত অলস লোক। আমার পক্ষে চা খাওয়া সহজ, কারণ চাকে চাওয়া যায়। কিন্তু কফি খাওয়া আমার ধাতে সইবে না।
বন্ধু অবাক হয়ে শুধাল, কেন রে শিবু? কফি খেলে ক্ষতি কী?
আমি বললুম, ক্ষতি মানে? কফি তো কোনো পানীয় নয়, ওটা হলো চরম কফ-এর কারণ! নামটার দিকেই চেয়ে দেখ না কেন- কফ-ই! অর্থাৎ, যা খেলে কফ হওয়া একেবারেই ইভিটেবল বা অবশ্যম্ভাবী, তা-ই তো কফি! তার ওপর ওতে নাকি ক্যাফেইন থাকে? যে খাবারে শুরুতেই 'ক্যাফ' রয়েছে, তা খেয়ে কাশি না উঠে কি আর উপায় আছে হে?
বন্ধু আমার ব্যকরণগত পাণ্ডিত্য দেখে ভিড়মি খেয়ে বলল, আহা শিবু, ভুল বুঝছিস! ব্ল্যাক কফি খেলে কিন্তু মানুষের চিন্তাশক্তি বাড়ে, মানুষ সৃষ্টিশীল হয়! ব্রেইন স্টিমুলেট হয়!
আমি চিন্তিত মুখে শুধালুম, সৃষ্টিশীল? অর্থাৎ, নতুন কিছু বানিয়ে ফেলার ক্ষমতা? তা কফি খেয়ে কেউ কি কখনো নতুন কোনো সৃষ্টি বানাতে পেরেছে? সৃষ্টি করতে গিয়ে অনাসৃষ্টি করেছে, এই খবর যে পাইনি; এই ঢের! তা ছাড়া চিন্তা বাড়ানো আমার মোটেও পছন্দ নয়, আমার চিন্তাভাবনা এমনিতেই অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে দেনার দায়ে ঋণী হয়ে পড়েছে। আর চিন্তাকে বাড়ালে সে তো সোজা গিয়ে দেনাদারের পাওনা মেটানোর চিন্তায় রূপ নেবে! ওসব বিপজ্জনক চিন্তা বাড়াতে আমি একদম রাজি নই!
আর বলি, ব্রেনকে স্টিমুলেট করবি কেন? ব্রেন কি তোর পাড়ার লাঠি-খেলা যে তাকে বাঁশি বাজিয়ে উসকে দিতে হবে? ব্রেন শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, ঘুমাতে দে না বাপু তাকে!
তা সে যাই বলি না কেন, বন্ধুটি দমবার পাত্রই নয়। জোর করে আমার সামনে এক বড় কাপের কাপুচিনো এনে হাজির করল। কাপের ওপর আবার সাদা দুধের ফেনা দিয়ে একখানি গোলাপ ফুল আঁকা!
আমি কাপটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললুম, দ্যাখ ভাই, আমি পেটের ভেতর চা-জল-ঝোল অনেক কিছুই পুরেছি, কিন্তু কোনো দিন দুধের ফেনা কি সাপের ফনা গিলে খাইনি! আর ওই যে ফুলটা বানিয়েছিস, ওটা তো আমার মৃত্যুর ওপর শ্রদ্ধা জানিয়ে আগাম দেওয়া পুষ্পস্তবক ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না!
তাও সে কিছুতেই শুনলে না! শেষে বন্ধুটির মন রাখতে বাধ্য হয়ে একখানা চুমুক মেরে দিলুম সেই কালকূট-এ!
প্রথম চুমুকটা পেটে যেতেই আমার মনে হলো, সরাসরি যমরাজের প্রাইভেট সেক্রেটারির সঙ্গে আমার করমর্দন হয়ে গেল! তিনিও সুযোগ বুঝে আমাকে একখানা উইঙ্ক করে গেলেন! তেঁতো মানে সে এক অবিশ্বাস্য তেঁতো, বাবা! মনে হলো কোনো এক দয়ালু ডাইনি তেঁতো নিমপাতা আর পোড়া কয়লা একসঙ্গে ব্লেন্ডারে পিষে তাতে সামান্য গরম জল ঢেলে সুন্দর করে কাপে পরিবেশন করে দিয়েছে!
মুখের বিকট অঙ্গভঙ্গি সামলে নিয়ে আমি বললুম, বাহ! দুর্দান্ত জিনিস তো রে!
বন্ধু বিজ্ঞের মতো হেসে বলল, বলিনি? একদম রিফ্রেশিং! তা চুমুক দিয়ে কী অনুভূতি হলো?
আমি পকেট থেকে তোয়ালে বের করে মুখ মুছতে মুছতে বললুম, অনুভূতি আর কী! প্রথমত, শিবরাম চাটুয্যের আয়ু যে আর বেশি দিন নেই; এই তেঁতো সত্যিটা একদম পরিষ্কার হলো! দ্বিতীয়ত, বুঝতে পারলুম 'কফি' জিনিসটা আসলে দুষ্টলোকের আবিষ্কার, যাতে মানুষ টাকা খরচ করে নিজের মুখে বিষ ঢেলে নিজেই নিজেকে শাস্তি দেয় আর বাঃ বাঃ করে! এর চেয়ে তো তিন টাকার চা খেয়ে বাকি সতেরো টাকা দিয়ে একখানা রসগোল্লা খেলে ইহকাল আর পরকাল; দুটোই অন্তত মিষ্টি হতো!
বন্ধু হতবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল। মুখে মাছি না ঢুকে মাছও একখানা ঢুকতে পাবে এমন তার হা! আর আমি ততক্ষণে কফির কফিন থেকে বাঁচতে এক দৌড়ে রাস্তার মোড়ের গোবিন্দের চায়ের দোকানে গিয়ে হাঁপ ছাড়লুম!
এই পোড়া ঝোল খেয়ে যদি মানুষ বেঁচে থাকে, তবে তো যমদূতদের চাকরি ছেড়ে দিয়ে চা-কফির দোকান খোলাই উচিত! এবারও যদি মনে হয় শিবরামের আত্মায় টান পড়েনি, তবে কিন্তু খোদ কফির কাছেই আবার জবাবদিহি চাইতে হবে!



পাঠকের মন্তব্য