টাইম ক্যাপসুল

১৩ পঠিত ০ ... ২ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে

 

পাড়ায় একটা ছোট্ট ফার্মেসির দোকান আছে। এই দোকানটাকে সেভাবে কখনও লক্ষ্য করিনি। হঠাৎ সেদিন খেয়াল করলাম। দেখে মনে হলো, যেন ফার্মেসি না, টাইম ক্যাপসুল। সেই ৯০ দশকের দিকের মতো। খুব সরু একটা লম্বা দোকান। মানে, দুইজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়াতে পারবে না সেই দোকানে। কাঠের তাকে সারি সারি ওষুধের বাক্স, বোতল। আয়ুর্বেদিক ওষুধ আর তেলও চোখে পড়ল। এদিক-সেদিক ঝোলানো নানা জিনিস। খুব দামি বা বাইরের কিছু চোখে পড়ল না। তবে যেটা আকর্ষণ করল, তা হলো একটা ক্যাসেট প্লেয়ার, যেটাতে রেডিও শোনা যায়। সেখানে সম্ভবত বিবিসির ইংলিশ খবর বাজছে। বহু বহুদিন পর রেডিওর সেই হালকা খেরখেরে আওয়াজের সঙ্গে ইংলিশ খবর। এই দোকানটার মাঝখানে একটা কালো কাঠের চেয়ারে এক বৃদ্ধ বসা। সাদা আয়রন করা শার্ট আর ডার্ক ব্রাউন প্যান্ট খুব পরিপাটিভাবে ইন করা। চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমায় সাদা মোটা কাচ। তাঁর দুই হাতে ধরা ডেইলি স্টার। পুরু গোঁফ, পুরো সাদা। দাড়ি নেই। চুলগুলোও সব সাদা।

দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মনে হলো, সেই ছোট্টবেলার কোনো একটা দৃশ্যে চলে গেছি। থেমে ওনাকে কিছুক্ষণ দেখলাম। খুব ইচ্ছে হলো, ডেকে একটা-দুইটা কথা বলি। হঠাৎ উনি আমার দিকে তাকালেন, একটু কড়া গলায় বললেন, কী লাগবে?

আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম, নাপা আছে? উনি আবারও কড়া গলায় বললেন, না, নাই! বলেই পেপারে মুখ গুঁজলেন।

পাশের চা-পুরির দোকানের ছেলেটা বলল, ভাবি, উনি কিছু বেচেন না। আপনার কিছু লাগলে রাস্তার ওইপাড়ের ফার্মেসিতে যান।

আমি ছেলেটার দিকে হেসে দিয়ে বাসার পথে চললাম।

এরপর যতবার ওখান দিয়ে আসি, একবার হলেও আমি তাকাই। রেডিওর সাউন্ড শুনি। একদিন উনি আমাকে ডাকলেন, এদিকে আসেন।

আমি গেলাম। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি প্রতিদিন আমার দোকান দেখেন কেন?

আমি একটু ভয় পেলাম। তবুও বললাম, আংকেল, আপনার এই দোকানটা দেখলে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। আমার ছোটবেলায় অনেক দোকানে এমন ছিল। আবার বাসায় রেডিও শুনতাম এভাবে, তাই।

চশমার ফাঁক থেকে তাকিয়ে উনি বললেন, এটাই? আর কোনো কারণ নাই?

আমি বললাম, না, আংকেল। আর কী কারণ থাকবে, বলেন? আমি সারাদিন অফিস করে আসি, এই পথ থেকে হেঁটে যাই বাসায়...

হাতের পেপারটা ঝেড়ে রেখে বললেন, ঠিক আছে, বিশ্বাস করলাম। বলে উঠে দাঁড়ালেন। লম্বা দোকানটার ভেতরে গেলেন। আমি ভাবছিলাম, এই ফাঁকে চলে যাব নাকি। কিন্তু মুরুব্বি মানুষের সঙ্গে কথার মাঝখানে এভাবে চলে গেলেও তো ব্যাপারটা কেমন লাগে!

এর মাঝেই একটা ফোল্ডিং প্লাস্টিকের চেয়ার এনে আমাকে দিলেন। এরপর ইশারা করে দোকানের বাইরে সামনের জায়গাটায় বসতে বললেন। আমি বসলাম। উনি নরম সুরে পাশের চায়ের দোকানের পিচ্চিকে বললেন, পিচ্চি, দুই কাপ চা দাও তো! আপনি দুধ চা না রং চা?

আমি জবাব দেওয়ার আগেই পিচ্চি বলল, ভাবি দুধ চা ছাড়া আর কিছু খায় না! উনি হেসে দিয়ে বললেন, তাহলে আর কী, দিয়ে দাও!

এরপর আমার দিকে ঘুরে বললেন, আপনি আমার নাতি-নাতনির বয়সী হবেন। দেখে বোঝা না গেলেও আমার বয়স অনেক। আশা করি, আপনি এখানে কিছুক্ষণ বসলে সমস্যা নেই?

আমি বললাম, না, সমস্যা নেই। আমার হাজব্যান্ড হয়তো চলে আসবে, সে বাসার নিচে নেমেছে বলল।

উনি একটু হেসে বললেন, বেশ। সে আসলে তাকেও চা দেওয়া হবে।

আমি চুপ করে থাকলাম। আমার মনে অনেক প্রশ্ন, তবে আমি আসলে ঠিক সেই সময়টা কী করব, বুঝে উঠতে পারলাম না।

উনি নিজে থেকেই বললেন, আমাকে সবাই এখানে পাগলা চাচা ডাকে, আপনি জানেন?

আমি মাথা নেড়ে জানালাম যে জানি না।

উনি বললেন, পাগলা ডাকে কারণ আমি আমার বাবার ফার্মেসি ছাড়ি নাই। যেমন ছিল, তেমনই আছে। বাবার রেডিও, বাবার সেই সাজানো ফার্মেসি। সবাই দোকান ভেঙে নানা কাজ করেছে। আমারটার জন্যও অনেকে ঘুরঘুর করেছে, আমি দিইনি।

উনি থামলেন। আমার তখন মজা লাগছে। আমি ভাবছি, এই পেলাম নতুন গল্প! এর মাঝে পিচ্চি চা দিয়ে গেল। সঙ্গে দুটো করে পুরি।

উনি আমাকে ইশারায় খাওয়া শুরু করতে বলে নিজেও চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। তারপর নিজেই বললেন, আমার এই দোকানটার ওপর শকুনের নজর পড়েছে। আমার ছেলেরা এটা বিক্রি করে দিতে চায়। আমি চাই না। এই দোকানে আমি কিছু বিক্রি করি না। আমার অনেক ব্যবসা আছে। গুলশানে দুইটা ফ্ল্যাট আছে, বাড্ডায় একটা দশতলা বাড়ি আছে। আমার এই দোকান থেকে বিক্রি করে টাকা আয় করা লাগে না। আচ্ছা, আপনি কী করেন?

গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ প্রশ্ন শুনে একটু থতমত খেলাম। তারপর বললাম, আমি লেখালেখি করি।

ওনার চোখটা একটু উজ্জ্বল হলো! তারপর বললেন, বাহ! আজকালকার ছেলেমেয়েরাও লেখালেখি করে! কী লেখেন? গল্প, কবিতা? বই আছে?

আমি হেসে দিয়ে বললাম, সব লিখি, আংকেল। ফরমাশের লেখাও লিখি, নিজের মনের লেখাও লিখি। বই নেই এখনও!

আংকেল একটু মাথা নাড়লেন, বই থাকলে পড়তাম! লেখালেখি করেন বলেই কি আমার দোকানের দিকে আপনার আগ্রহ ছিল?

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, আপনি কীভাবে বুঝলেন, আংকেল? আসলে আমি সবখানে গল্প খুঁজে বেড়াই...

উনি এবার একটু হেসে দিয়ে বললেন, এখন বুঝতে পারছি, আপনার কেন আগ্রহ হলো! আমি তো ভেবেছিলাম, আমার অসভ্য ছেলেপেলেরা আবার আপনাকে আমার পেছনে লাগিয়েছে!

আমি হেসে বললাম, না, আংকেল, কেউ আপনার পেছনে লাগায়নি আমাকে। আমার জাস্ট কৌতূহল ছিল। আপনি এই দোকানটা কেন এভাবে রেখেছেন, আংকেল?

প্রশ্নটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর বললেন, এই দোকানটা আমার বাবার। এই এলাকার প্রথম ফার্মেসি এটা। এই দোকানে আমার ছোট থেকে বড় হওয়ার অনেক স্মৃতি। এই দোকানটা থেকেই আমার বাবা ইনকাম করে আমাদের সংসার চালিয়েছেন। আমাদের বড় করেছেন, লেখাপড়া করিয়েছেন মা। এই চেয়ারটা আমার বাবার। এই তাকগুলা আমার বাবার হাতের। এই রেডিওটায় আমাদের অনেক স্মৃতি! তাই এটাকে চালু রেখেছি। এই বয়সে এসেও এগুলোতে আমি বাবার ঘ্রাণ পাই, মা। আমার মনে হয়, আমার বাবা আছেন আমার পাশে এখনও। টাকা-পয়সার তো আমার অভাব নাই, আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এগুলো গেলে আর বাবার ঘ্রাণটা পাব না! বাবা মারা গেছেন আজ ৩০ বছরের ওপর... টাকা দিয়ে কি আর এগুলো ফেরত আসবে?

আমিও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। এরপর উনি হঠাৎ একটু হেসে বললেন, সমস্যা নাই। এখন থেকে তোমার সময় থাকলে আমার দোকানে এসো। আমরা চা-পুরি খেতে খেতে গল্প করব। আমার কাছে অনেক গল্প আছে! তুমি মজা পাবে। আবার লিখতেও পারবে!

এরই মাঝে খেয়াল করলাম, স্বামীপ্রবর গলির মাথায় এসেছেন। আমাকে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলেন। আমি ওনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। উনি ওকেও চা দিতে বললেন। তবে সময় না থাকায় সেদিনের চায়ের আড্ডা স্থগিত করতে হলো। কথা দিলাম, ছুটির দিনের সন্ধ্যায় তাঁর দোকানে চা-পুরির আড্ডা হবে।

বাসার রাস্তায় আসতে আসতে আবার একটু ফিরে তাকালাম। দেখলাম, উনি ফিরে যাচ্ছেন সেই টাইম ক্যাপসুলে। যেখানে থাকেন উনি, ওনার শৈশব আর বাবার ঘ্রাণ...

১৩ পঠিত ০ ... ২ ঘন্টা ৫০ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​