মাসকাওয়াথ আহসানের ধারাবাহিক নভেলা, প্রণব মুখুজ্জের অভিধান (ঊনবিংশ পর্ব)

১৯ পঠিত ০ ... ১১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে

 

খুব ভোরবেলা এক লোক একটা চিঠি নিয়ে আসে রাশেদ খানের কাছে। শেখ মুজিবের লেখা একটা চিঠি, তাতে লেখা, মওলানা সাহেব পয়সারহাটে যাচ্ছেন। তাঁর খাতির-যত্নের যেন কোনো কমতি না হয়। উনি আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন তো কী হয়েছে; উনি আমাদের লোক।

রাশেদ তার যুব সংগঠনের ছেলেদের জিন্নাহ কলেজে জনসভার মঞ্চ তৈরির নির্দেশ দেয়।

জামায়াতের আব্বাস শাহ আবার গলায় ফুলের মালা নিয়ে ফিরেছে। ফিরেই সে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে হইহট্টগোল শুরু করেছে। ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে জামায়াত নেতা মওদুদী কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবি তোলার প্রেক্ষিতে লাহোরে ম্যাসাকার হয়েছে। মওদুদী গ্রেপ্তার হয়েছে। আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। কিন্তু জামায়াতের বিক্ষোভের কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায়নি। বরং এই রাজনৈতিক চাপে মুসলিম লীগের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনকে বিদায় নিতে হয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারটা মিউজিক্যাল চেয়ারে পরিণত হয়েছে।

সবশেষে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে মুসলিম লীগ থেকে চলে এসে গড়া রিপাবলিকান নামে এক জোট।

পয়সারহাটের মুসলিম লীগ নেতা সলিম খান তাই আব্বাসের এই কাদিয়ানি-বিরোধী হট্টগোলের ভীষণ বিরোধী। তিনি তার মুসলিম লীগের কর্মীদের নির্দেশ দেন, মওলানা ভাসানী সাহেব যখন আসবেন, চোখ রাখতে হবে, আব্বাস যেন কোনো গোলমাল পাকাতে না পারে।

মওলানা সাহেব রেলস্টেশনে বক্তৃতা করে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাশেদ খানের অনুরোধে তিনি জিন্নাহ কলেজের সভাস্থলে আসেন।

দূরদূরান্ত থেকে লোক এসেছে ভাসানীকে একনজর দেখতে।

কলেজের বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে প্রণব মুখুজ্জে বলেন, ভালো হয়েছে, এই দাড়ি-টুপিওয়ালা লোকটা আওয়ামী লীগ থেকে বিদায় হয়েছে। বিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সে যায় না।

অধ্যক্ষ আজিজুল হক টিপ্পনি কাটেন, উনি নাকি আবার বামপন্থী।

রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে পয়সারহাটে মাথায় ছাতা ধরা আকাশ ওরফে আক্কাছ বলে, ইসলামি ধর্মীয় চিহ্ন নিয়ে ঘোরাঘুরি করা লোক কখনো বাম হয় না।

ভাসানী মঞ্চে উঠতেই তাঁর ভক্তরা প্রশ্ন করে, আপনিই না আওয়ামী লীগ বানালেন, সেটা ছেড়ে দিলেন কেন!

ভাসানী বলেন, পররাষ্ট্রনীতি আর পূর্ব বাংলার স্বশাসন বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সঙ্গে আমার মতভিন্নতা আছে। সারাজীবন জমিদারি উচ্ছেদের জন্য লড়াই করে এখন পশ্চিম পাকিস্তানের জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে আপস করে চলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ প্রতিটি মানুষের মধ্যে শক্তি দিয়েছে; সেই শক্তির গুণে সে নিজের ও সমাজের জন্য ভালো করতে সক্ষম। সেইখানে কোনো নতুন জমিদারি ব্যবস্থার অধীনে সে নিজেকে সমর্পণ কেন করবে? আমার পাকিস্তানের শখ মিটে গেছে। আমি ওয়ালাইকুম আসসালাম বলে দিয়েছি।

অধ্যক্ষ আজিজুল হক প্রণব মুখুজ্জেকে বলেন, ভাসানী এতক্ষণ যা বললেন, তা তো ভালোই বললেন!

তা বললেন, কিন্তু কলকাতার জমিদারির প্রতি অপছন্দের কথাও বলেছেন। ভারতমাতার প্রতি তাঁর তীব্র অনাস্থা আছে। এখন তাঁর পাকিস্তান-ভ্রাতার প্রতি তীব্র অনাস্থা জন্মেছে।

সুযোগ বুঝে আব্বাস ঠিকই তার দলবল নিয়ে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। সলিম খানের লোকেরা তাদের প্রতিহত করতে চেষ্টা করে।

ভাসানী তাদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, এই আল্লাহর দুনিয়ায় কে মুসলমান আর কে অমুসলমান, সেই রায় দেওয়ার মালিক আমরা তো কেউ নই। কেন মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করো তোমরা? ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি হচ্ছে সাম্যচিন্তা।

প্রণব মুখুজ্জের পেছনে দাঁড়িয়ে কালিদাস ফোড়ন কাটে, দয়ার সাগর এয়েছেন দেকচি!

গালে সুপারি পুরে মুখ টিপে হাসেন প্রণব মুখুজ্জে।

শ্যামাপদ মঞ্চে উঠে ঘোষণা দেয়, মওলানা সাহেব একা কোনো বাড়িতে নেমন্তন্ন নিতে রাজি হননি। তাই আপনারা যে যার জায়গায় বসুন। আপনাদের সবাইকে আপ্যায়িত করা হবে।

রাশেদ খান তার ছেলে নাঈমকে নিয়ে মওলানা সাহেবের কাছে এলে তিনি আয়াতুল কুরসি পড়ে শিশুটির মাথায় ফুঁ দেন। এরপর মওলানা সাহেবের ইমামতিতে জনসভার লোকেরা মাগরিবের নামাজ পড়ে। মোনাজাতে তিনি বলেন, আমার কৃষকের ফলানো পাট রপ্তানি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় পিন্ডিতে আলোকসজ্জা হয়; হে আল্লাহ, তুমি পাকিস্তানের শাসক জালেমদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করো।

নামাজ শেষে সবাইকে খাবার পরিবেশন করা হয়। সলিম খান ও কলিম চৌধুরী মওলানার পাশে বসে খান।

শ্যামাপদ কলেজের বারান্দায় প্রণব মুখুজ্জে ও অধ্যক্ষ আজিজুল হকের জন্য খাবার নিয়ে আসে।

আকাশ ওরফে আক্কাছ তাকে ঠাট্টা করে বলে, শ্যামাদা কি মুসলমান হইছো নাকি!

শ্যামাপদ উত্তর দেয়, তুমি যেইরকম হিন্দু হইছো, আমি সেইরকম মুসলমান হইছি। যাও গিয়া খাবার নেও। খাসির গোশত দিয়া খিঁচুড়ি গাপসিলাও।

১৮ তম পর্বের লিংক

১৯ পঠিত ০ ... ১১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে

আরও

পাঠকের মন্তব্য

আইডিয়া

রম্য

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top ​