প্রেমিকা একদিন বলল, আমাকে আবু বকর হতে হবে। আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। আবু বকর কেন হতে যাব? আবু বকর তো আমার ছোটবেলার বন্ধুর নাম। এখন দুবাই থাকে। প্রেমিকা কি আমারে দুবাই পাঠাইতে চায়? নাকি দুবাই গিয়ে আবু বকরের কাছ থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসতে হবে?
পরে বুঝলাম, এই আবু বকর সেই আবু বকর না। পাকিস্তানি নাটক দার-ই-নিজাত-এর আবু বকর। আবু বকর আদর্শ স্বামী, যে রাগ করে না, বউয়ের অতীত নিয়ে খোঁচা দেয় না, বউয়ের প্যানিক অ্যাটাক হইলে পাশে থাকে। বউয়ের পছন্দ মনে রাখে, মায়ের কথাও শোনে। মোটকথা, এমন এক পুরুষ, যার মধ্যে রাগ নাই, প্রতিশোধ নাই, অহংকার নাই। মনে হয়, লোকটা কোনো দিন যাত্রাবাড়ীর জ্যাম দেখে নাই। ব্যাংকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ায় নাই। আবু বকরের বাসায় মনে হয় লোডশেডিং হয় না।
আবু বকরের সবচেয়ে বড় শক্তি আবেগ নিয়ন্ত্রণ। স্বামী হিসেবে সে যত্নশীল, সহানুভূতিশীল এবং নিরাপদ। এই যুগে এমন পুরুষ দেখলে মেয়েরা প্রেমে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক।
আমিও আবু বকর হতে চাই।
কিন্তু আবু বকর হওয়ার পরীক্ষা দিতে গিয়ে আজ বিজয় সরণিতে আটকা পড়লাম।
অফিসে প্রেজেন্টেশন আছে। শার্ট ইন করা, চুল আঁচড়ানো, মুখে আত্মবিশ্বাসের ভাব। মনে মনে ভাবতেছি, আজকে বসের সামনে এমনভাবে কথা বলব, বসও ভাববে, ছেলেটার মধ্যে আবু বকর আবু বকর ব্যাপার আছে।
ঠিক তখনই গাড়ি থামল।
পাঁচ মিনিট গেল। দশ মিনিট গেল। পনেরো মিনিট গেল। গাড়ি নড়ার নাম নাই। বাইরে তাকিয়ে দেখি, মিছিল। কোন দলের মিছিল, প্রথমে বুঝি নাই। আমি গালি দেওয়া শুরু করলাম। কারণ আমার প্রেজেন্টেশন আছে। মিছিলের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নাই, কিন্তু আমার অফিসের সময়ের সঙ্গে মিছিলের একটা ঐতিহাসিক শত্রুতা আছে।
ত্রিশ মিনিট ধরে একই জায়গায় বসে আছি। শার্টের ইন খুলে গেছে। ঘামে পিঠ ভিজে গেছে। আমার ভেতরের আবু বকর এতক্ষণে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চলে গেছে। তার জায়গায় অন্য একজন এসেছে, যে মনে মনে মিছিলের প্রত্যেকটা ব্যানার খুলে ফেলতে চায়।
পরে শুনলাম, সরকারদলীয় লোকজনের কর্মসূচি। খবরটা শোনার পর আমার রাগ অনেকটা কমে গেল।
আশ্চর্য ব্যাপার! একটু আগেও যে মিছিলকে গালি দিচ্ছিলাম, এখন তার প্রতি আমার একধরনের রাজনৈতিক মমতা জন্ম নিল। মনে হলো, দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে একটু জ্যাম সহ্য করাই যায়। সরকারদলকে সাপোর্ট করলে সবই ভালো লাগে।
আবু বকরও মনে হয় সরকারদলের লোক। নইলে এত শান্ত থাকে কীভাবে?
হঠাৎ মনে পড়ল, প্রেমিকাকে আজ এখনো কল দেওয়া হয়নি। আবু বকর হলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বউয়ের খোঁজ নিত। আমি ভাবলাম, যাক, জ্যামে বসে অন্তত একটা ভালো কাজ করি। মোবাইলে এমবি শেষ। তাড়াতাড়ি এমবি ভরলাম। তারপর মেসেঞ্জারে কল দিলাম।
কল যায় না।
ভাবলাম, নেটওয়ার্কের সমস্যা। এবার সরাসরি ফোন দিলাম।
ওপাশ থেকে জানাল, মোবাইল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বাটন ফোন চালায়।
আমার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।
মন খারাপ করে ফেসবুক চালাইতেছি।
হঠাৎ একটা গান ফিডে আসল।
তুমি তার লাগিয়া এমবি ভরো, তার তো বাটন ফোন!



পাঠকের মন্তব্য