ভোরবেলা কলিম চৌধুরী বাইরের বারান্দায় বসে পাখির কিচিরমিচির শুনছিলেন আর অপেক্ষা করছিলেন, তাঁর নাতি কখন ঘুম থেকে উঠবে। মাঝবয়সে নাতি-নাতনিই তো আধবুড়োদের খেলনা। যে কলিম চৌধুরীর ভয়ে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়, সেই কলিম চৌধুরী হাঁটুতে ব্যথা নিয়েও নাতিকে পিঠে করে হাতি সাজতে পছন্দ করেন।
সীমানাপ্রাচীরের গেট খুলে কে একজন ঢোকে। চশমাটা পরে নিয়ে দেখেন, অসিত পাল হাতে দুটো মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ঢুকছে।
-- আদাব, কলিম ভাই।
-- আদাব। কত দিন পর তোমারে দেখলাম, অসিত।
-- সারাদিন দোকান নিয়া ব্যস্ত থাকি; আসা হয় না গো।
-- তা কোন কাজে নাকি এমনিই আইলা?
-- আপনি এখন আমাগো এমপি সাব। কাজ তো পড়েই, কলিম ভাই!
-- কী হইছে, কও। ঐ মিন্টু, দুইডা চা দিয়া যা তো, বাপু।
-- এতদিন তো আমরা খুশি হইয়া টুকটাক চাঁদা দিতাম পার্টিরে। অহন বাতেন যুব সংগঠনের নেতা হইয়া অনেক বেশি টাকার জন্য চাপ দিতেছে। আমরা তাও কষ্টমষ্ট কইরা এই চাপ নিতে পারুম। যুব সংগঠন তো দুইটা বেগুন নিয়া কেউ বাজারে বেচতে আইলে, রিকশাওয়ালা-খেয়ামাঝি সবাইরে ধইরা ধইরা চাঁদা নিতেছে।
-- এইডা কী হইলো গো, অসিত? সলিম খান, আমি নিজের পকেটের পয়সা খরচ কইরা রাজনীতি করি। ঢাকায় সম্মেলনে ডাকলে বেডিং নিয়া গিয়া দুই টাকা চাঁদা দিয়া সবাই মিলা খিচুড়ি রাইন্ধা খাই। আর বাতেন, চান্দে চান্দে নেতা হইছে; সে আইসা চাঁদাকুড়া হইছে। মাইনষেরে কষ্ট দিতেছে। ও তো বোঝে না, এই মাইনষেই ভোট দিয়া আমারে এমএলএ বানাইছে। ঐ মিন্টু, বাতেনরে গিয়া গলায় গামছা দিয়া ধইরা নিয়া আয়।
অসিত পাল দ্রুত সুড়ুক সুড়ুক করে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, কলিম ভাই, আমি যাই। এইখানে আমারে দেখলে যুব সংগঠন আমার দোকান ভাঙচুর কইরা ইন্ডিয়ার ট্রেনে উঠাইয়া দিবো।
-- এত সহজ না, অসিত। অরে আমি হাড্ডি ভাইঙ্গা লুলা কইরা দিমু। অরে আমি পুলিশে দিমু।
দৌড়ে গিয়ে মিন্টু বাতেনকে খবর দেয় যে, আজকে তাকে হাড্ডি ভেঙে পুলিশে দেওয়া হবে।
বাতেন দৌড়ে গিয়ে কালিদাসকে বলে, অন্য কোথাও একটা গ্যাঞ্জাম বাধাইতে হবে।
কালিদাস দৌড়ে নীলকমল মহলে যায়। ঘটনার বিবরণ শুনে চিত্তরঞ্জন কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকারের দিকে তাকায়।
জুলফিকার নীলকমল মহলের বারান্দায় ঘুমিয়ে থাকা উস্কোখুস্কো চুল, ময়লা জামা পরা, পরিচ্ছন্ন হাত-পায়ের নখওয়ালা পাগলগুলোকে ঘুম থেকে জাগায়।
একটা পাগল জামে মসজিদের সামনে গিয়ে চেঁচায়, যবনেরা বাইরে থেকে এসে আমাদের ভূমি দখল করেছে। বখতিয়ার খলজিরে পিছা মারি; পিছা মারি তোর যবন ধর্মরে।
কিছু লোক হৈ হৈ করে মসজিদ থেকে বের হতেই কচুক্ষেতের ম্যানেজার জুলফিকার তার সাইকেলে করে পাগলটাকে তুলে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে দর্শনাগামী ট্রেনে তুলে দেয়।
আব্বাস শাহ মসজিদে এসে জ্বালাময়ী ভাষণ দেয়, মালাউনের এত সাহস বাড়ছে! এইবার অগো দেইখা নিমু। 'নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর' স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল হিন্দুপাড়ার কাছাকাছি পৌঁছাতেই রাশেদ খান আর শ্যামাপদ বাধা দেয়। শ্যামাপদ হাত জোড় করে বলে, যদি কোনো অন্যায় হয়ে থাকে, আমি ক্ষমা চাইছি। আব্বাস ভাই, তোমার ছেলে তো আমারই ছাত্র। আমার চোখে তো কোনো হিন্দু-মুসলমান বিভেদ নাই। তোমরা কেন পয়সারহাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেও? মাথা গরম কইরো না।
আব্বাস শাহের বিক্ষোভ মিছিল কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের সামনে দিয়ে মসজিদে ফিরবে, এটা আঁচ করে চিত্তরঞ্জন কেন্দ্রের বাইরের দেয়ালে বঙ্কিমচন্দ্রের ছবি ঝুলিয়ে দেয়।
আব্বাস শাহ দূর থেকে ছবিটা দেখে বলে, ঐ লোক প্রথম যবন বলছে আমাগোরে। সেইটা দেইখা অন্যেরা শিখছে। দেও, লোকটার মুখে চুনকালি লাগায়ে।
সাইকেল মেকারের দোকান থেকে কালি নিয়ে একজন গিয়ে বঙ্কিমের মুখে মাখাতেই রাশেদ খান এসে হাত চেপে ধরে।
চিত্তরঞ্জনের লোক ঠিক করাই ছিল। এক রিকশাওয়ালাকে এক বালতি পানি দিয়ে বলে, যাও, কালিটা ধুয়ে দেও। এই দুই টাকা রাখো।
কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে গ্যাঞ্জামের খবর পেয়ে সলিম খান পুলিশ পাঠায়। পুলিশ আব্বাসসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। আব্বাস আবার হিরো হয়ে যায় অনেকের কাছে।
দধীচি কাব্য আন্দোলনের আকাশ ওরফে আক্কাছ, পরিচয় গুপ্ত ওরফে মোখলেছ, মফিজ, চারণ কবি রজব আলী কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রের সামনে এসে মাইক লাগিয়ে বঙ্কিমের মুখে চুনকালি দেওয়ার প্রতিবাদ জানায়। অধ্যক্ষ আজিজুল হক এসে বক্তৃতা দেন, আমাদের আধুনিক বাঙালির অবয়বটি তৈরি করেছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি বাঙালির সাহিত্যসম্রাট। তাঁর মুখে চুনকালি দেওয়া মানে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির মুখে চুনকালি দেওয়া। মধ্যযুগীয় বর্বর পাকিস্তানের লোকেরা বাঙালির সঙ্গে শত্রুতা-বশত এ কাজ করেছে। মূর্খের দল কোথাকার! তোরা কি এক লাইন বঙ্কিম পড়েছিস কখনো? বঙ্কিম সে বিশাল ব্যাপার, মহাসমুদ্র।
বরুণ সাহা জমিদারবাড়ির দোতলার জানালা থেকে এসব দেখলেও নির্লিপ্ততা অনুশীলন করে।
মধুমতীর আলো পত্রিকার সম্পাদক মুকুল শর্মার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। 'বঙ্কিমেরে করিলে অপমান', 'বাঙালির আত্মপরিচয়ের বঙ্কিম', 'বাঙালি সংস্কৃতি বনাম সংকীর্ণ মুসলিম সংস্কৃতি', 'বঙ্কিম-বাঙালি জাতীয়তাবাদের অধীশ্বর' ইত্যাদি দিস্তা দিস্তা উপসম্পাদকীয় লিখিয়ে নেয় কলা ও সংস্কৃতি কেন্দ্রে নবাগত লেখকদের দিয়ে। অধ্যক্ষ আজিজুল হক সেগুলো একটু দেখে দেন।
রাশেদ খানের নেতৃত্বে শহীদ মিনারের সামনে শ্যামাপদ ও কল্পনা তাদের ছাত্রদের নিয়ে সম্প্রীতি সভা করে। যেকোনো মূল্যে হিন্দু-মুসলমানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার আহ্বান জানায় কল্পনা।
যথারীতি দধীচি কাব্য আন্দোলনের মফিজ, মোখলেছ, আক্কাছ শ্যামাপদ ও অসিতকে নিয়ে বামাতি বলে রগড় করে। রজব আলী ছড়া কাটে, রাশেদ খান পাকিস্তান, কল্পনা তার জানের জান। কাব্য আন্দোলনে নবাগত জুঁই, চামেলি, শেফালি, শূর্পণখা হাসিতে কুলুকুলু হয়।
প্রণব মুখুজ্জের সামনে দাঁড়িয়ে বাতেন আর চিত্তরঞ্জন। মুখুজ্জে বাবু বলেন, বাতেনের আপাতত কলিম চৌধুরীর সামনে পড়ার দরকার নেই। পথিকৃৎ বাতেন নয়; এখন পুরো পয়সারহাট বঙ্কিমকে নিয়ে ব্যস্ত। চিত্ত বরং বাতেনকে নিয়ে কটা দিন কলকাতা ঘুরে এসো। বরুণ আজ রাতের ট্রেনে কলকাতা যাচ্ছে। তোমরা ওর সঙ্গে যাও। হাওয়া বদল করে এসো।



পাঠকের মন্তব্য