কলকাতায় চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে ওঠে বাতেন। একতলা ছোটখাটো একটা বাড়ি। যূথিকা সেটাকে সাজিয়ে ছিমছাম করে রেখেছে। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বাতেন আশপাশটা একটু ঘুরে দেখতে যায়। রকে আড্ডা দিচ্ছিল কিছু লোক। হাড় জিরজিরে একটা লোক কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করে, বাঙ্গাল নাকি! বাকিরা হো হো করে হেসে ওঠে।
হাফপ্যান্ট পরে ডন-বৈঠক করতে করতে এক লোক বলে, চিত্তদার গেস্ট। ওপার থেকি এয়েচে।
হুপিং কাশিতে অস্থির হাড় জিরজিরে লোকটা জিজ্ঞেস করে, শুনেচি ওপারে আর একটা হিন্দুও বেঁচে নেই; সব নাকি কচুকাটা করেচে।
পাড়ার ডেঁপো লোক ঘনাদা জিজ্ঞেস করে, তোমার দাড়ি কোথায় গো! জিন্না তোমাদের নাকি দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক করে গেছে!
শরৎচন্দ্রের বই হাতে বসে থাকা পড়ুয়া পিন্টুদা বলে, গেস্টের সঙ্গে কি ভাটের আলাপ করচো তোমরা, বলো দিকিনি। যাও ভায়া, এলাকাটা ঘুরে দেকো।
বাতেন হচকচিয়ে সামনে এগোতে গিয়ে উষ্টা খায়। আবার রকে হাসির রোল পড়ে যায়। এদিক-ওদিক ঘুরে মিষ্টি কিনতে যায় এক মিষ্টির দোকানে। এক কেজি মিষ্টির অর্ডার দেয়।
ক্যাশে বসা ভুঁড়িওয়ালা লোকটি জিজ্ঞেস করে, ওপার থেকে এসেচো নাকি! এখানে যে বাসায় উঠেছো, সেখানে লোক কজন?
--আজ্ঞে, আমি মিলে তিনজন।
--আড়াইশো গ্রাম পানতোয়া নিয়ে যাও। তিনটে আমিত্তি নিলে দাম আরও কম পড়বে।
--দাদা, এক কেজিই দিন। প্রথম বেড়াতে এসেছি। যে বাসায় এসেছি, ওরাও আমার গ্রামের লোক। আড়াইশো গ্রাম নিলে কিপটা ভাববে!
--কী ভায়া, তোলা নিয়ে বেড়াও নাকি! পকেটে এত কাঁচা পয়সা এলো কোত্থেকে!
--তোলা কী দাদা!
--চাঁদা চাঁদা। ওই যে পার্টির লোকেরা যেটা তুলে মস্তি করে বেড়ায়।
বাতেনের বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে ওঠে। এই লোক কী করে জানল যে সে চাঁদাবাজ!
লোকটা হেসে বলে, কী ভাবছো, বুঝলাম কী করে! আরে ভায়া, আয়-উপার্জন তো লিমিটেড। তাই মানুষ আড়াইশো গ্রাম মিষ্টি কেনে। আর আমাদের এখানে যারা পার্টির তোলা নেয়; চাঁদাকুড়া আরকি; তারা এক কেজি মিষ্টি কিনে বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফেরে।
দ্রুত এক কেজি মিষ্টি নিয়ে দুরুদুরু বুকে চিত্তদার বাড়িতে ফেরে সে। যূথিকা দরজা খুলে বলে, কোথায় গিয়েছিলে গো ঠাকুরপো? তোমার দাদা তো দুশ্চিন্তায় অস্থির। নতুন জায়গা; পথ হারিয়ে ফেললে তো বাড়ি চিনে ফিরতে পারবে না!
--বেশি দূরে তো যাইনি বৌদি। তোমাদের জন্য মিষ্টি আনতে গিয়েছিলাম।
--ওমা, করেছো কী! দোকানসুদ্ধ তুলে এনেছো দেখতেছি। ওগো, দেখে যাও; বাতেন কী করেছে!
কলপাড় থেকে চান করে বারান্দায় উঠে গা মুছছিল চিত্তরঞ্জন। যূথিকা এসে বড় মিষ্টির প্যাকেটটা তাকে দেখায়।
চিত্ত বলে, ক'টা লুচি ভেজে দেব গো যূথি! মিষ্টি দিয়ে মেরে দেব।
দুপুরবেলা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনা যায়। দুটো গোঁফওয়ালা লোক, সুঠাম দেহ, ছোট চুল। মাথার চুলে মাত্রাতিরিক্ত কলপ দেওয়া। চোখের নিচে রাত জাগার কালি।
যূথিকা দরজা খুলে তাদের বসতে দেয়। লোকদুটো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যূথিকার অপরূপ দেহবল্লরী দেখতে থাকে। অস্বস্তি বোধ হওয়ায় যূথিকা আঁচল টেনে দ্রুত ভেতরে চলে যায়। চিত্তরঞ্জন বাতেনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সামনে এসে বসে। পরিচয় করিয়ে দেয়, পথিকৃৎ বাতেন। যুবসংগঠনের নেতা। একটু লেখালেখিও করে স্থানীয় পত্রিকায়।
একটা সুঠাম দেহ, ছোট চুলওয়ালা লোক কথা শুরু করে, তা বাতেন খান, পিন্ডি কেমন রেখেছে আপনাদের? বাঙালি ভাইদের ফেলে অবাঙালি অচেনা লোকের সঙ্গে পাকিস্তান গড়ার শখ কি মিটেছে আপনাদের! আমরা দুই ভাই একসঙ্গে থাকলে কি ভালো হতো না এর চেয়ে!
বাতেন একটু সাহস করে বলে, তাতেও তো দিল্লির অবাঙালি অচেনা লোকের শাসন মেনে নিতে হতো!
এবার আরেকটা ছোট চুল, সুঠাম দেহী একটু নড়ে বসে। চিত্ত মুচকি হাসে।
দরজার ওপাশ থেকে পর্দা সরিয়ে যূথিকা চিত্তকে ইশারা করলে চিত্ত উঠে গিয়ে ট্রেতে করে মিষ্টি, চা আর নিমকি নিয়ে আসে।
দুজন ছোট চুল, সুঠামদেহী খানিকটা হতাশ হয়। যূথিকাকে আরেকবার দেখার অপেক্ষা তো ছিল মনে মনে। একজন সুঠামদেহী আবার কথা শুরু করে, দিল্লি তো শুধু আমাদের প্রতিরক্ষা আর বিদেশনীতি দেখে। আমাদের কষ্ট করে সেনাবাহিনী পোষার দরকার নেই। আমরা বাপু আদার ব্যাপারী, বিদেশের জাহাজের খবর রেখে কী লাভ আমাদের!
সেনাবাহিনী পোষা শব্দবন্ধ শুনে আরেকটা ছোট চুল, সুঠামদেহী আরেকবার নড়ে ওঠে। সেটা বুঝে বাঙালি সুঠামদেহী বলে, প্রতিরক্ষার দায়িত্বে আছে না আমাদের অবাঙালি ভাই। দেখেছেন না কী উঁচু-লম্বা গড়ন তার!
বাতেন এবার অবাঙালি ছোট চুল, সুঠামদেহীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।
বাঙালি সুঠামদেহী বলে, আচ্ছা, পূর্ববঙ্গ না হয় আলাদাই রইল। কিন্তু ঘাড় থেকে পাকিস্তান ভূত নামাতে হবে। যাতে আমরা দুই ভাই সুখে-শান্তিতে মিলেমিশে পাশাপাশি বসবাস করতে পারি।
এটা বলেই মুখের মধ্যে কপ করে একটা পানতোয়া পুরে চোখ বন্ধ করে খেতে থাকে লোকটি। তারপর খেতে খেতে বলে, শেরে বাংলা বলুন, ভাসানী বলুন, সোহরাওয়ার্দী বলুন, আর শেখ মুজিব বলুন; তাঁরা তো সবাই মুসলিম লীগ করেছেন। আপনাদের মতো নবীন অসাম্প্রদায়িক ছেলেরাই পারবে; আমাদের বাঙালির যৌথ পরিবারটি জোড়া লাগাতে। একই আকাশ, একই বাতাস, একই নদীর জল; সেসব ফেলে কেমন করে আলাদা থাকি বল!
অবাঙালি সুঠামদেহী সামনে হাত প্রসারিত করে বলে, বাহ গোস্বামীজি বাহ; কিয়া শের মারা আপনে! বহুত খুব, মজা আ গ্যায়া।
বাতেন ফিসফিস করে চিত্তরঞ্জনকে জিজ্ঞেস করে, লোকটা উর্দু বলল যে!
চিত্ত উত্তর দেয়, এ হলো হিন্দুস্তানি ভাষা। উর্দু আর হিন্দি হলো মাসতুতো ভাই।
চায়ে দ্রুত চুমুক দিয়ে দুজন ছোট চুলওয়ালা সুঠামদেহী উঠে দাঁড়ায়। গোস্বামী বলে, আজ তবে আসি, বাতেন খান।
বাতেন ঠিক করে দেয়, আজ্ঞে, পথিকৃৎ বাতেন।
--ওই হলো! পাকিস্তানের খানমুক্ত হলে তখন তোমাকে পথিকৃৎ বলে ডাকব ভায়া। মনে রেখো, তোমাকে পথিকৃৎ হতে হবে।
চিত্তরঞ্জন দুই সুঠামদেহী, ছোট চুলওয়ালার সঙ্গে বেরিয়ে গেলে বাতেন অনেকক্ষণ উদাস হয়ে চেয়ারে বসে থাকে। যূথিকা এসে তাকে চিরকুটে একটা ঠিকানা লিখে দেয়, এত দুশ্চিন্তা করো না ঠাকুরপো। ঠিকানা লিখে দিয়েছি, ওখানে গেলে সবকিছু ফুরফুরে লাগবে দেখো।
বাতেন ঠিকানা খুঁজে একটা লাল দালানের সামনে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে নানারকম গান আর হাসির শব্দ আসছে। একটা হাসিখুশি মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, যূথিকাদি পাঠিয়েছে তোমাকে?
বাতেন মাথা নাড়তেই মেয়েটা বলে, এসো গো; সামনের সিঁড়ি দিয়ে উঠলে বাঁদিকে প্রথম ঘরটাই আমার।
লাল-সবুজ মৃদু আলোছায়ায় রহস্যময় ঘরখানি। মিষ্টি একটা গন্ধ রয়েছে ঘরটা জুড়ে। মেয়েটা এত সাবলীল; যেন মনে হয় অনেক দিনের চেনা। বাতেন জিজ্ঞেস করে, তোমার নাম বলবে না!
মেয়েটা রিনি রিনি হাসে, নদীর নামে নাম; যে নদীর পাশে তোমার গ্রাম।
--মধুমতী।
--তোমার বুদ্ধি দেখছি পাকা।
বাতেন জানালার দিকে তাকিয়ে আকাশের চাঁদটাকে দেখে। স্বপ্নের মতো লাগছে। রহস্যময়, আবার খুব পরিচিত লাগছে। মধুমতী গুনগুন করে গেয়ে ওঠে,
নিশি রাত, বাঁকা চাঁদ আকাশে
চুপিচুপি বাঁশি বাজে বাতাসে, বাতাসে
নিশি রাত, বাঁকা চাঁদ আকাশে
চুপিচুপি বাঁশি বাজে বাতাসে, বাতাসে
নিশি রাত



পাঠকের মন্তব্য